জন্নত মন্নত হন্যত

By ফুলকলি | Last Updated: Saturday, November 17, 2012 - 17:08
 
ফুলকলি  

হ্যান্ডসেটের ক্যালেন্ডারে নভেম্বর দুই। ভোর থেকে ভাবছি, মন্নত যাব মন্নত যাব। সাংবাদিক হয়েও মনটা তিড়িং-বিড়িং করছে। পাঁকাল মাছের মতো পিছলে যাচ্ছে, ধরে রাখতে পারছি না। এদিকে টুইটারে চেক করছি। বাদশার ছেলে বাবাকে কী উপহার দিয়েছে। মেয়ে সকালে উঠে স্পেশাল হামিটা দিল কি দিল না..

মুম্বইয়ের এন্টারটেনমেন্ট জার্নালিজমে একটা কাহাবত আছে, দমদার সাংবাদিক বলা হবে তখনই, যদি সে শাহরুখ খানের মন্নত-এ এন্ট্রি নিয়ে শাহরুখের ইন্টারভিউ নিয়ে আসেন। ইন শর্ট, মন্নতই সাংবাদিকদের জন্নত। কথাটা যতই নির্লজ্জ হ্যাংলার মতো শোনাক, যা রটে তার কিছু তো বটে। মনে হয় ডালে-ডালে খবরটা কিং খানের কানে গিয়ে পৌছছিল কোনও এক সময়ে। কাজেই এর একখান যোগ্য মুচকি হাসি হেসেছিলেন শাহরুখ। গত কয়েক বছর ধরে ওই দিনটিতে, আশা করি দোসরা নভেম্বরের তাত্পর্য আর বুঝিয়ে বলতে হবে না, মুম্বইদের সকল সাংবাদিকদের ওপেন নেমন্তন্ন থাকে শাহরুখের বাংলোয়। ইয়াবড় নরম-তাজা পেস্ট্রি কাটেন শাহরুখ। ক্রিমের কারুকাজ, হ্যাপি বার্থ়ডে শাহরুখ। কাউকে নিজে হাতে খাইয়ে দেন, কাউকে খুরপি দিয়ে তুলে দেন প্লেটে। বিজ্ঞান থেকে জি কে, যে কোনও প্রশ্নের উত্তর দেন। কেউ ম্নানমুখে ফিরে যান না। ফুড কাউন্টারে থাকে অঢেল ভূরিভোজ এবং ভুঁড়িভোজের ব্যবস্থা..

আমি জানি, ঠিক এর পরের প্রশ্নটা কী হবে। ধৈর্য হল সর্বশ্রেষ্ঠ ধরবার জিনিস। একটু ধরে থাকুন। লাস্টের দিকে মেনুটা ঠিক বলে দেব। যদি ওয়ার্ড লিমিট ক্রস করে যায়, তবে পরের ব্লগে তো শিয়োর। তার আগে মন্নতের বাইরের ছবিটা মেলে ধরি। ছবি তো নয়, বায়োস্কোপ! জুহু আর মন্নতের মাঝখানে, ফ্যানসমুদ্র। অনুরাগের জোয়ার। জুহুর পাড়ে হাট বসেছে শুক্রবারে। হরির লুটের মতো শাহরুখের পোস্টার-প্ল্যাকার্ড বিলি হচ্ছে। ঘটিগরম-মুমফলি-কাঁচা আমড়া ডাবওয়ালারা শিস দিতে দিতে ঝটাপট বিজনেস করছে। লোক্যাল ব্র্যান্ড ক্রিম বেল আইসক্রিম পড়তে পাচ্ছে না (এর জলজিরা আর নিম্বুপানি ফ্লেভারটা খেয়ে দেখবেন, কোথায় লাগে বাস্কিন রবিন্স)। ঠ্যালাগাড়িওয়ালা এক মিটার দূরত্ব টেনেই মাল খতম করে ফেলে। ন্যাংটো বাছা। জিনস-পরা কলেজপড়ুয়া। বুড়ি থুত্থুড়ি। জিম-করা মাস্তান। ভিড়ের ভেতরে সে কী কস্টিউম ড্রামা। মাঝেমাঝেই উড়ো খবর, ওই আসছেন। ওই এলেন। আরে কানা নাকি.. দোতলার বারান্দার দিকে তাকা। কই, কই মা! তোর দ্বারা কিচ্ছু হবে না, দেখতে পেলি না তো.. আবার এক ঘণ্টা বাদে আসবে, সবুর কর। ছত্তিসগড় থেকে আসা দরিদ্র এক তরুণ, আপন মনে রঙ্গোলিতে এঁকে চলেছে শাহরুখের একমাস বয়সের ছবি। সকাল থেকে একটানা শিল্পকর্ম করছেন। খেপে-খেপে চ্যানেলে ইন্টারভিউ দিচ্ছেন। অনতিদূরেই শাহরুখের লুক-অ্যালাইক। শাহরুখ খানের ডর থেকে ডন টু, সব ছবির ডায়লগ কণ্ঠস্থ। ভিড় সামলাতে তাঁর মিমিক্রি অসাধারণ টোটকার কাজ করছে। এঁকে সবাই চিনবেন। শাহরুখের কপি করে ইতিমধ্যেই বেশ নামটাম করেছেন। এগিয়ে এসে বললেন, দিদি, এটা কখন দেখাবে বলবেন, আমি কলকাতার বন্ধুদের জানিয়ে দেব। নিশ্চয়ই। আচ্ছা, এই যে এতক্ষণ ঘাম ঝরাচ্ছেন, শাহরুখ আপনার সঙ্গে দেখা করেন? করেন দিদি, প্রতি বছর। আমি এক্সক্লুসিভের গন্ধ পাই। তাই নাকি, কখন করেন? আপনারা বেরিয়ে যাওয়ার পর, রাতের দিকে। বলে ভাল করলে, তোমার সঙ্গে যখন দেখা হবে আমায় একটু বলে দিও তো.. বলব, তবে, প্রেসের সামনে উনি আমাদের সঙ্গে দেখা করেন না দিদিভাই। হুমম... বুঝলাম। হঠাত্ দেখি ঝিনচ্যাক-চুঁচুঁ-চ্যাঁচ্যাঁ-চিড়িং-চিড়িং-ভ্রুমমম.. বাপরে, একি শব্দকল্পদ্রুম! কলেজছোকরাদের ব্যান্ড। তারস্বরে শুরু করেছে, জব তক হ্যায় জান.. ভাবলুম জান নিয়ে পালাই...

যাকগে, যা বলছিলাম, পুজো কভারেজ শেষ। ভোর থেকে ভাবছিলাম, মন্নত যাব, যাবই আমি যাবই। শাহরুখের জন্মদিন। এই হন্যমান সাংবাদিক জীবন নিয়ে প্রথমবার জন্নত-যাত্রা, সরি, মন্নত। আমন্ত্রণের এসএমএসটি প্রায় আর্কাইভ করে ফেলি। পাকে চক্রে আমি কলকাতার হয়েও মুম্বইয়ে। সত্য কী বিচিত্র! সাড়ে তিনটেয় মন্নতের কলটাইম। কে জানে বাপু, ঢুকতে যদি না পারি! সাড়ে বারোটায় পৌঁছে দেখি মন্নতের বাইরে কাতারে কাতারে ওবি ভ্যান, সে কী!। মাথায় বাজ পড়ে, ওবি দাঁড় করাব কোথায়? তাড়াতাড়ি জি-নিউজের অফিসে ফোন করি। আহ্, ওবি আগে থেকেই চলে এসেছে, নো চিন্তা। ফ্যানবিশ্বের জনসমুদ্র সাঁতরে নিরাপত্তারক্ষীকে প্রেসকার্ড দেখাই। ইশারা পেয়েই পা চালাই। সুবিশাল গেটের সামনে শাহরুখের মেকআপ ভ্যান। অন্দর অবশ্য শাহরুখ-শূন্য। গেটের সামনে অপেক্ষা করি ক্যামেরাম্যান সুশান্তর সঙ্গে। বিশ্বাস করবেন না, কী দৃশ্য দেখলাম। পিল পিল করে পিঁপড়ে মতো সাংবাদিকে ভরে গেল জায়গাটা। সংখ্যাটা বাইরের অনুরাগীদের থেকে কম হবে না। বিখ্যাত সিনেমাপত্রিকার সাংবাদিক থেকে পুঁচকে অনামী ট্রেনি, সবাই প্রেজেন্ট প্লিজ। আর একটু খোলসা করে বললে, বম্বে টাইমস থেকে মিসম্যারিনা ওয়েবসাইট, সিএনবিসি থেকে মিউজিক ম্যাজিক চ্যানেল, সক্কলে হাজির। মেঘে মেঘে তিনটে বেজে গিয়েছে। আর মোটে আধঘণ্টা। তার পরই বাদশার বাংলো। বড় জলতেষ্টা পাচ্ছে। একটু জল। চাইতেই হাসিমুখে মিনারেল ওয়াটারের বোতল এগিয়ে দিল ইউনিফর্মধারী ছেলেটি। গলায় ঢালতেই যেন শরবত-শরবত ঠেকল। ব্র্যান্ডটা দেখে নিলাম, মনের ভুল। শরবত নয়, জলই। শাহরুখ-এর বাংলো থেকে এল বলেই বোধহয়...

সাড়ে তিনটে বেজে গিয়েছে। ক্যামেরাম্যানরা ক্যামেরা স্ট্যান্ড হাতে রেডি-স্টেডি হয়ে আছেন। মন্নতের দরজা খুল যা সিম সিম..। কী হল বলতে পারব না। নিজেকে আবিষ্কার করলাম জন্নতের, সরি, মন্নতের গ্রাউন্ড ফ্লোরে। চেয়ারপাতি উল্টোপাল্টা হয়ে গিয়েছে ভিড়ের ধাক্কায়, তারই মধ্যে একখান পেয়ে বসে পড়লুম গ্যাঁটসে। সামনে টেবিলে দুধসাদা চাদর। আমার সামনের সিটগুলো সব টপাটপ স্টিল ফোটোগ্রাফারে ভর্তি হয়ে গেল। বসে আছি তো আছি, একগাদা ভিড়ে প্রাণ যায় যায়। আর কতক্ষণ.. সাড়ে চারটে তো বাজে। সাংবাদিক-সুলভ অভিমানটা ভেতর ভেতর গুমরে ওঠে।

জিজ্ঞেস করি মুম্বইয়ের এক সাংবাদিক-বন্ধুকে, আচ্ছা, দু ঘণ্টা ওয়েট করলুম.. জন্মদিনে এমন প্রেস কনফারেন্স.. ডাকার কী দরকার!

মানে কী? চোখ কপালে তুলে তাকান সেই বন্ধু, অন্য কারওর জন্মদিন আর বিয়ে কভার করতে গেলে ঠ্যাঙানি খাই, পুলিশ মেরে তাড়ায়, এখানে নেমন্তন্ন পেয়ে আসছেন, তাতেও কচকচানি?

না, মানে আমার কথার মানে সেটা নয়, ব্যাপারটা হল..

ছাড়ুন দিদি, আর ব্যাপার বোঝাতে হবে না, পাঞ্জাবি কুলফিটা দারুণ বানিয়েছে। কেক কাটা হলেই ওদিকটায় চলে যাবেন, নইলে আর চাখতে পারবেন বলে মনে হয় না..

শাহরুখের সেক্রেটারিকে পাকড়াও করি। মিষ্টি করে হেসে বলি, এই যে দিদি, কেমনি আছেন? যা ভিড়ভাড় দেখছি, একটা ইন্টারভিউ হবে না? টিকট্যাক?.. অদ্দূর থেকে এলাম..।

তিনি ততোধিক মিষ্টি হাসেন। হবে হবে, অদ্দূর থেকে এসেছেন আগে মিষ্টিমুখ করে যান। তিনি রহস্যময়ী হয়ে মিলিয়ে যান ভিড়ের ভেতর। ইঙ্গিতটা বুঝে যাই, বোঝাতে পারি না আমার মিষ্টিসুখ কিসে হবে! চেয়ারে ইঁট পেতে রেখে গ্রাউন্ডফ্লোরটা খানিক ঘুরে-ঘুরে দেখি। কাল কী হবে কেউ জানে না। দেখে তো নিই। বিশাল বিশাল পর্বতপ্রায় ফুলের তোড়ায় ভেসে গিয়েছে, ভরে গিয়েছে চতুর্দিক। একতলা যাওয়ার সিঁড়িটাও। ক্যামেরাম্যানকে ডাকি। চট করে এইখানে পিটুসি দিয়ে নিই।

পাঁচটা বাজে..। হেই-ই-ই.. শাহরুখ আসছে শাহরুখ, ইয়েস-ইয়েস.. শাহরুখ-শাহরুখ। হ্যাপি বার্থডে টু ইউ, জিও স সাল... সাংবাদিকদের উল্লাস কে দ্যাখে! চোখের নিমেষে সাংবাদিকদের ধুলোয় ফেলে সবকটা চেয়ারের ওপর ক্যামেরাম্যান দাঁড়িয়ে গেছে! আমার ভেতরে পাঁকাল মাছ প্রাণপণ ডাইভ দিচ্ছে। প্রাণ নিয়ে বেরতে পারব তো! রক্ষে করো ঈশ্বর। ওঁদের দেখাদেখি শাহরুখ ও দাঁড়িয়ে গেলেন টেবিলের ওপর। ভাইয়ো আপলোপ ব্যায়ঠ যাইয়ে, পিকচার মিলা কি নেহি? মিলা? ম্যায় অব ব্যায়ঠ যাউঁ? এবার পিসি। দেখি একদল মহিলা সাংবাদিক বার্থডে বয়ের পায়ের তলায় বন্দনার ভঙ্গিমায় বসে গিয়েছেন.. এই বার ষোড়শোপচারে পূজা শুরু হল বলে।

নাঃ, ঘটা করে আর প্রেস কনফারেন্সের ধারাবিবরণী দেব না। আমাদের চ্যানেলে লাইভ দেখানো হয়েছে। এক কথায়, বাদশা জন্মদিনে কোনও প্রশ্নই ফেরান নি। সেটাই তাঁর স্টাইল। বিজ্ঞান অথবা জি কে, বিতর্ক কিংবা নেহাত চ্যাংড়া বাজে প্রশ্ন, জানা-অজানা সব প্রশ্নের উত্তরই দিয়ে দিলেন তিনি। শুধুমাত্র এই দিনে। নাম্বার টু, যাঁরা জানেন না, সমস্ত ন্যাশনাল মিডিয়ার শাহরুখ সেদিন যে কেকটা কেটেছিলেন, সেটা চব্বিশ ঘণ্টারই উপহার। ভিড়ের চাপে আর সব কেকগুলো চিপটে বিতিকিচ্ছিরি হয়ে গিয়েছিল। সবিনয়ে ধন্যবাদও জানিয়েছেন সে জন্য।

একটি শব্দে, অসম্ভব বিনয়ী মানুষকে দেখলাম সেদিন। একদিন যিনি প্রায় কপর্দকশূন্য হয়ে রাত কাটিয়েছিলেন সামনের জুহু বিচের বেঞ্চে, আজ সাফল্যের টপ ফ্লোরে গিয়েও বিরামশূন্য তিনি.. স্ট্রাগলের ধাপগুলো এখনও তিনি প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার করেন।

আর মেনুটা... পাঠেন অর্ধভোজনম। চকোলেট পেস্ট্রি উইথ শাহরুখের নাম, পি়ত্জা উইথ কর্ন টপিং, স্প্রিং রোল, ফিশ প্যাটিস, পানিপুরি, পাপড়ি চাট, ছোলে বাটুরা, ক্যারামেল মুজ, পঞ্জাবি কুলফি, আইসক্রিম.. সে কী স্বাদ! লিখে এ স্বাদের ভাগ হবে না।

যাঁরা ভাবছেন আমার ঘিলু ঘুলিয়েছে। আটভাট বকছি। সাংবাদিকতা ছেড়ে ফ্যানক্লাবের সদস্য হওয়ার টাইম এসে গিয়েছে, তাঁদের উদ্দেশে বলি। নভেম্বরের ওই তারিখে মুম্বইয়ের টিকিট কেটে মন্নত-এ চলে আসুন। আগে এলে আগে পাবেন। পরে এলে... ঠিক বলতে পারছি না।

ফুলকলি



First Published: Saturday, November 17, 2012 - 17:08
TAGS:


comments powered by Disqus