নির্মল করো, উজ্জ্বল করো, সুন্দর করো হে

সৌন্দর্যায়নের ভাবনার সঙ্গে স্বেচ্ছাচারের মিশেল কতটা ভয়ঙ্কর অথবা কুত্‍‌সিত হতে পারে? সম্যক বুঝতে হলে এখন কলকাতায় আসতে হবে।

সুদীপ্ত সেনগুপ্ত সুদীপ্ত সেনগুপ্ত | Updated: Mar 1, 2012, 04:23 PM IST

সৌন্দর্যায়নের ভাবনার সঙ্গে স্বেচ্ছাচারের মিশেল কতটা ভয়ঙ্কর অথবা কুত্‍‌সিত হতে পারে? সম্যক বুঝতে হলে এখন কলকাতায় আসতে হবে।

গোটা শহরকে সাদা-নীল রঙে রঙীন করে তুলছে পুরসভা আর রাজ্য সরকার। চমত্কার প্রয়াস। রঙের এই বিন্যাস অনেকেরই ভাল লাগবে। সাদা আর নীল একের পাশে অপরে খোলে ভাল, উজ্জ্বল আলোর দেশে আদর্শ রঙ। চোখের পক্ষেও স্বস্তিদায়ক। ফুটপাথে, বাসস্টপে, উড়ালপুলের পাঁচিলে বা বাড়ির গায়ে সাদা নীল রঙ দেখতে ভালই লাগছে।

অতি কুত্‍‌সিত লাগছে ময়দানে গাছের গুঁড়িগুলি রঙ করায়। লাল, নীল, সাদা- কোনও রঙই জীবন্ত বৃক্ষের শরীরে মানায় না। প্রকৃতিই তার জন্য অনন্য বসন সৃষ্টি করে দিয়েছেন। এই সরল কথাটা বারোয়ারি সৌন্দর্যের সাধকদের কি জানা নেই? নাকি একজন স্বয়ং মুখ খুললে তবেই বাকিদের সত্যি কথাটা বলার সাহস হবে?

আর একটি নান্দনিক ধর্ষণের ঘটে গিয়েছে উত্তর কলকাতার বাগবাজারে গিরীশ অ্যাভিনিউয়ের উপর গিরীশচন্দ্র ঘোষের বাড়িটির উপর। ঐতিহাসিক বাড়িটি সংরক্ষণের জন্যই সেটিকে অক্ষত রেখে রাস্তাটিকেই ওখানে বাড়ির দু'পাশ দিয়ে বানিয়েছিল সিআইটি। বাড়িটির রঙ চিরকালই এক বিশেষ শেডের গেরুয়া, যে গেরুয়া রঙ বেলুড় মঠ-মন্দিরে দেখতে বাঙালি 100 বছর ধরে অভ্যস্ত। সেই বাড়িটিও কুতসিত্ভাবে নীল-সাদা রঙ করে দেওয়া হয়েছে। সম্ভবত ক্ষতিপূরণ স্বরূপই অবশ্য গিরীশ ঘোষ এবারই প্রথম জন্মদিনে মহাকরণে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর শ্রদ্ধার্ঘ পেয়েছেন।

নান্দনিক গণ ধর্ষণের ঘটনাটি ঘটে চলেছে গোটা ডালহৌসি স্কোয়ার চত্বর জুড়ে। কয়েক বছর আগে কলকাতার প্রাচীন এতিহাসিক এই চত্বরে রট আয়রনের রেলিং লাগানো হয়েছিল রাস্তার ধার বরাবর। সঙ্গে মানানসই বাতিস্বম্ভ। হেরিটেজ মহল্লার বেশ একটা অভিজাত, সম্ভ্রমপূর্ণ চেহারা তৈরি হয়েছিল। সেই রট আয়রনের রেলিংগুলিকে সাদা-নীল রঙ করে এক অতি কদাকার চেহারা দেওয়া হয়েছে। কলকাতাকে লন্ডন করে তুলতে চান রাজ্যের বর্তমান শাসক। লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেস, ওয়াশিংটন ডিসি-র হোয়াইট হাউসের পাশে লাফায়েত স্কোয়ার, প্যারিসের শ্যঁজ্-এ লিজে, রোমের কলোসিয়াম বা নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কোয়ার - কোথাও রট আয়রনের রেলিং বা বাতিতম্ভকে এনামেল পেন্ট দিয়ে রঙ করার কথা কেউ কল্পনাও করবেন না।

সেই দূর অতীতে বামফ্রন্টের আমলে একবার ময়দানের শহীদ মিনারের চূড়াটি রাজনৈতিক কর্তারা টুকটুকে লাল রঙে রাঙিয়ে তুলেছিলেন। সেই অবিমৃষ্যকারিতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এবারেরটার আয়ু কতদিন?

এক স্তাবক সব ট্যাক্সির রঙ নীল-সাদা করতে চেয়েছিলেন। ট্যাক্সিওয়ালাদের প্রবল প্রতিবাদের মুখে তাঁকে বলতে হয়েছে, হলুদ কালো রঙই থাকবে।

আর এক স্তাবক শহরের বাড়ির রঙ নীল-সাদা করলে পুরকর ছাড়ের কথা বলেও আপাতত চেপেচুপে আছেন। সম্ভবত তাঁকে কেউ স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, এই ধরনের বৈষম্য করতে হলে ভারতের একটি দ্বিতীয় সংবিধান রচনা করতে হবে।

এত রঙের বাড়াবাড়ি কেন?

সত্যিই কি ক্ষমতাসীন শাসককুলের সকলেরই গাছে, রেলিঙে, গিরীশ ঘোষের বাড়িতে সাদা-নীল রঙ ভাল লাগছে?

নাকি ভাল না লাগলেও (ওষুধ খাওয়ার মতো) ভাল লাগা উচিত বলে তাঁরা মনে করছেন?

নাকি নন্দনশাস্ত্র ছাড়াও এর পিছনে অন্য বিদ্যা, যেমন হিসাবশাস্ত্র বা অর্থশাস্ত্র রয়েছে?

সুদীপ্ত সেনগুপ্ত

Tags: