দু'টাকার কার্নিভাল

By শময়িতা চক্রবর্তী | Last Updated: Saturday, July 7, 2012 - 23:49
 
শময়িতা চক্রবর্তী  

মাঝে মাঝেই জানতে ইচ্ছে করে, কলকাতার গরিব মানুষেরা ঠিক কী খায়। এই ২০০ টাকা কেজি লঙ্কা আর ৪০ টাকা কেজি আলুর শহরে যেখানে মধ্যবিত্ত মানুষই কোনো রকমে ঘাড় গুঁজে সক্কাল সক্কাল বাজার থেকে ফিরে প্লাস্টিক উপুড় করে দিয়ে দেখে দুমড়ানো পটল, রোগা রোগা আধমরা ঝিঙে, টিকটিকির লেজের মত সরু হলদে হয়ে যাওয়া ডাঁটা আর অন্ধ্রের বাসি পোনা মাছের ২০০ গ্রাম ১০০ টাকার ওপর খসিয়ে দিয়েছে, সেই পরিস্থিতিতে যাঁদের সারাদিনের রোজগারই হয়ত ১০০ টাকা নয়, তাঁরাও তো দিব্যি বেঁচে আছে! কেমন আছে জানি না। তবে আছে। অফিস যাবার সময় পাড়ার বস্তির সস্তা রেডিও থেকে `বিহার কে লালা` আগেও শুনতাম, এখনও বাজে। সমান জোরেই। বাচ্চাগুলো ক্রিকেট খেলার সময় পিঁচুটি-চোখ আর সিকনি-গড়ানো-চোয়াল নাড়িয়ে আগেও গুষ্টি উদ্ধার করে গালি দিত। এমন নয় যে, সেই খিস্তির দমক এখন কমে গিয়েছে। রিক্সাওয়ালার দল পাড়ার মোড়টায় রাত হলেই গোল হয়ে বসে আগেও চোলাই খেত, এখনও খায়। মানে, রাজার হালে তো আগেও ছিলও না, নেই। সে তো বোঝাই যায়। একটু খোঁচালেই কথাবার্তায় বেরিয়েও আসে এই আগুন বাজারে কী করে বেঁচে আছে! তবু, বেঁচে তো আছে! নিজেদের মতন করে ভালও আছে, যেটা আমাদের মতন লোকেরা বুঝবেন না।

তা, রহস্যটা কী?

আমাদের বাড়িতে ধুপ বেচতে আসেন একটা বউ। রোগা হাড় জিরজিরে চেহারা। কণ্ঠার নালি উঁচু হয়ে আছে। জ্যালজ্যালে শাড়ি পরা। মাস গেলে দেড় হাজার টাকা রোজগার। দু'খানা বাচ্চা। বর ভেগে গেছে অন্য মেয়েমানুষের সাথে। তা, তিনিও তো টিঁকে আছেন। এই পরশুই দেখলাম তাঁকে। গনগনে রোদে পার্কের বেঞ্চিতে বসে আঁচল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাওয়া খাচ্ছে। পাশে রাখা বিক্রির মাল। হাতে একটা ঠোঙা। সেখান থেকে মাঝে মাঝে সাবধানে ভেঙে মুখে পুরছেন। যাতে তাড়াতাড়ি শেষ না হয়ে যায়। কৌতূহলবশত সামনে এগিয়ে গেলাম, কী খায় দেখতে। একটু লাজুক হেসে দেখালেন। দু'খানা মুড়ির মোয়া। চিটচিটে গুড়ে বানানো। বললেন, বাসি হয়ে গেলে নাকি স্বাদ খোলতাই হয়। কী রকম? না, বাসি গুড় পেটে গেলে, আর তার সঙ্গে যদি জল খাওয়া যায়, সেই জল মিয়োনো মুড়িকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তোলে। তার সাথে চিটচিটে গুড়। পেট ভর্তি রাখে অনেকক্ষণ। দিব্যি আছেন এ সব খেয়ে। সারা দিন রোদের মধ্যে বাড়ি বাড়ি ঘুরতে তো আটকাচ্ছে না!

কলেজের রাস্তায়, হাজরা মোড় পূর্ণ সিনেমার দিকে থেকে আরেকটু এগিয়ে গেলে, এক বিহারী ছাতুওয়ালা বসে। ঝকঝকে ডেকচি, থালা, বাটি, সাথে প্যাকেটে-করা ছাতু, লঙ্কাগুঁড়ো, বিটনুন, চিনি, পেঁয়াজকুচি। দুপুরের দিকে ঠেলাওয়ালা, রিক্সাওয়ালা, রাজমিস্ত্রি, দেশোয়ালি ভাইদের ভিড়ে ফুটপাতে দাঁড়ানো যায় না। হাতে হাতে ছাতু মেখে আবদার মত নুন-পেঁয়াজ-লঙ্কা বা চিনি মিশিয়ে শালপাতায় মুড়ে দিচ্ছে। মাক্কালীর দিব্যি, জাস্ট পড়তে পারছে না। বিকেল গড়ানোর আগেই সব শেষ। যাঁরা চিনি পার্টি, তাঁদের মধ্যে যদি কেউ ভাগ্যবান থাকেন, মানে হয়তো আজ রোজে দু'টাকা বেশি লাভ হয়েছে, তাঁরা পাশেই বসে থাকা কলাওয়ালার কাছ থেকে একটা কলা কিনে নেয়। কেউ আবার এক টুকরো মুখে পুরে, `আরে এই কলাটায় দাগ আছে, ভাই গন্ধ ছাড়ছে` এমন সব অদ্ভুত গুপি দিয়ে মাঝে মাঝে আরেকটা কলা নিয়ে নেয়। কলাওয়ালা গজগজ করে, চেঁচামেচি করে, কখনওবা মুখখিস্তি। কিন্তু আজ পর্যন্ত কাউকে ফেরাতে দেখিনি। সেই কলা নিয়ে ছাতুর মধ্যে মাখে। অনেকক্ষণ ধরে এই মাখামাখি চলে। তারপর, যখন চিনির দানা আর কলার মণ্ডের মধ্যে চোখ এবং হাত দিয়ে কোনও তফাত বোঝা যায় না, তখন একটা গামছা বিছিয়ে ফুটপাতের ওপরেই বসে যায়। সামনে দিয়ে এত লোক যাচ্ছে। এত গাড়ি, ধুলো, ধোঁয়া, কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তারিয়ে তারিয়ে সেই খাওয়া, যেন কোথাও কোনও কাজ নেই, কোথাও যাওয়ার নেই, এই ছাতুতেই পরম মোক্ষলাভ, যতক্ষণ শেষ কণাটুকুও টিকে আছে। সেই খাওয়া দেখতে দেখতে আমি বহুদিন দাঁড়িয়ে পড়েছি। ফিরেও তাকায়নি আমার দিকে। জানে, এই খাবার শেষ করেই আবার ছুটতে হবে কাজে। হয়ত বাড়ি সেই সোনারপুর বা বাগুইআটির বস্তি। বা হয়তো কাছেপিঠেই কোনও এক কামরার ১০ ফুট বাই ১০ ফুটে সাত- আটজন মিলে গাদাগাদি আর ঠেসাঠেসি। মোট কথা, জানে যে এই খাবার শেষ করেই পরের ট্রিপে ছুটতে হবে। ছুটি পেতে পেতে, আর তারপর চোলাইয়ের টায়ার চিপকে প্যাকেট ভর্তি করে চানাচুর ছোলাভাজা নিয়ে আস্তানায় ফিরতে সেই সাড়ে দশটা, এগারোটা। ট্রেন ধরতে হলে তো কথাই নেই। এই সময়টুকু মন দিয়ে পেটের প্রতি সুবিচার না করলে শরীর চলবে? সময় কোথায়, কোন অদ্ভুত-দর্শন চিড়িয়া দাঁড়িয়ে পড়ে তাদের খাওয়া দেখতে দেখতে মনে মনে দেশ ও দশ উদ্ধার করছে এবং ব্লগ নামানোর কথা ভাবছে, তার দিকে নজর দেবার?

তবে শুধু ছাতু নয়, একটু ভেবে দেখলাম মশলা মুড়িও অনেক অনেক গরিব মানুষের বাঁচার খাবার। আমাদের অফিসের নিচেই একজন বসে। মুড়ি মেখে, তেল দিয়ে অথবা না দিয়ে, অনেকে আবার কতদিনের পুরনো তেল আর তার উপর এই গরম--সাতপাঁচ এ সব ভেবে শুকনোই খেতে চায়। চানাচুর, পেঁয়াজকুচি, কাঁচালঙ্কা দিয়ে গোল কৌটোর মধ্যে বেশ নাড়িয়ে ঝাঁকিয়ে একটা হামানদিস্তা ধরনের জিনিস দিয়ে পুরো ব্যাপারটাকে ঘাঁটার পর ঠোঙায় ঢেলে উপরে সাজিয়ে দেয় একটা নারকেলের টুকরো। এই নারকেল হল 'আইসিং অন দ্য কেক'। এটা না হলে পুরো ব্যাপারটার সৌন্দর্যই মাটি। বেশির ভাগ হাটুরে মানুষজনকে দেখেছি নারকেলটা একদম শেষে খেতে। মানে, হয়তো শেষ গ্রাস মুড়ি খাবার পরেও নারকোলের অল্প একটু টুকোরো বেঁচে রইল। সেটা পরম তৃপ্তিতে চিবোতে চিবোতে এক ঘটি ঠান্ডা জল খেল। এখানেও সম্ভবত প্রিন্সিপলটা একই। জল পেয়ে পেটের ভেতর মুড়ি ফুলে উঠবে। সাথে যোগ হচ্ছে নারকোলের আধ চিবোনো ছিবড়ে। যাই হোক, এক ঠোঙা পাঁচ টাকা। তবে মাঝখানে একবার পেঁয়াজের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যাবার পর, তখন শীতকাল, পেঁয়াজের বদলে মুলো কুচি দিয়ে মাখছিল দেখেছিলাম। সেই মুলো বাজারে পড়তে না পরতেই হিট! এমনকী অনেকে কিনতে এসে দাবি করত যে মুলো কুচোতে হবে না, এমনি-ই মুড়ি-চানাচুর মেখে আস্ত মুলোর টুকরোটা তার ওপর দিয়ে দেওয়া হোক! তবে শীতকাল চলে যেতেই মুলোর বাজার পড়ল। আবার যথাস্থানে ফিরে এল পেঁয়াজ। নারকেল কিন্তু স্বমহিমায় বিরাজমান! এই বিক্রেতাদের কাছে খাতা খোলা থাকে।

মানুষের গরিবির তো আর শেষ নেই। ঠিক যেমন শেষ নেই তার খিদের। ফলে অনেকে এমনকী এই পাঁচ টাকাও সব সময় দিয়ে উঠতে পারে না। কিন্তু ব্যাপারীরা মুখ চেনে। জানে, ঠকাবে না। মাসের শেষে এসে দিয়ে যাবে ঠিকই।

এই সব দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, আমাদের রোজকার জীবনের অতি তুচ্ছ কমদামি খাবারগুলোও এদের কাছে কতটা মহার্ঘ্য। যেমন, সিঙারা। একটা ছোটখাটো মিষ্টির দোকানের পুঁচকে ময়দা-সর্বস্ব সিঙাড়ার, যার ভেতরে আলু আছে নামমাত্র এবং মনে রাখতে হবে আমি পাড়ার মোড়ে মোড়ে অনাদরে গজিয়ে ওঠা অসংখ্য নাম না জানা মলিন মিষ্টির দোকানের কথাই বলছি। কোনও মাড়োয়ারি চৌকির সামোসার কথা না। তা, এদের দাম বড়জোর দুই থেকে আড়াই টাকা। এমনকী আমরাও সাধারণত এসব দোকান থেকে সিঙাড়া কিনি না। বাঙালি আজকাল মশলা আলু দিয়ে তৈরি জাম্বো-সামোসা খায়। কিন্তু কোনওদিনও কাউকে মশলা-মুড়ি নিয়ে সামনের ওই মিষ্টির দোকান থেকে একটা দু'টাকা দামের সিঙাড়া কিনে খেতে দেখিনি। খিদেটা হয়ত আরো বেশি করে মরত। তবু, কিনে খেতে পারে না।

তবে সন্ধে নামলে একটা ডেলিকেসির সামনে ভিড় বাড়তে দেখেছি। তা হল ফুচকা। সেখানে অবশ্য মেয়ে বৌদেরই ভিড়ই বেশি। হাসাহাসি ঠেলাঠেলি। 'এই লঙ্কা দিও না, ওর ফুচকাটা বড় আমারটা মিইয়ে গেছে, আরেকটু তেঁতুলজল দাও, আরে এতগুলো খেলাম একটা ফাউ দেবে না', তার মধ্যেই এর পুঁচু ওর বাপ্পার প্যান্ট টেনে খুলে দিয়েছে, চ্যাঁ ভ্যাঁ কান্না চুলোচুলি। 'অ্যাই আমার টার্নের ফুচকা ওকে দিলে কেন, দাও দাও একটু বেশি করে আলু তো দাও কিপ্টেমি কোরো না, কতদিনের খদ্দের আমরা তোমার'--এই সব, সব কিছু নিয়ে প্রতিটা ফুচকার গাড়ি তখন কার্নিভালের কেন্দ্র। যদিও আজকাল ফুচকার দাম বেড়ে গেছে, তাই চুরমুর বেশি বিক্রি হচ্ছে। একই টাকায় যে পরিমাণ চুরমুর পাওয়া যায়, তাতে মা আর একটা বাচ্চার হয়ে যায়। মা একবার খায়, বাচ্চাকে এক চামচ করে দেয়। ঝালে হুশহাশ করছে, জল গড়াচ্ছে নাক চোখ দিয়ে, কিন্তু তাও শালপাতা চেটে চেটে সাফ করে দেবার পরে তেঁতুলজলটা ঠিক চাই!

আমি দেখেছি, এই নোংরা খাবার খেয়ে অসুখ করবে এই বাইটা আমাদের মধ্যবিত্তদের বেশি। এদের তো অসুখ করে না! রাস্তায় গামছা বিছিয়ে খেলেও না, পুরনো তেলে মাখা মুড়িতেও না, তেঁতুলজলেও না। আসলে এরা মনে হয় জানে যে, আমায় বেঁচে থাকতেই হবে। কারণ এই দশ ফুট বাই দশ ফুট জীবনে, ঘামতে ঘামতে ঝাঁ-ঝাঁ রোদের মধ্যে রিকশা টানার জীবনে, অন্য কিছু চাই না। আর চাইলেও তো পাবে না, তাই বেঁচে থাকাটাই একটা উত্সব। শুধু বেঁচে থাকা, ব্যস, আর কিছু না। তার পরে যা কিছু আসবে, একটা পাকা কলা বা একটুকরো এক্সট্রা নারকেল, সব-ই তো কার্নিভাল! এই দুর্দান্ত বেঁচে থাকার চালচিত্রে আরেক কাঠি বাড়তি রং। সবেধন পাঁচটাকা দেবার পরে আর এক্সট্রা দু'টাকা দিতে গেলেও যাঁদের পান্তা ফুরোয়, তাঁরাও তো বেঁচে থাকবেন! হৈ হৈ করে বাঁচবেন। ইন্ডিয়া ওয়ার্ল্ডকাপ জিতলে পাড়ায় পাড়ায় ব্যান্ড পার্টি বেরোবে, আর সামনে রং মেখে নাচতে নাচতে যাবেন এঁরাই। বস্তির ভিসিআরে `বাজিগর` দিলে এদের ভিড় সামলানোর জন্য পুলিস ডাকতে হবে। শোলেতে অমিতাভ 'ইয়ে দোস্তি তোড়..' দিয়ে মরে যাবার সময় এঁদের দুঃখে ভারি হয়ে থাকবে কলকাতার গুমোট নোংরা আকাশ। পুজোর সময় এঁদের কুটি মেয়েই প্যান্ডেলে অসুরকে দেখে আঙুল তুলে বলবে `ঢিসুম`। আর এঁদের ছেঁড়া ইজের পরা হলদে দাঁতের বাচ্চা ছেলেটাই চটের ওপর শুয়ে শেষ রাতের আধো ঘুমে স্বপ্ন দেখবে, কলকাতার নোংরা আকাশ থেকে নেমে আসা একটা পরি পেঁয়াজ-মুলো মাখা একথালা মশলা মুড়ি আর আধমালা নারকেল নিয়ে এসে সামনে রেখে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, আর বলছে `খা, পেটভরে খা`।

শময়িতা চক্রবর্তী



First Published: Saturday, July 7, 2012 - 23:49
TAGS:


comments powered by Disqus