ছায়াযুদ্ধ বনাম অঞ্জন দত্ত

কোথায় যেন পড়েছিলাম, অনেক নবাগত লেখকের প্রথম বদভ্যেস হল, নিজের জীবনের গল্পটা নিয়েই প্রথম উপন্যাসটা লিখে ফেলা। তার পর নাকি ভাল লেখার মতো উপকরণ খুঁজে পান না। এমন ধারণা মনে মনে পোষণ করে সন্তুষ্ট থাকার বিশেয কোনও কারণ নেই। প্রয়াত বিশ্বসাহিত্যিক সুনীল গাঙ্গুলির প্রথম উপন্যাস আত্মপ্রকাশ-এর গৌরবে কিছুমাত্র আঁচড় লাগে না। বহু স্বনামধন্য বিশ্বখ্যাত পরিচালকই আত্মজীবনীমূলক ছবিটি বানিয়েছেন কেরিয়ারের প্রায় শেষ অধ্যায়ে।

Updated: Nov 28, 2012, 03:54 PM IST

শর্মিলা মাইতি
দত্ত ভার্সেস দত্ত
রেটিং- *
কোথায় যেন পড়েছিলাম, অনেক নবাগত লেখকের প্রথম বদভ্যেস হল, নিজের জীবনের গল্পটা নিয়েই প্রথম উপন্যাসটা লিখে ফেলা। তার পর নাকি ভাল লেখার মতো উপকরণ খুঁজে পান না। এমন ধারণা মনে মনে পোষণ করে সন্তুষ্ট থাকার বিশেয কোনও কারণ নেই। প্রয়াত বিশ্বসাহিত্যিক সুনীল গাঙ্গুলির প্রথম উপন্যাস আত্মপ্রকাশ-এর গৌরবে কিছুমাত্র আঁচড় লাগে না। বহু স্বনামধন্য বিশ্বখ্যাত পরিচালকই আত্মজীবনীমূলক ছবিটি বানিয়েছেন কেরিয়ারের প্রায় শেষ অধ্যায়ে। প্রায় purgation এর কাজ করে সেই ছবি। মাঝেমধ্যেই সে ছবি হয়ে ওঠে কনফেশন বক্স। জীবনের যাবতীয় স্মৃতি ও অনুভূতির ফেনায় কাণায় কাণায় পূর্ণ। আশ্চর্যের বিষয় এটাই, সেই ছবির পরের ছবি থেকেই কেমন যেন হারিয়ে যান সেই পরিচালক। আর যে-ছবিই বানান না কেন, খুঁজে পাওয়া যায় না সেই পরিচালককে।

দত্ত ভার্সেস দত্ত ছবিটি দেখতে যাওয়ার আগে এই ধরনের কোনও স্ট্রেটকাট আইডিয়া মাথায় নিয়ে যাইনি। দেখার পর অবধারিতভাবে কথাগুলো কিলবিল করে উঠল মাথার ভিতরে। পরিচালক হিসেবে এখনও ঝাকঝকে সচল অঞ্জন দত্ত কেনই বা এমন শেষ অধ্যায়মূলক প্লট ভাবলেন এবং সেই প্লটের নৌকোয় চেপে নিরুদ্দেশে পাড়ি দিলেন, ক্রিটিক নয়, দর্শক হিসেবে সেটাই প্রথম প্রশ্ন। বাস্তবিক অর্থেই ছবিটা এক কথায় ছেলের সঙ্গে কম, ছায়ার সঙ্গে বেশি যুদ্ধ করেছেন মিস্টার দত্ত।
একটু কাঠখোট্টা ভাষায় বললে, আনকোরা বক্তার হাতে মাইক্রোফোন ধরিয়ে দিলে সে বক্তব্যের শুরু আর শেষটা ঠিক করে উঠতে পারে না। অঞ্জন দত্তের মতো অভিজ্ঞ পরিচালকও নিজের গল্পটা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন। জীবনের যাত্রাপথের শুরু দার্জিলিং-এর পাহাড়, কনভেন্ট স্কুল, গিটারের তার ছেড়ে হঠাত্‍ই কলকাতার এক কলহপ্রিয় আবহে এসে পড়া, জীবনের বহু ঘাত-অভিঘাত পেরিয়েও অভিনেতা হওয়ার ইচ্ছেটাকে মেরুদন্ডের মতো সোজা রাখা, অবশেষে মৃণাল সেনের কাছ থেকে ডাক পাওয়া এই সরলরেখার স্টোরিটা বলতে গিয়ে বড় শ্লথ হয়ে গেলেন যেন। এমন অযাচিত সব এলিমেন্ট ঢুকে পড়ে ব্যাপারটা এলোমেলো করে দিল।
যে-গল্পটা প্রোমোশনাল প্যাকেজে পেয়েছিলাম, অঞ্জন দত্ত এখানে নিজের বাবার ভূমিকায়। ছেলে, অর্থাত্‍ রিল লাইফ অঞ্জন দত্তের ভূমিকায় রণদীপ বসু। রিয়্যাল লাইফে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আপন নাতি। পরিচয় উল্লেখ করলাম একটাই কারণে। পুরো ছবিতে সেরা প্রাপ্তি এবং আবিষ্কার এই কিশোর। অপূর্ব স্ক্রিন প্রেজেন্স, অভাবনীয় সাবলীল অভিনয়। বাংলা ছবি আগামী দশক এঁর থেকে অনেক কিছু আশা করবে। সে প্রসঙ্গ পরে হবে, রণদীপকে পিভট হিসেবে ধরলে এ ছবির গল্পে অনেকেই এসেছেন। দিদি চিনা (অর্পিতা চ্যাটার্জি), মা (রীতা কয়রাল), বাবার গোপন প্রেমিকা রুণুমাসি (রূপা গাঙ্গুলি) যাঁর প্রপার্টি-সংক্রান্ত লিগ্যাল কেস কোনওদিনই মেটে না, জামাইবাবু (কৌশিক সেন), দাদু (দীপঙ্কর দে) যাঁরা ছোট দত্তের বড় হয়ে ওঠার পথে কিছু মাইলস্টোন। ছোট দত্তের স্মৃতি আর ভাবনার উপর ভর করেই এগিয়েছে ছবি। হাফটাইম পর্যন্ত বসে দেখলে মনে হয়, এ ছবির পরিচালক কী সত্যিই অঞ্জন দত্ত? ছাদের উপর দুঃসম্পর্কের কাকার সঙ্গে ভাইঝির প্রেম শুকোতে দেওয়া শাড়ির আড়ালে আবডালে, এমন কাঁচা কোরিয়োগ্রাফি আর প্রায়-উইয়ে-কাটা কস্টিউম! কী ভেবে এমন দৃশ্যায়ন, ভেবে উদ্ধার করা অসম্ভব। নেহাত সিনেমাটিক লাইসেন্সেও ব্যাপারটাকে ছেড়ে দেওয়া যায় না।

যে দত্তকে ছবিতে পাওয়া গিয়েছে, তিনি আসলে অভিনেতা অঞ্জন দত্ত। আলুথালু স্ত্রিপ্ট-ও বশে এনেছেন অভিনয়ের চাবুকে। তবু একটা খোঁচ রয়ে গেল। `রঞ্জনা আমি আর আসব না` ছবির পরে তিনি বোধহয় প্রবল আত্মবিশ্বাসে বাংলা ছবিতে পুরুষের স্কিন শো চালু করছেন। যেভাবে বার দুই ছবির মধ্যেই ক্লোজ শটে, গোড়ালি থেকে হাঁটু পেরিয়ে উরু পর্যন্ত তাঁর রোমশ পা দুখানি দেখান হল.. তাতে এর বেশি কিছু ভাবা যাচ্ছে না। উর্ধ্বাঙ্গে শার্ট-টাই, নিম্নাঙ্গে কিছুই নাই। পরকীয়া প্রেমিকাকে হাপুস-চুম্বনের সময়েও এই ফ্যাশন স্টেটমেন্ট বজায় রেখেছেন। যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা অসম্ভব। আবেগ দিয়ে তো আরওই নয়।
উড়ে বেড়ানো ভাবনাগুলো সেকেন্ড হাফ -এ একটু দানা বাঁধানোর চেষ্টা হয়েছে। উড়ো ফানুশ অবশেষে মাটি ছুঁয়েছে। বাবার সঙ্গে ছেলের দ্বন্দ্ব আর মৈত্রী, দুটোই দক্ষতার সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য করা হয়েছে। মন ছুঁয়ে যায় ক্লাইম্যাক্স সিন। এই প্রথম মেঘ থেকে উঁকি দেয় অঞ্জন দত্তের পরিচালকসুলভ মেধা। অর্পিতা চ্যাটার্জিকে ভীষণ ফ্রেশ আর ঝকঝকে দেখাচ্ছে। অনায়াসে আবার নায়িকা হিসেবে ছবি করার কথা ভাবতে পারেন তিনি। পরিশীলিত অভিনয়ের ছাপ রেখেছেন রূপা। রীতা কয়রালও দারুণ।
সব কথার শেষে, আবার রণদীপ। স্মার্ট, সুদর্শন, প্রাণবন্ত, অনায়াস। অঞ্জনের ছেলে হিসেবে একটু হলেও মিসকাস্ট। তবে অভিনেতা হিসেবে? প্রায় গানের মতোই গুনগুন করতে থাকে মনের ভেতরে। শেষ হয় না।

By continuing to use the site, you agree to the use of cookies. You can find out more by clicking this link

Close