রানির রানিকাহিনি

Last Updated: Friday, March 21, 2014 - 19:56

শর্মিলা মাইতি

ছবির নাম- কুইন

রেটিং- ****1/2

রূপকথার কাহিনি যেখানে শেষ। রানির স্বপ্ন শুরু সেখান থেকেই। সত্যি যে কোথা থেকে শুরু হয় আর স্বপ্ন যে কোথায় শেষ হয়... লীলা মজুমদারের সেই মনকাড়া কথাকটি বড্ড মনে পড়ে গেল কুইন দেখতে গিয়ে।

আমরা ছবি দেখতে যাই অনেকরকম মেজাজ নিয়ে। এমনও ছবি হয়, যা আপনার মেজাজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলে, আপনাকেই ডোবায়, ভাসায়, ওড়ায়। এক রানির গল্প বলতে গিয়ে পরিচালক বিকাশ বহল যেভাবে একের পর এক জানালা খুলে দিলেন, তাতে মনে হল এক সাতমহলা রাজপ্রাসাদে বেড়াতে এলাম. পৃথিবীর যে-কোনও প্রান্তে, ধর্ম-ভাষা-বর্ণ নির্বিশেষে সব রানিকাহিনি হয়ে ওঠে কুইন। কী বলা যাবে একে? নারীশক্তির জয়, নাকি নারীমুক্তির উপাখ্যান। মাত্র ১৪৬ মিনিটের পরিসরে এত অনুভূতি প্রকাশ করতে বহু বছর পারেননি কোনও পরিচালক। বহুদিন পারেননি কোনও অভিনেত্রী।

হ্যাঁ। মুম্বইয়ের আকাশে এখন একটি নতুন তারা আরও উজ্জ্বল হয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। উপেক্ষার উপাখ্যান পেরিয়ে পরিপূর্ণ একটি নাম- কঙ্গলা রণওয়াত। নামভূমিকায়। জন্ম থেকে আমরা মেয়েরা, মেয়ে হওয়ার ব্রতচারণ করি, আরও বেশি করে মেয়ে হয়ে ওঠার মন্ত্র জপ করি। সে নারী যেমনই অর্থনৈতিক অবস্থায় বেড়ে উঠুন, সব নারীর গল্পই রানির গল্প। শুধুই একটি অক্ষরের অদলবদল।

যে-মেয়েটি আর একদিন বাদে তার বহুদিনের প্রেমিক, লন্ডনফেরত বয়ফ্রেন্ডকে বিয়ে করতে চলেছে, যদি তার প্রিয় পুরুষটি তাকে ডেকে বলে দেয় যে, তাকে আর বিয়ে করার ইচ্ছে নেই? শুরুটা যদি এমনই হয়, তবে শেষটা কেমন হবে। হয়ত মেয়েটি প্রবল প্রতিশোধ নিল। হতাশায় বেছে নিল আত্মহননের পথ। কিংবা সব ঝেড়েঝুড়ে অন্য পুরুষের সঙ্গে সেটল করল... সেসব কিছুই হল না রানির জীবনে। লেখক-পরিচালক তার গল্পটা উড়িয়ে দিলেন আকাশে। খাঁচা ছেড়ে ডানা মেলে উড়ে চলল রানি। তার হানিমুন স্পেস- প্যারিসে! একাকী হনিমুন!

এমন চমকের ঠমকে শুরু, কিন্তু কী প্রচণ্ড গম্ভীর ধমক শভিনিজমকে! এক বাক্যেই অনেক কথা বলে দিলেন পরিচালক। গুটিপোকা থেকে প্রজাপতি হওয়ার পথে রানির ভয়। সারা বিশ্বের অবারিত দ্বারের সামনে জড়সড়, দুর্বোধ্য এক পৃথিবীর সম্মুখিন হয়ে প্রায় বাকরুদ্ধ। রানির যুদ্ধ এখান থেকে শুরু। জানিয়ে রাখি, এই পর্বে কঙ্গনা রণওয়াতের অভিনয় এমনই অপূর্ব, এমনই সমৃদ্ধ যে নিজেরই অজান্তে তিনি ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন।

কী সেই রানিকাহিনি? সমালোচনার রীতি অনুসারে, না বলাই সমীচীন। কিন্তু এই গল্প নবীনা ও প্রাচীনা, সবারই অন্তরমহল ছুঁয়ে যাবে। মনের রুদ্ধ দ্বারগুলো একেএকে খুলে দিয়ে কারামুক্তির পথ দেখাবে নারীকে। রানিকে। তাই বিদেশের মাটিতে নানা দেশ থেকে আসা পুরুষের সে বন্ধু হয়ে ওঠে। প্যারিসের ইন্ডিয়ান অরিজিন ওয়েট্রেস (লিসা হেডেন) তারই অল্টার ইগো হয়ে ওঠে। আর এই গল্প বলতে বলতেই চতুর পরিচালক দিব্য বলতে থাকেন বিশ্ব অর্থনীতির গল্প, ইকনমির ধ্বংসাবশেষ, প্রথম বিশ্বের দেওয়ালের ফাটল, মন্দার বাজারে মুষড়ে পড়া মানবিকতা। এই সমান্তরাল গল্পটা মুচকি হাসির। মিস করলে ভুল করবেন।

যেটা বলছিলাম, রানির রানি হয়ে ওঠার পথে পুরুষ বন্ধুরা... একজন গ্রিক, একজন জাপানি, একজন ব্ল্যাক ফ্রেঞ্চ। সেই সব বন্ধু, যাদের পৌরুষ প্রয়োজনীয় উপপাদ্য নয়, যে-চাহিদা তাদের একত্র করে, তা হল বেঁচে থাকার এক অদম্য প্রয়াস। আর বিশেষ বললাম না, কারণ, কুইন এমনই এক সম্পৃক্ত ছবি যে, প্রতিটি দৃশ্য নিয়েই টেস্টটিউবে পরীক্ষানিরীক্ষা করা যায়। জীবনের নতুন পথে নতুন অঙ্গীকারে খোলা আকাশের নীচে শ্বায় নিতে শেখায়, আমাদের মনের কোণের প্রতিটি নারীকে। প্রতি নারীর রানিকাহিনিকে।

দারুণ ক্যামেরাওয়ার্ক আর অপূর্ব এডিটিং-এর পরিচর্যা, ছবিটিকে নিয়ে যায় অন্য এক উপলব্ধিতে। সবশেষে, আমির খানের টুইটটা রিটুইট করে বলি, কুইন না দেখা থাকলে এখুনি টিকিট কাটুন। অভিজ্ঞতার ঝুলি পূর্ণ করার জন্য।



First Published: Friday, March 21, 2014 - 19:56


comments powered by Disqus