নারী 'শিক্ষা'

By মৌপিয়া নন্দী | Last Updated: Thursday, December 20, 2012 - 15:48
 
মৌপিয়া নন্দী  

ঘটনা-১: বীরভূমের গ্রামে ভিন সম্প্রদায়ের এক যুবকের সঙ্গে গল্প করার অপরাধে নগ্ন করে ঘোরানো হল আদিবাসী কিশোরীকে। সেই ছবি ভিডিও রেকর্ডিং করে ছড়িয়ে দেওয়া হল মোবাইল থেকে মোবাইলে।

ঘটনা-২: মুম্বইয়ের বহুতল। লিফটম্যানের হাতে নৃশংসভাবে খুন আইনজীবী পল্লবী পুরকায়স্থ। জেরায় আততায়ী কবুল করল পল্লবী পাত্তা না দেওয়ায় বদলা।

ঘটনা-৩: কলকাতার নাদিয়াল থানা এলাকা। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানোর অপরাধে নীলোফারের ধড় মুণ্ড এক কোপে আলাদা করলেন দাদা। অনুতাপহীন ঘাতকের সগর্ব ঘোষণা সমাজ ও পরিবারের সম্মান রাখতেই বোনকে চরম শিক্ষা।

ঘটনা-৪: দিল্লির রাজপথে বাসের মধ্যে তরুণীকে গণধর্ষণ। আঘাতের ওপর আঘাত। ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হল চলন্ত বাস থেকে। মারধর তরুণীর পুরুষসঙ্গীকেও।

নতুন এক ফ্যাশন হালফিলে খুব উঠেছে। একটা ধর্ষণ হল কি না হল সমাজ জুড়ে শুরু হয়ে গেল কোরাস হুক্কা হুয়া। কী এক নতুন জীব আমদানি হল, নারীবাদী। শুরু হয়ে গেল গলাবাজি। আর আদেখলা মিডিয়াগুলোও হামলে পড়ল ওমনি। ধর্ষকের শাস্তি চাই, মহিলাদের নিরাপত্তা চাই। মোমবাতি নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ল অর্বাচীনের দল। আরে বাবা ধর্ষণটা হল কেন সেটা একবারও ভাববি না? নিরাপত্তার চাবিকাঠি তো তোমার নিজের হাতেই মামণি। তুমি সভ্য ভব্য হয়ে থাকো। ভারতীয় সংস্কৃতির কথা মাথায় রেখে শরীর ঢেকেঢুকে রাখো। সন্ধে নামার আগে বাড়ি ঢোকো। ব্যাস! নিশ্চিন্দি। তা নয়, তুমি সমাজ রীতিনীতিকে তুড়ি মেরে আধুনিক হবে। নিজেকে পুরুষের সমান ভাববে। ট্যাক্সির মিটার নিয়ে বা লিফটের সুইচ নিয়ে মুখে মুখে চোপা করবে আর পার পেয়ে যাবে? সে তুমি প্লেন চালাতে পারো বা বাক্যবাগীশ উকিল হতে পারো, মাল্টিন্যাশনালের টপে বসে ছড়ি ঘোরাতে পারো। কিন্তু ভুললে চলবে না ফাইনালি তুমি মেয়েছেলে। তোমার দপদপানি সহ্য করার থেকে মৃত্যুও শ্রেয়। হ্যাঁ, পড়াশোনা করতে দেওয়া হচ্ছে, চাকরি বাকরি করছ সেটাও মেনে নিচ্ছি। কিন্তু লিমিটটা তো ভুললে চলবে না। দু'পয়সা রোজগার করছ বলে সংসারে মতামত দেবে বা দু'পাতা পড়াশোনার সুযোগ দিচ্ছি বলে হাতকাটা জামা পরে সেল্ফ চোজেন মজনুর সঙ্গে মৌজ করতে যাবে, এই বেলেল্লাপনা সহ্য করি কী করে! তাই শিক্ষা দিতে হবে। উচিত শিক্ষা। দৃষ্টান্তমূলক শিক্ষা। যাতে আর কোনও মেয়েমানুষ এই নচ্ছারপনার সাহস আর না পায়।

আরে বাবা এই সমাজটাকে গড়তে যুগ যুগ ধরে কত ঘাম, রক্ত, বীর্য ঝরাতে হয়েছে বাপ পিতামহদের। ভুঁইফোড় বাচাল ক'টা মেয়ের জন্য সেইসব মূল্যবোধ রসাতলে যাবে আর হাতে চুড়ি পরে বসে থাকব সে বান্দা পাওনি। স্বাধীনতাটা তোদের দিল কে? তা বলে লাটাইটা ছেড়ে দেব আর তোমরা উদ্বাহু নৃত্য করবে, নিজেদের পুরুষের সমকক্ষ ভাববে, এত আশা করো না। বিদ্যেবুদ্ধির যতই বড়াই করো, মনে রেখো, ওপরওয়ালা আমায় ইনবিল্ট পৌরুষটা দিয়ে পাঠিয়েছে। ওখানেই তোমাদের পারমানেন্ট ল্যাক। পেটে ভাত না থাকলে সহ্য করতে পারি। কিন্তু পৌরুষে ঘা! নৈব নৈব চ।

এই যে কথায় কথায় পুরুষতন্ত্রকে কাঠগড়ায় তুলছ, বুকে হাত দিয়ে বল তো তোমার পরিত্রাতা কে? লেডিজ সিটের সামনে কেউ অসভ্যতা করলে কাতর হরিণনেত্রে সাহায্য চেয়ে দেখ না! ফুলন্ত বাইসেপ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ব তোমায় রক্ষা করতে। কিন্তু বাছা, নিজে যদি রুখে দাঁড়াও, প্রতিবাদ করো, অতটা সহ্য করা যাবে না। তখন কিন্তু দল বেঁধে বলব আসলে তোমরই ব্যাড ইনটেনশন ছিল। এমন বীরপুঙ্গব থাকতে তুমি অবলা নারী নিজেই নিজের দায়িত্ব নেবে? ওটা হেব্বি পৌরুষে ঘা দেয়। অসহায় অসহায় মুখ করে আশ্রয় চাও। কাঁধ বাড়িয়ে দেব সোনামণি। কিন্তু পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জিন্দেগি বুঝে নিতে চাইবে নিজের মতো করে, এত বাড় বেড়ো না। আর রোজগারের ধান্দায় বাড়ির বাইরে পা রাখা মহিলাদের বাওয়া সতীত্বের গুমোর মানায় না। তোমার চাকরি, পদোন্নতি, ইনক্রিমেন্ট কি কাজের জোরে? ধাপ্পা দেওয়ার জায়গা পাওনি? আসল তো তোমার ৩৪-২৪-৩৬! বাসে-ট্রামে ছোঁয়াছুঁয়ি নিয়ে অত শুচিবাই কীসের? আর আবদার দেখ! তুমি ডিভোর্সি দুই ছেলের মা মাঝরাতে পাবে যাবে। আর তোমায় ফুল বেলপাতা চড়িয়ে পুজো করব? বেচারা বর কেন তোমায় রিজেক্ট করল, গুহ্য কোনও কারণ আছে কি না, হন্ডা সিটির ব্যাকসিটে ক্যাজুয়ালি পরখ করতে চাইলে রেপ!!! আমায় ছাড়ো, একশোটা মহিলাকেই পুছো না গিয়ে। নব্বইজন তোমাকেই দুষবে। পাক্কা।

একবার ভেবে দেখ দেখি কত স্বাধীনতা দেওয়া হয় তোমাদের? ঘরের বাইরে পা রাখছ এই তো ঢের। কিন্তু বাঁধা গরু ছাড়া পেয়ে দিল্লাগি করে বেড়াচ্ছ কী তোমরা বডি বারোয়ারির ঢাক। তখন নাকে কান্না কেঁদো না। কর্তৃপক্ষ দায়ী না। জমিয়ে শিক্ষা দিতে তখন কিন্তু হাত কাঁপবে না। আর বেয়াড়া মেয়েমানুষকে শিক্ষা দেওয়া পবিত্র কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। মুনিরকার বাস হোক বা গ্রেটার কৈলাশের ঢাউস ফ্ল্যাট, কী হেমতাবাদের আমবাগান। তফাত নেই বিলকুল। পরনে ন্যাতাকানি পাতাখোর থেকে অ্যাফ্লুয়েন্ট ক্রোড়পতি-এই একটা বিষয়ে সাম্যবাদ জিন্দাবাদ।

তবে হ্যাঁ, একপাল কুলাঙ্গারও আজকাল আমদানি হয়েছে পুরুষসমাজে। চেহারায় পুরুষ কিন্তু মিনমিনে কিছু পাবলিককে ওই মোমবাতি মিছিল টিছিলে দেখা যাচ্ছে। পুরুষজাতের কলঙ্ক ওগুলো। শোন ভাই, হিসেবটা সাফ সাফ বুঝে নাও। জানো তো, পিঁপড়ের পাখা হয় মরিবার তরে? নমনীয়, কমনীয়, বাধ্য মেয়ে হয়ে থাকো। কিচ্ছুটি হবে না। কিন্তু পোশাকে আশাকে প্রোভোক করবে ক্রমাগত, ছোট ঝুলের স্কার্ট পরে টোপ দেবে, নিয়ম নিগড়কে বুড়ো আঙুল দেখাবে আর পৌরুষ জলাঞ্জলি দিয়ে ভ্যারেন্ডা ভাজব, সরি, পারলাম না।

আর ডেথ পেনাল্টি-ফেনাল্টি বলে চমকিও না! শহীদ ধনঞ্জয়ের দিব্যি, ওসবে ভয় পেলে কীসের পৌরুষ? ওরে পাগল, বেয়াদপ মেয়েকে উদোম করে দল বেঁধে সবক শেখানোয় যে ফুলটুস মস্তি, তার জন্য দশ বার ফাঁসিতে লটকাতেও পিছপা নই।

পার্ক স্ট্রিট নিয়ে শোরগোল হবে। দিল্লির ঘটনা নিয়ে সংসদে ঝড় উঠবে। কিন্তু সমাজ রক্ষক আমরা রক্তবীজের মত মাথা তুলব শহর-শহরতলি-গ্রামে-গঞ্জে। অতএব বোনটি, থাকো না বাবা নেকু-পুষু-মুনু হয়ে। অন্যথায়...

মৌপিয়া নন্দী



First Published: Thursday, December 20, 2012 - 15:48
TAGS:


comments powered by Disqus