আমাদের পুজো

By সোমশুভ্র মুখোপাধ্যায় | Last Updated: Friday, September 30, 2011 - 20:15
 
সোমশুভ্র মুখোপাধ্যায়  

এসে গেল আরও একটা পুজো। সেজে উঠছে প্রতিটি মণ্ডপ। পাড়ায় পাড়ায় ব্যস্ততা। নিদ্রাহীন কুমোরটুলি। আবারও একটা পুজোয় মেতে উঠতে তৈরি হচ্ছে বাঙালি।
কিন্তু সত্যিই কি আমরা ততটা মেতে উঠতে পারি? লাগামহীন আনন্দে ভাসিয়ে দিতে পারি নিজেকে? প্রশ্নটা এই জন্য যে আমরা কি এই চার-পাঁচটা দিনকে বাকি দিনগুলি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারি ? আমাদের প্রত্যেকের জীবনই তো গতকালের সঙ্গে আজ, আজকের সঙ্গে আগামিকাল অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তাহলে হঠাত্‍ করে কীভাবে আমরা বিচ্ছিন্ন করব আমাদের গতকালকে! বছরভর রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক হিংসা, খুন, চোরাগোপ্তা মার যেখানে, যেখানে দারিদ্র, অপুষ্টি, অনটনের মধ্যেই কোনওমতে দিনাতিপাত, সেখানে সপ্তমীর সকালে কীভাবে আমাদের ভাবনা থেকে সম্পূর্ণ লুপ্ত হয়ে যাবে সবকিছু! এ যেন ভয়ের দিন নিয়ে কেটে যাওয়া আমাদের জীবন। শাসক সবসময়ই শাসন করবে। শাসনের আগে 'সু' অক্ষরটি বসালেও শাসন কমে না। পাড়ার যিনি দাদা তাঁকে ভয়, রাস্তায় যাঁর ক্ষমতা বেশি তাঁকে ভয়, অফিসে উর্ধ্বতনকে ভয়, রাজ্যের শাসনভার যাদের হাতে, তাকে ভয়, দেশ শাসন করছে যারা, তাদের ভয়। বিরুদ্ধ কথা বললেই ভয়। প্রতিবাদ করলেই ভয়। চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করলেই ভয়। এই ভয় কীভাবে কাটাব আমরা এই চারদিনে! ভয় কাটে না, তাই পুজোয় মেতে থাকার
চেষ্টাটাও অনেকটা মরিয়া।

এসবই হয়তো ঠিক, কিন্তু এটাই বোধহয় একমাত্র বা শেষ সত্য নয়। কারণ এই ভয়ের জীবনই ফুত্কারে ওড়াতে পারে ভয়কে। কারণ আমরাও জানি, যাঁকে আমরা ভয় করছি, তিনিও একদিন চলে আসবেন ভয়ের বৃত্তে। যেমন রক্তকরবীর রাজাও একসময় ভয় পেয়ে ওঠে, বিসর্জনের রঘুপতি কান্নায় ভেঙে পড়ে। সমষ্টি জেগে উঠলে ভয় পায় শাসক। কারণ তখন ওই বিচ্ছিন্ন আমি আর বিচ্ছিন্ন নই, গতকালের আমিও নই, আমি তখন 'আমরা' হয়ে উঠি। নিজেকে মিশিয়ে নিতে পারি এই মানবস্রোতে। পুজো সেটাই করে। মানুষ এখানে মানুষের সঙ্গে মিলতে পারে। তখন একটা মানুষই সমগ্র হয়ে ওঠে। এজন্যই আমরা পুজো করি। পুজোর কাছে ঋণও এখানেই।

সোমশুভ্র মুখোপাধ্যায়



First Published: Friday, September 30, 2011 - 20:15
TAGS:


comments powered by Disqus