সেরা অভিনয় অ্যান্টনি প্রসেনজিতের, স্বর্গীয় কবীর সুমন

শর্মিলা মাইতি ছবির নাম: রেটিং: ***1/2

Updated: Jan 23, 2014, 08:26 PM IST

শর্মিলা মাইতি
ছবির নাম:
রেটিং: ***1/2

বছরের প্রথম মাসেই টলিউডের উপহার যেন উপবাসভঙ্গের স্বাদ। যে-বছরটা শেষ হয় চাঁদের পাহাড়ে উত্তরণ দিয়ে, পরের বছরের শুরুটা এমন এক অনির্বচনীয় অনুভূতি সত্যিই যেন মনে হয় নতুন কোনও সিনেমা জগতে আছি। যে-জগতটা শুধুই “ডিফারেন্ট” সিনেমার ঠেলাঠেলি ভিড় নেই আমিই শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করবার তাগিদ নেই। বরং ভালত্বের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সত্সাহস আছে।

গত বছর ডিসেম্বরে চাঁদের পাহাড়ের সঙ্গে একই দিনে মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল এ ছবিরও। শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলানো হয়। ঘটনাটা ঘটলে একটা আনাড়ি লড়াইয়ে হারিয়ে যেত দুটি ছবিরই দ্রষ্টব্য ও শ্রোতব্য বিষয়গুলি। জাতিস্মর ছবির প্রোমোশনে অবশ্য অ্যান্টনি ফিরিঙ্গির রিমেক বলে দাবি করা হয়নি। প্রসেনজিতের চরিত্র পূর্বজন্মে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি ছিলেন, ইতিহাস যাকে প্রায় উধাও করে দিয়েছে। কোনও এক অজানা রাজনৈতিক কারণে। সম্পূর্ণ অজানা না হলেও অস্পষ্ট তো বটেই।

সঙ্গীত, যা আসলে জাতধর্মনির্বিশেষে সকল কণ্ঠের সঙ্গমস্থল, বাস্তবে তা কখনও ঘটেই না! অ্যান্টনি হতে চেয়েছিলেন বাঙালি কবিয়াল। তখনকার গোঁড়া হিন্দু সমাজের কাছে যা ধর্মবিরুদ্ধ। ম্নেচ্ছ-অনুপ্রবেশে হিন্দুধর্মে অস্তিত্বরক্ষার সংকট হব। অ্যান্টনির জীবনের বহু না-জানা ইতিহাস বহন করছে এক স্মৃতি। যে স্মৃতি বাহ্যিক স্থিতি এই ২০১৩ সাল। আগে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। হঠাত্ই তাঁর পূর্বজন্মের স্মৃতি ম্লান করে দিয়েছে তাঁর বর্তমান জীবনের অস্তিত্বকে। এক অদ্ভুত দ্বৈতসত্তা তাঁর মস্তিষ্কে অনবরত ক্রিয়াশীল।

প্রসেনজিতের অভিনয় তর্কাতীতভাবে জীবনের সেরা। আর এখান থেকেই শুরু পরিচালক হিসেবে সৃজিতের দক্ষতা। যে দক্ষতা দিনের আলো দেখতে পেয়েছে কবীর সুমনের কণ্ঠস্বরে। সারা জীবন নিংড়ে নির্যাস নিয়ে যিনি বেঁধেছেন এ ছবির সুর... অপূর্ব সব কবির লড়াইয়ের দৃশ্য। ব্রজেশ্বরীর ভূমিকায় অনন্যা চট্টোপাধ্যায় যে-অভিনয়টা করলেন, তাতে মনে হয় এ ছবিতে খুব কমই ব্যবহার করা হল এঁকে। ভোলা ময়রার চরিত্রে খরাজ অনবদ্য.. সবার চেয়ে অনবদ্য অ্যান্টনি প্রসেনজিত্‍। স্টার থেকে অভিনেতার স্তরে সফল উত্তরণ।

গল্প বলার ধরণ এ ছবিতে এক তৃতীয় শক্তি যোগ করে। সৌমিকের কথা-বলা-ক্যামেরা ও বোধাদিত্যর এডিটিং নিয়ে একটাই উপমা মনে আসে। এঁদের হাতে কাপড়ের পুতুল ধরিয়ে দিলেও এঁরা অসাধারণ ফিল্ম বানিয়ে ফেলবেন। অনেকগুলো দক্ষ হাত একসঙ্গে ভাল কাজ করলে, সব ভাল মিলেজুলে গিয়ে একটা স্বর্গীয অনুভূতির সৃষ্টি হতে পারে, জাতিস্মর তার উদাহরণ হয়ে থাকবে। বার বার ফ্ল্যাশব্যাক ও ফ্ল্যাশফরোয়ার্ড। আঁকাবাঁকা রুটে চলতে থাকা গল্পের রাশ টেনে ধরে মিউজিক। প্রায় ২০০ বছরের গানের বিবর্তনরেখা পাওয়া যাবে এ ছবিতে। একঝাঁক তরুণ ও মধ্যবয়স্ক গায়কের মেলা। বাংলা ছবির ইতিহাসে ঊজ্জ্বল সাক্ষী হয়ে রইল। তেমন কোনও এক্সপেরিমেন্টেশন না হলে এ মুকুট কেড়ে নেওয়া সহজ হবে না।

আর এক আবিষ্কার যিশু। প্রয়াত ঋতুপর্ণ ঘোষের নিজের হাতে গড়া। অভিনয়ে এমন একটা আশ্চর্য় মায়াময় গভীরতা এনেছেন, যেটা বেশ কষ্টসাধ্য। তবু তাঁর মধ্যে কষ্টের কোনও ছাপ নেই। বরং বেশ অনায়াসেই কাজ করেছেন তিনি। রিয়া সেন ও রাহুল বেশ স্মার্ট। যদিও তাঁদের চরিত্রের অবতারণা, গল্পে অতিরিক্ত কিছু যোগ করে না। মায়ার ভূমিকায় স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় বেশ সপ্রতিভ। কিন্তু সৌদামিনীর চরিত্রে তাঁকে অত ভাল মানায়নি। সতীদাহের চিতা থেকে সদ্যযৌবনা সৌদামিনীকে উদ্ধার করেছিলেন অ্যান্টনি। বিবাহ করে নিজের কাছে রেখেছিলেন। এই সময়ের মেক-আপ ও বাচনভঙ্গি আরও বেশি সচেতনতা দাবি করে। গল্পের গতি শ্লথ, কিন্তু গানের আবেশ এমনই মায়াময় যে কখনও মনে হয় না যে বড় বেশিক্ষণ বসে আছি। কিছু দৃশ্য বাদ দেওয়াই যেত, স্লো-মোশনের একটুকরো বদনাম উধাও হয়ে যেত তাহলে!