পিঙ্কি প্রহসন

By মৌপিয়া নন্দী | Last Updated: Friday, July 6, 2012 - 21:46
 
মৌপিয়া নন্দী  

এক বিরল প্রাণীর আবির্ভাবে তোলপাড় শহর, মফস্বল, গাঁ। বাসে- ট্রামে, রকে, চায়ের ঠেকে জোর জল্পনা তাকে নিয়ে। পিঙ্কি প্রামাণিক। উত্সুক জনতার উদগ্র কৌতূহলের কেন্দ্রে সোনাজয়ী এই অ্যাথলিট। তাঁকে একঝলক দেখতে SSKM এর চাতাল, সিঁড়ি, এমনকি অনাদরে বেড়ে ওঠা অপুষ্ট গাছগুলো ভরে উঠেছে। পিঙ্কির বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনেছেন জনৈক মহিলা। তাঁর অভিযোগ, পিঙ্কি আসলে পুরুষ।

প্রথমেই বলে রাখি, পিঙ্কির বিরুদ্ধে ধর্ষণের যে অভিযোগ তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অভিপ্রায় বা অধিকার কোনোটাই আমার নেই। নির্দোষ হলে তা প্রমাণের দায় পিঙ্কির। অন্যথায় যথাযোগ্য শাস্তি তাঁর পাওয়া উচিত। কিন্তু পিঙ্কির লিঙ্গ নির্ধারণের নামে যে সার্কাস চলছে তাতে চুপ থাকি কী ভাবে? কী নিষ্ঠুর পরিহাস! গোটা কেরিয়ারে কোনো সোনালি দৌড় পিঙ্কিকে এত এয়ারটাইম এনে দিতে পারেনি। দিতে পারেনি প্রভাতী দৈনিকে প্রথম পাতায় স্থান। ক্রিকেটে মজে থাকা বাঙালী ফিরে তাকায়নি বাগমুন্ডির তিলকডিহি গ্রাম থেকে উঠে আসা এই অ্যাথলিটের দিকে। আর আজ যেভাবে তিনি পাদপ্রদীপের আলোয় তা বোধহয় দুঃস্বপ্নেও পিঙ্কি কামনা করেননি। প্রণব-মমতা শীতযুদ্ধ, আলু-লঙ্কার আকাশছোঁয়া দাম, ইউরো কাপ- "আরে ছাড়ো ইয়ার। আগে দেখি পিঙ্কির কেসটা কী"। এফ.এম-এ ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্ন, মেডিক্যাল টেস্ট ছাড়া কী ভাবে জানা যায় পিঙ্কি ছেলে না মেয়ে? উপচে পড়ছে কলারের ফোন। বনগাঁ থেকে বাটানগর - হঠাত্‍ স্মার্ট, রগুড়ে শ্রোতা বাতলাচ্ছেন হাজারো উপায়। পিঙ্কির অনাবৃত শরীরের ক্লোজ আপ MMS বাহিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে মোবাইল থেকে মোবাইলে। রসালো চর্চার উপকরণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে তাঁর শরীরের গঠনগত অসঙ্গতি, যাতে তাঁর বিন্দুমাত্র ভূমিকা থাকার কথা নয়। যে অসঙ্গতি সম্ভবত প্রাণপণে গোপন রাখতে চেয়েছিলেন পিঙ্কি। তাঁর সেই একান্ত ব্যক্তিগত, নিভৃত সঙ্কট আজ খোলাবাজারে যাচাই হচ্ছে খুল্লামখুল্লা। যে প্রাণীটি নারী না পুরুষ তা বুঝতে হিমসিম খাচ্ছেন দুঁদে ডাক্তাররা তার আবার RIGHT TO PRIVACY কী? অতএব ক্যামেরার সামনে কর্তব্যনিষ্ঠ পুরুষ পুলিস আরো জাপটে ধরেন পিঙ্কিকে। প্রিজনভ্যান থেকে হাসপাতালের সামান্য দূরত্ব জুড়ে তাঁকে গিলতেই পারে কুন্ঠাহীন বিস্মিত চোখ। যে দৃষ্টিতে অনুচ্চারিত আকাঙ্ক্ষার বুদবুদ "আরে একবার প্যান্টটা খুলে দেখলে ক্ষতি কী?"

পিঙ্কি নারী কিনা প্রমাণিত নয়। তাই তথাকথিত নারীবাদীদের দায় নেই পিঙ্কির হাত ধরার। আর পুরুষতান্ত্রিক সমাজের যুগপ্রাচীন ঢালও আড়াল দেবে না পিঙ্কিকে। পিঙ্কি বিচ্ছিন্ন। পিঙ্কি নি:সঙ্গ। সুতরাং তাঁর শরীরের মাপজোক, আকার আকৃতি নিয়ে বিদ্রূপ মস্করা চলতেই পারে লাগামহীন। উপলব্ধি করার চেষ্টা করছি, নারী পুরুষ বোধ হওয়ার আগে থেকেই যে নারী হিসাবে বেড়ে উঠেছে তার শরীরে সম্পূর্ণ বিপরীত সত্তার জাগরণ কি বিপুল সঙ্কটের জন্ম দিতে পারে? সংবেদনবর্জিত সমাজ থেকে প্রাণপণে নিজের এই সঙ্কট আড়াল করার চেষ্টা কি খুব অস্বাভাবিক? আর সেই আড়াল যখন এক ধাক্কায় ভেঙে চৌচির ,তার লিঙ্গ যখন অনুবীক্ষণের তলায় -সেই বিপর্যয়ের গভীরতা মাপার চেষ্টা করছি আমরা? লিঙ্গ তো শুধু শরীরের গঠন নয়, লিঙ্গ তো আসলে আজন্মলালিত একটা সত্তা। সেই সত্তাটাই যখন গবেষনাগারে কাঁটাছেড়ার বিষয় হয়ে ওঠে, ছুঁয়ে দেখতে চাইব না তার যন্ত্রনাটা? আগল দেব না শোভনতাহীন আগ্রাসী কৌতূহল আর হঠাত্‍ চাগাড় দেওয়া সস্তা রসবোধে?

আবারও বলি, পিঙ্কি যদি ধর্ষণ করে থাকেন, ধর্ষক পিঙ্কি ন্যূনতম সহানুভূতির যোগ্য নন। তাঁর শাস্তি কামনা করি। কিন্তু প্রকৃতির বেখেয়ালে শারীরিক অসঙ্গতির শিকার পিঙ্কির কি প্রাপ্য এই হৃদয়হীন ব্যবহার? গত তিন সপ্তাহ ধরে আমাদের মত দায়িত্বজ্ঞানহীন সহনাগরিকের দ্বারা প্রতিনিয়ত কি ধর্ষিত হচ্ছেন না পিঙ্কি? তার বিচার কে করবে? তিনি দোষী হোন বা নির্দোষ, ভবিষ্যতে ঘরে বাইরে পথে ঘাটে বিদ্রূপে শাণিত চোখ জিভ রেহাই দেবে তো তাঁকে? আচমকা নিদারুণ বেআব্রু হয়ে পড়া শরীর মন তাঁকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে দেবে? তামাশার ছলে আমরা কি চিরতরে কেড়ে নিলাম না তাঁর স্বাভাবিক জীবনের অধিকার? আর তাই জেলের স্যাঁতস্যাঁতে কুঠুরির অন্তরালই হয়ত এই মুহূর্তে পিঙ্কির একমাত্র সাহারা। কারণ, শুধু বিরল নয়, পিঙ্কি প্রামাণিক এখন সবচেয়ে বিপন্ন প্রাণীর নাম।



First Published: Friday, July 6, 2012 - 21:46
TAGS:


comments powered by Disqus