এক থা টাইগার<br>একটি আঁতেল ছবি</br>

By সাম্যব্রত জোয়ারদার | Last Updated: Wednesday, October 3, 2012 - 21:04
 
সাম্যব্রত জোয়ারদার  

দৃশ্য-১
সিনেমা শুরু হতেই দেখা যায় ক্লাসরুমে বাঘের চেয়ার ফাঁকা পড়ে আছে। ক্যামেরা জুম চার্জ করে। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে পেরিয়ে যাওয়া ট্রেনের শব্দ। খানিক নিস্তব্ধতা। এরপর গুলি ছোঁড়ার পরপর ঠিস্স্ ঠিস্স্ আওয়াজ ও বাঘের আর্তনাদ, গর্জন।

ফেড টু ব্ল্যাক

দৃশ্য-২
ক্যামেরা হ্যান্ডেল শটে ট্র্যাক ব্যাক করে। বাঘের চেয়ার দূরে পড়ে থাকে। বিকেলের নরম আলোয় দেখা যায় স্কুল বিল্ডিং। পাশের ট্রামলাইনে ট্রাম ঘণ্টা বাজিয়ে বাঁক নিচ্ছে। জার্ক শটে আকাশে কেবল্-এর জট। গাড়োল মোটরযানের কাশির শব্দ, ফেঁসে থাকা শহরের হিজিবিজি। হাতরিকশা টানছেন দেহাতি মানুষ। দেওয়ালে দেওয়ালে বাঘের মুখের ছবি। রেলিঙের ওপার থেকে সেই ছবির ওপর ক্যামেরা ট্র্যাক করে। স্পিড নিলে বাঘের মুখ আবছা হয়ে যায়।

দৃশ্য-৩
ভয়েজ ওভার, সঙ্গে বাঘের মন্তাজ।

এক যে ছিল বাঘ। আমবনে নয় সুদূর মফস্সলে তাঁর বাড়ি। কাগজের হালুম নয়। বা বেড়ালকে পাম্প দিয়ে ফুলিয়ে তোলা নয়। নয় সার্কাসের তাঁবুর চাবুক খাওয়া আফিম-বুঁদুবুঁদু। বাঘের স্নায়ু ইস্পাত কঠিন (পেছনে কারা সমবেত স্বরে টাইগার টাইগার বলতে থাকে, যা 'কালিয়া কালিয়া' শব্দবন্ধকে মনে করিয়ে দেয়)। ক্লোজ শটে বাঘের পা। বাঘ দৌড়চ্ছে।

দৃশ্য-৪
কে এই বাঘ?
বাঘের মোনোলগ

জুলাই মাসের মেঘ বৃষ্টি মুছে গিয়েছে। আকাশ ফরসা হয়ে উজ্জ্বল নীলাভ। বাতাসে উত্‍সবের গন্ধ। এবছর শুনেছি গ্রামদেশে তেমন ভালো চাষবাস হয়নি। বৃষ্টির আকাল। চিন্তা হয়, প্রত্যেকে তাঁর সন্তানের মুখে দু-বেলা দু-মুঠো ভাত তুলে দিতে পারবেন তো?
ছোটবেলা থেকে এই চিন্তাটাই আমাকে তাড়িয়ে বেড়াত। অভাব। অভাবী সংসারে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তের লড়াই। ৭১-এর যুদ্ধ। পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে এদেশে চলে এলেন বাবা মা। জমিজায়গা ছিল না আমাদের। দিনমজুর বাবা। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর খাবারের জোগাড়। কোনওদিন হয়। কোনওদিন আধপেটা। রাতে শখের থিয়েটারে গান গাইতেন বাবা। আমাদের পড়াশোনার খরচ চলত।
(এখানে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরে 'বনমালি তুমি আর জনমে রাধা হইও রাধা' এই গানটির ধুন বাঁশিতে বাজবে। এটি দেশ রাগ নির্ভর।)
দাঁতে দাঁত চেপে, খিদের মুখে পাথর চেপে বড় হয়ে উঠলাম আমরা কজন ভাইবোন। শিখলাম এর নাম টিকে থাকা বলে। আর শিখলাম লড়াই।

দৃশ্য-৫
অন্ধকার। বন্ধ দরজায় লাথি মারার শব্দ। পুরুষ কণ্ঠের অশ্রাব্য খিস্তি। লাথির পর লাথিতে একসময় দরজা হুড়মুড় ভেঙে পড়ে। দু-তিনটে জোরালো টর্চের আলো ক্যামেরার মুখে এসে চমকায়। নারীর আর্তনাদ, কান্না, আর্তি শোনা যায়। পুরুষ কণ্ঠের খিস্তি। উল্লাস। দেওয়ালে টর্চের আঁকাবাঁকা জ্যামিতি ছটফট করে। চিত্কারের শব্দের সঙ্গে মেশে একটা না বোবাধরা কান্না। ব্যর্থ আক্রোশের ফেটে পড়া।
কাট টু
দৃশ্য-৬
প্রকাণ্ড ক্যানভাসে পিকাসোর ড্রইং। সাদাকালোয়। গ্লাসের ওপর জোরালো এচিং। দ্য রেপ আন্ডার দ্য উইন্ডো।

Le Viol sous la fenêtre

নিখিল ব্যানার্জির সোপ্রানো ঝালা। তার ছিঁড়ে যাওয়ার শব্দ। রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির অসহ্য ফিডব্যাক। মাটিতে পড়ে থাকা টর্চের আলোয় বিগ ক্লোজ-আপ। নারীর মুখ। চুল ঢাকা। ফাঁক দিয়ে একটি মাত্রই চোখ দেখা যাচ্ছে। খোলা। ভয়ার্ত। স্থির। মৃত।

ফেড টু ব্ল্যাক

দৃশ্য-৭

টপ শট। স্লো-মোশন। উবুশ্রান্ত বৃষ্টি পড়ছে। ঘনঘন বিদ্যুত্ চমকাচ্ছে। শ্যাওলা কালো অন্ধকার হয়ে রয়েছে চারপাশ। একটা বাজারের মত এলাকা। কিছু মানুষের জমায়েত। কেউ ছাতা মাথায়, কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছেন। ক্যামেরা ক্রেন ডাউন করে। এতক্ষণে দেখা যায়। জমায়েতের ভিড়ে একটি মৃতদেহ মাটিতে পড়ে। উপুড় হয়ে।

দৃশ্য-৮

বাঘের মোনোলগ

বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে পড়লাম একদিন। বাজারের মধ্যে দাঁড়িয়ে চিত্কার করে ছড়িয়ে দিলাম প্রতিবাদের লিফলেট। হাতে হাত মুষ্টিবদ্ধ হল। তৈরি হল প্রতিবাদী মঞ্চ। ধর্ষিতাদের ফিরিয়ে আনলাম সমাজের মূলস্রোতে। গরিব ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিলিয়ে দিলাম ইস্কুলের বইখাতা। নিরন্নের হাতে তুলে দিলাম ওষুধ আর খাবার। কিন্তু সেই পথচলাই একদিন ফুরিয়ে গেল। সেদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলাম। শিয়ালদা থেকে ট্রেন। গোবরডাঙা নামব। বিকেলে একপশলা বৃষ্টি হয়েছে। ট্রেন থেকে নেমে মোটরবাইকে স্টার্ট দিয়েছি। খুব কাছ থেকে গুলি করল ওরা। লুটিয়ে পড়লাম। একদলা অন্ধাকার আঁকড়ে একবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা...স্তব্ধ হয়ে গেল সময়..সবকিছু...

দৃশ্য-৯
দৃশ্য একের পুনরাবৃত্তি।
ফেড টু ব্ল্যাক।

দৃশ্য-১০
কোনও শব্দ নেই। পর্দায় ফুটে ওঠে কয়েকটি অক্ষর।
আমি ছিলাম। এখানেই ছিলাম। আমি বরুণ বিশ্বাস। একজন সাধারণ মানুষ।

সমাপ্ত

সাম্যব্রত জোয়ারদার
(অ্যাসাইনমেন্ট এডিটর)



First Published: Wednesday, October 3, 2012 - 21:04
TAGS:


comments powered by Disqus