জিও ছাব্বিশ মার খান!

Last Updated: Tuesday, February 12, 2013 - 20:53

ছবির নাম: স্পেশাল ছাব্বিশ
রেটিং: ****১/২
আচ্ছা, খবরকাগজ-চ্যানেলে রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী কিংবা বিজনেসম্যানদের স্ক্যামের কথা জানলে, ভেতরটা কেমন রাগে হিসহিস করে না? কিংবা প্রশাসনের গড়িমসি, রেড-টেপে বাঁধা পড়া অসংখ্য অপরাধের পাহাড় নিয়েও সমাজে ক্ষমতার আসনটা ঠিক পোক্ত রাখতে পারেন যাঁরা, কখনও ইচ্ছে হয় না, নিজেরাই গিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিই? বের করে আনি রাশি রাশি কালো টাকা? ঠিক মারমুখী হয়ে নয়, ধৈর্য ধরে, বুদ্ধি প্রয়োগ করে? ঠিক এইখান থেকে দেখতে শুরু করুন ছবিটা।
ঠিক কুড়ি সেকেন্ডে টানটান উত্তেজনা সৃষ্টি করে এক্কেবারে শেষ সেকেন্ডের ভগ্নাংশ পর্যন্ত রিটেন করা! একটা বিস্ময়বোধক চিহ্ন দর্শকের মনে এঁকে দিয়ে নীরজ পান্ডে ছবিটা শুরু করেছেন। প্রায় ঝড়ের মতো উড়িয়ে নিয়ে গেলেন। আ ওয়েডনেসডে ছবি থেকেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন নীরজ, জনতা জনার্দনের বুকের পাটা কেমন। নাসিরুদ্দিন শাহের চরিত্র সাধারণ মানুষ হয়েও টলিয়ে দিতে পারেন দুর্নীতিতে কাণায়-কাণায় ভরে যাওয়া একটা সিস্টেমকে। আমরা চোখ গোল্লা-গোল্লা করে দেখেছিলাম। তাঁর দ্বিতীয় ছবিকে আসলে একটা মিসাইলের মতো ব্যবহার করলেন তিনি। আমরা, মানে পাবলিকরা, যারা একটুতেই চমকে যাই, অল্পতেই কুঁকড়ে যাই, তাদের ঘুম ভাঙানোর আদর্শ জিয়নকাঠিও বলা যেতে পারে।

ছাপোষা মানুষের কলজেতে যে এত জোর, সেটাই যেন বুক বাজিয়ে বলে গেলেন নীরজের চার প্রোটাগনিস্ট। যে চারমূর্তির টিমলিডার অক্ষয়কুমার (এ. বর্ধন)। সঙ্গে সহযোগী অনুপম খের, রাজেশ শর্মা, কাজল আগরওয়াল। গল্পে ঢোকার আগে লেখক-চিত্রনাট্যকার-পরিচালককে নিয়ে দুচার কথা হোক। অত্যন্ত গভীর গবেষণাপ্রসূত একটি ভ্রান্তিহীন চিত্রনাট্য। ইদানীংকালের সফলতম চিত্রনাট্য যা কোনও বিদেশি বা স্বদেশি গল্প থেকে অনুপ্রাণিত নয়, বাস্তব ঘটনা জোড়া দিয়ে অতি সন্তর্পণে সেলাই করা একটি কাহিনী। ১৯৮৭ সালে রাজীব গাঁধীর প্রধানমন্ত্রিত্বের সময়কাল ধরেছেন। তখন মোবাইল ছিল না। ক্রিং-ক্রিং ল্যান্ডফোন, ফোনট্যাপিং আর ট্রাঙ্ককলের যুগেও ভারতের চারটি প্রান্তে থাকা চারমূর্তি কীভাবে একত্র হয়ে মন্ত্রী আর কালোবাজারিদের উপর চড়াও হন সিবিআই এজেন্ট সেজে, ব্যাপারটা আয়েস করে দেখার মতো। ঝাঁ-চকচকে থ্রিলারও তার কাছে নেহাতই ম্যাড়মেড়ে। সমাজের বড়বড় মুখগুলোয় চুনকালি মাখিয়ে ত্বরিত্গতিতে উধাও হয়ে যায় তারা। নাঃ, এই গ্যাং-এর নাম স্পেশাল ছাব্বিশ নয়। ওটা নয় কোনও অপারেশনের নামও। আসলে সিবিআই, মানে তদন্তসংস্থা যে কতখানি ফাঁপা এবং খোলনলচেবিহীন, সেটাই এফোঁড়ওফোড় করার কায়দা হল এটাই। আসল তাসটা তিনি খেলেছেন একেবারে শেষপর্বে এসে। দর্শকই বোকা বনে যাবেন।

চিত্রনাট্যকে দশে দশ। তর্কের খাতিরে এগারোও দেওয়া যায়। আসি অভিনয়ে। অক্ষয়-অনুপম জুটির কেমিস্ট্রি প্রথমবার পর্দায়। এর আগে যে অক্ষয়কে অক্ষয়-পরেশ-সুনীল শেট্টি টিম নিয়ে হেরা ফেরি করতে দেখেছি টানা তিনটে ছবিতে, তাতে এটা স্পষ্ট, অক্ষয়ের টিমওয়র্ক দারুণ। কোটি টাকার হিরো হয়েও ভিন্ন ধারার ছবিতেও কাঁপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। সবকিছুই বদলে ফেলেছেন তিস মার খান, হাউসফুল ওয়েলকাম-এর নায়ক। ফেক সিবিআই-এর লিডার হিসেবে কী অসাধারণ স্মার্টনেস। স্থির, ভয়ডরহীন একাগ্র চোখের চাহনি। রোম্যান্টিক দৃশ্যে অসম্ভব সূক্ষ্ম। এ কোন খিলাড়ি অক্ষয়কুমারকে দেখছি! টিকে থাকার দৌড়টা যিনি প্রায় কুড়ি বছর ধরে খেলছেন, এখন তাঁর যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী খুঁজে পাওয়া ভার। অনুপম খেরের অভিনয় সম্পর্কে কিছ বলার অপেক্ষা নেই। প্রশংসা প্রাপ্য কাস্টিং ডিরেক্টরের। রাজেশ শর্মা ইতিমধ্যেই পার্শ্বচরিত্রে মোস্ট-ওয়ান্টেড হয়ে উঠেছেন বলিউডে। এই ছবি নিঃসন্দেহে তাঁর মুকুটে পালক যোগ করবে।

সারপ্রাইজ প্যাকেজে পাবেন জিমি শেরগিল আর দিব্যা দত্তকে। এই প্রথম দিব্যা মাত্র একটি ডায়লগ পেয়েছেন। আসলি কাম তো ইয়ে লোগ কর রহা হ্যায়, হাম লোগ তো সির্ফ... কেন এটা রিভিউয়ে লিখলাম, সেটা ছবি দেখতে গেলেই বুঝতে পারবেন। এই একটি বাক্যই প্রায় ছুরির ফলার মতো কেটে বেরিয়ে যায় পচে-যাওয়া একটা সিস্টেমকে। কেন যে এঁদের সারপ্রাইজ প্যাকেজ বলছি, সেটা জানার জন্যও আপনাকে ছবিটা দেখতে হবে।
যত্ন করে করা ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরও প্রায় জাকির হুসেনের তবলার মতো বেজেছে এ ছবির সঙ্গে। রোম্যান্টিক দৃশ্যে প্রাণ ছুঁয়ে যায়, সাসপেন্সের সিনে বুকে কাঁপুনি ধরায়। শেষ দৃশ্যে কিন্তু একটা দাবি রেখেছেন পরিচালক। একটি সিকোয়েল তৈরির। কাজেই আরও একটা ভাল ছবির প্রত্যাশায় একটি এক্সট্রা হাফ-তারা দেওয়া হল রেটিং-এ। সবার শেষে, অনুসন্ধিত্সু পাঠকের উদ্দেশ্যে জানাই, পাবলিকই এখানে স্পেশাল ছাব্বিশ। বুকে বৈপ্লবিক কিছু করার আশা নিয়েও কাজের বেলা চুপ করে বসে থাকে!



First Published: Tuesday, February 12, 2013 - 20:53


comments powered by Disqus