ব্রাত্যজনের জয়জয়কার, সেরা প্রতিভার উত্থানপর্ব শুরু

গত বছরটা বলিউড ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে পিন আপ করা থাকবে অবশ্যই। কারণটা বাণিজ্যিক। শত শত কোটির রেভিনিউ জেনারেট করে বলিউড এখন বড়লোক। তথাকথিত অন্য ধারার ছবি-র রিস্ক নিতে প্রস্তুত। এ বছর দর্শকও প্রস্তুত শুধু অন্য কিছু নয়, আরও কিছুর প্রত্যাশায়। ঠিক এই চাহিদা আর প্রাপ্তির দড়ি-টানাটানির মুহূর্তে ছ বলে ছটি ছক্কা মেরে ইতিহাস গড়ল কাই পো চে। এমন একটা অল-রাউন্ড কাজ, যেখানে কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য খাবলা-খাবলি হবে না লেখক আর প্রোডিউসারের। পুরো কৃতিত্ব ভাগাভাগি হবে ক্যামেরার পেছনের আর সামনের মানুষগুলোর সঙ্গে।

Updated: Mar 1, 2013, 02:10 PM IST

শর্মিলা মাইতি
ছবির নাম: কাই পো চে
রেটিং: *****
গত বছরটা বলিউড ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে পিন আপ করা থাকবে অবশ্যই। কারণটা বাণিজ্যিক। শত শত কোটির রেভিনিউ জেনারেট করে বলিউড এখন বড়লোক।তথাকথিত অন্য ধারার ছবি-র রিস্ক নিতে প্রস্তুত। এ বছর দর্শকও প্রস্তুত শুধু অন্য কিছু নয়, আরও কিছুর প্রত্যাশায়। ঠিক এই চাহিদা আর প্রাপ্তির দড়ি-টানাটানির মুহূর্তে ছ বলে ছটি ছক্কা মেরে ইতিহাস গড়ল কাই পো চে। এমন একটা অল-রাউন্ড কাজ, যেখানে কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য খাবলা-খাবলি হবে না লেখক আর প্রোডিউসারের। পুরো কৃতিত্ব ভাগাভাগি হবে ক্যামেরার পেছনের আর সামনের মানুষগুলোর সঙ্গে।
অস্কার-পুরস্কারের সুরভি এখনও সমাহিত হয়নি। বলিউড অভিনেতা ও কলাকুশলী অভিনীত লাইফ অফ পাই পেয়েছে চার চারটি অস্কার! ঠিক কতটা পথ পেরোলে ভারতীয় ছবিও বিদেশি ছবির বিভাগে শেষ পর্যন্ত অস্কার জিতে নিতে পারবে জানা নেই, কিন্তু রিভিউ শুরুর আগে জানাই- আবেগ রাজনীতি সমাজ এবং অর্থনীতির এমন অবিচ্ছেদ্য গাঁটছড়া, এমন ভারতীয়ত্বের জয়জয়কার সাম্প্রতিককালের কোনও ছবিতে দেখা যায়নি। কপাল ভাল থাকলে এ বছরের শেষে, অস্কার বাছাই লিস্টে এ ছবির নাম দেখলে আশ্চর্য হব না। অপেক্ষা করব সেই দিনটির জন্য যেদিন ডলবি থিয়েটারে কলাকুশলীরা সবাই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবেন। (অবশ্য জানা নেই, সেরা বিদেশি ছবির সম্মানে এমনটা হয় কি না। ভাবতে তো লাইসেন্স লাগে না!)

আসি ছবিতে। লাইফ অফ পাই যদি সমুদ্রের মাঝে এক একাকী মানুষ ও পশুর জীবনদর্শন দেখিয়ে থাকে, তবে কাই পো চে নিঃসন্দেহে এক সমষ্টির জীবন উল্লাস। বেঁচে থাকার মন্ত্র। যৌবনের জয়জয়কার। লেখক চেতন ভগতের থ্রি মিসটেকস অফ মাই লাইফ পড়ে অনেক সমালোচকই নাক সিঁটকেছিলেন। মধ্যবিত্ত গ্রেডের পটবয়লার, সস্তায় নাম কেনার আদর্শ উদাহরণ, ইত্যাদি প্রভৃতি নানা বিশ্লেষণে বিভূষিত এই লেখকের উপন্যাস থেকেই টেক-অফ পয়েন্ট। যতই বলা হোক, হাল আমলের জনপ্রিয়তম লেখক চেতন ভগত একটা বিষয়ে পেছনে ফেলে দেবেন অনেক তাবড় কলমচিকেও। শহুরে মধ্যবিত্ততা। এইমনস্তত্ত্বকে এপিঠ-ওপিঠ পড়ে ফেলেছেন তিনি। কাজেই অভিষেক কপূর- চেতন ভগত জুটির ইগো ক্ল্যাশের চেয়ে মস্তিষ্কের মেলবন্ধন হয়েছে বেশি। রক অন ছবির পর অভিষেক কপূর জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠতে পারতেন সহজেই। কিন্তু কাগজে-কলমে-ইন্টারনেটে নাম হয়েছিল ফারহান আখতারেরই। এ ছবি আরও একজনের অ্যাসিড টেস্ট। স্ক্রিপ্টরাইটার পূবালী চৌধুরী। রক অন ছবির আইডিয়া থেকে স্ক্রিপ্টের প্রতিটি লাইন যাঁর অকল্পনীয় পরিশ্রমের ফল। নামের বেলা যাঁকে ব্রাত্যই রাখা হয়েছিল। স্ক্রিপ্টরাইটারের লিস্টে উঠে আসবে আরও একটি নাম। সুপ্রতীক সেন।আগে থেকে বলে নিই এডিটরের নামও। দীপা
ভাটিয়া। এই কজন অনাম্নী পুরুষ-নারীর হস্তশিল্প ছাড়া এ ছবি ভাবা অসম্ভব।

ক্যামেরার পেছনের কারিগরদের নাম আগেই বলে নিলাম। বেশিরভাগ ছবির রিভিউতেই তো এঁরা ব্রাত্যজন। কাই পো চে-র ফুল সার্কল এঁদের ছাড়া অসম্ভব। ছবির পটভূমি গুজরাট। ভারতের শ্রেষ্ঠ উন্নতিশীল রাজ্য। তিন তারকা (উদীয়মান বললে এঁদের অপমান করা হবে, তাই বলি, এ যাবত্‍ ছায়াচ্ছন্ন তিন প্রতিভা), যাদের নাম বইপোকারা সবাই জানে, ঈশান ভাট (সুশান্ত সিংহ রাজপুত) গোবিন্দ পটেল (রাজকুমার যাদব) ও ওঙ্কার শাস্ত্রী (অমিত সাধ) ফিল্মের পরিসরেই কখন যেন প্রতীকচিহ্ন হয়ে দাঁড়ায় আমাদের কাছে। বাহুল্যবর্জিত সেটে ধরা আসল ভারতবর্ষের সত্‍ প্রতিনিধি। ফিল্মি রঙে আক্রান্ত নয়। নেই ওভার-দ্য-টপ অ্যাক্টিং-ও। সুন্দর দেশ, স্বপ্নের দিনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, প্রেম নিয়ে ভাঙা-গড়া, সমাজকে ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্ন ও লুফে নেওয়া সমাধান, সবকিছু মিলিয়ে আদর্শ ছবির কাছাকাছি পৌঁছে দেওয়া। প্রায় অসাধ্য একটি কাজ কেমন হাসতে হাসতে করে ফেললেন এই তিন বন্ধু। যাঁদের বন্ধন সময় আর সমাজকে ছাপিয়েও সত্য।

প্রাণমন ছুঁয়ে যায় অমিত ত্রিবেদীর মিউজিক। একটি ছবির প্রত্যেক ডিপার্টমেন্ট যখন প্রাণ ঢেলে, ব্যক্তিগত ভেদাভেদ ভুলে সৃজনশীলতাকেই শেষ কথা হিসেবে ধরে, তখনই ঘটে যায় ম্যাজিক। যে ম্যাজিকের নাম কাই পো চে। আমার ভোটিং-এ রক অন ও থ্রি ইডিয়টস-এর থেকে দুটো স্টার এগিয়ে। এ বছর মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম ছবি, যা কম করে কুড়িবার হলে টিকিট কেটে দেখলে তবে তেষ্টা মেটে। এ ছবি উত্সর্গীকৃত হোক সেইসব সিনেমাপ্রেমীদের উদ্দেশ্যে, যাঁরা এই বাজারেও ডাউনলোড করে ছবি দেখেন না। বিশ্বাস করুন, কাই পো চে-র ক্ষেত্রে দুধের স্বাদ সত্যিই ঘোলে মিটিবে না!
খুব বেশি বলা হবে কি, যদি বলে ফেলি-
আমির খান, ফারহান আখতার, রাজকুমার হিরানিরা সাবধান! টাফ কম্পিটিশন অ্যাহেড..

By continuing to use the site, you agree to the use of cookies. You can find out more by clicking this link

Close