কাহানি বিদ্যা কি

Last Updated: Wednesday, March 28, 2012 - 14:01

জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পর এই প্রথম কলকাতায় মিডিয়াকে সময় দিলেন বিদ্যা বালন। মুঠোয় মোবাইল ধরে প্রায় ৫ ঘণ্টা প্রতীক্ষার পর টানা ১৮ মিনিট সময় দিলেন বিদ্যা। বিদ্যা বাগচি ওরফে বিদ্যা বালানের সঙ্গে ফোনালাপে খোলামেলা আলোচনায় ২৪ ঘণ্টার প্রতিনিধি শর্মিলা মাইতি
প্রঃ
বিদ্যা, শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার জন্য আপনাকে আন্তরিক অভিনন্দন!

বিদ্যাঃ
থ্যঙ্ক ইউ, শর্মিলা।

প্রঃ
যেভাবে আপনি দেশের সব ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডগুলো ছিনিয়ে নিচ্ছিলেন, তাতে জাতীয় পুরস্কার না পাওয়াটাই বরং ইনজাস্টিস হত...
বিদ্যাঃ আমি কিন্তু সেটা মনে করি না। জাতীয় পুরস্কারের পরিধি অন্য সব অ্যাওয়ার্ডের থেকে অনেক বড়। সব ভাষার আঞ্চলিক ছবির নায়িকারাও এই বিরাট গণ্ডির ভিতরে আসেন। হিন্দি ছবি, মানে বলিউড ছবির সব শ্রেষ্ঠ পুরস্কারগুলো পাওয়া সত্ত্বেও একজনের ভাগ্যে জাতীয় পুরস্কার না-ও জুটতে পারে। ওটা অনেক টাফ্ কম্পিটিশন। কারণ ওখানে রিজিওনাল পারফরম্যান্সকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমার ভাগ্যদেবতা প্রসন্ন, তাই অন্য সব ধরনের অ্যাওয়ার্ডসের সঙ্গেই আমি জাতীয় পুরস্কারটাও পেয়ে গেলাম।

প্রঃ আর জাতীয় পুরস্কারের পর কলকাতার মিডিয়াকে দেওয়া প্রথম সাক্ষাত্‍কার এটাই...তাই তো?
বিদ্যাঃ হ্যাঁ। এটাই প্রথম সাক্ষাত্‍কার। বিশেষ করে, কলকাতা থেকে ফোন এলে আমি খুব খুশি হই।

প্রঃ বাংলার মিডিয়া যখন এক দক্ষিণী নায়িকাকে নিয়ে আনন্দে উত্‍ফুল্ল হয়, কেমন লাগে?

বিদ্যাঃ
(বাংলায়) আরে, আমি তো কলকাতারই মেয়ে। আই অলওয়েজ সে দ্যাট, আই অ্যাম আ বেঙ্গলি অ্যাট হার্ট! আমি যে আজ এই পর্যন্ত এসেছি, তার নেপথ্যে তো কলকাতার মানুষই রয়েছেন। আমার প্রথম ছবি গৌতম হালদারের `ভালো থেকো` পুরোটাই কলকাতায় শ্যুটিং...তারপর `পরিনীতা`, শরত্‍চন্দ্রের উপন্যাস। কলকাতায় আর দার্জিলিং-এ শ্যুটিং। তারপর ধরুন, `ভুলভুলাইয়া।` ওখানে আমার চরিত্রের নাম মঞ্জুলিকা। যে একজন বাঙালি নৃত্যশিল্পী। তারপর `কাহানি`...কলকাতার পুরো ক্যানভ্যাস জুড়ে আমি। যদিও এখানে আমি বাঙালি মেয়ে নই। বাঙালি ঘরের বউ। পশ্চিমবঙ্গ আর কলকাতা আসলে আমার ঘরবাড়ি। কেরিয়ারের সূত্রে।

প্রঃ
তার মানে আপনি শতকরা ৭৫ শতাংশ বাঙালি...

বিদ্যাঃ
(হাসি) তাই? কবে আমি ১০০ শতাংশ বাঙালি হব?
প্রঃ হয়তো `কাহানি`-র জন্য জাতীয় পুরস্কার পাওয়ার পর...

বিদ্যাঃ
হাসি...

প্রঃ
সমোলোচকরা এখনই বলাবলি করছেন যে, আপনার ২০১২ সালের জাতীয় পুরস্কারটাও বাঁধা। যে লেভলের পারফরম্যান্স দিলেন আপনি-
বিদ্যাঃ (অবাক) তাই নাকি? ভেরি কাইন্ড অফ দেম টু সে দ্যাট। ভাল লাগছে যে, এত মানুষ অ্যাপ্রিশিয়েট করছেন।
প্রঃ অ্যাপ্রিশিয়েট কী বলছেন! বিদ্যা ম্যাজিক তো কলকাতার কাহিনিই বদলে দিচ্ছে। দর্শক মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দেখছে বিদ্যার `কাহানি`...
বিদ্যাঃ রিয়েলি গড্‍স গ্রেস শর্মিলা। কিন্তু আমার মনে হয়, সিনেমা নিয়ে চিন্তাভাবনা বদলেছে। সিনেমার ভাষাও বদলেছে দ্রুত। দর্শক বুঝতে পারছেন সেই ভাষা, নিজেকে মিলিয়ে নিতেও পারছেন। এখন হিন্দি ছবিতে নায়িকারা শুধুই শো-পিস্ হিসেবে থাকেন না। কিংবা মেয়েদের শক্তিরূপিনী মায়ের ভুমিকায়, কিংবা ভালত্বের সর্বসেরা উদাহরণ হিসেবেও দেখনোর দিন শেষ। সব মানুষই যেমন দোষে গুণে মিলিয়ে তৈরি হয়, তেমনি মেয়েরাও পর্দায় দোষে গুণে ভরা একটি চরিত্র হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। দর্শকরা অ্যাকসেপ্ট করছেও। ভাগ্যক্রমে আমি সেইসব চরিত্রেই অভিনয় করবার সুযোগ পাচ্ছি, যাদের মধ্যে স্ট্রেংথ আর উইকনেস দুটোই আছে। কাজেই, ভ্যারিয়েশনস আছে। আমি বিভিন্ন ধরণের নারীচরিত্রকে পর্দায় তুলে ধরতে পারছি।

প্রঃ বিদ্যা, যে কোনও নারী চরিত্রকে গঠন করার পেছনে পরিচলকের ভূমিকা উপেক্ষা করা যায় না। আপনার কেরিয়ারগ্রাফে পরিচালকদের ভূমিকা কেমন?

বিদ্যাঃ
নিশ্চয়ই। যখন মিলন লুথারিয়া `দ্য ডার্টি পিকচার` ছবির ওয়ানলাইনার নিয়ে এসেছিলেন, আমি ওঁকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারিনি। উনি আমাকেই কেন বাছলেন, সেটার ব্যাপারেও নিশ্চিত হতে পারছিলাম না। তারপর মিলনের সঙ্গে একতা কাপুরও এলেন আমাকে বোঝানোর জন্য। কথা বলতে বলতে মনে হল যে, কখন যেন চরিত্রটার মধ্যে ঢুকে পড়ছি। সিল্কের দুঃখ, কষ্ট, অসম্মান, অবমাননা সবই আমার অনুভূতির জগতে চলে আসছে। আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠলাম যে, আমিও এই ধরণের চরিত্র একাই কাঁধে বয়ে নিয়ে যেতে পারি। আমার বিশ্বাস আর কাজের মধ্যে অনেক ফারাক। কী করে স্ক্রিনে ফুটিয়ে তুলব সেই রক্তমাংসের সিল্ককে? এখানেই মিলন লুথারিয়া এলেন উদ্ধারকর্তার ভূমিকায়। আঙুল ধরে বাচ্চাদের যেমন করে হাঁটতে শেখায় বাবা, ঠিক তেমন ভাবেই মিলন আমাকে সিল্ক করে তুলেছিলেন। মিলন আমায় একজন আদর্শ শিক্ষকের মতো গাইড করেছেন। আমার বিশ্বাস জোরদার ছিল যে, হি উইল মেক আ `ক্লিন` পিকচার আউট অফ `দ্য ডার্টি পিকচার।` অশালীনতার লেশমাত্র না রেখে, দেখুন, উনি কেমন পরিচ্ছন্ন ছবি বানালেন! টিডিপি (দ্য ডার্টি পিকচার) ইজ আ ক্লিন পিকচার, দ্যাট ইজ দ্য বিগেস্ট ট্রাম্ফ অফ দ্য ফিল্ম। মিলন দেখাতে পেরেছেন কতখানি সম্মান দেওয়া যেতে পারে
একজন মহিলাকে। অন্যদিকে সুজয় আমার বন্ধুর মতো। সুজয়ের অনেক স্ক্রিপ্ট এর আগে রিজেক্ট করেছি। এই ছবির চরিত্রটা ভাল লাগায় রাজি হয়েছি। যখন তখন সুজয় ফোন করে আমায় গল্পটা শুনিয়েছে। `কাহানি`-র ভেতরের `কাহানি` টাই ইউএসপি। যেটা বিদ্যাকে তৈরি করতে হয়েছে তিল তিল করে। অ্যান্ড ইট ওয়াজ ওনলি মাই কনভিকশন দ্যাট আই উইল ইনজেক্ট লাইফ ইন টু ইট। একটা গোটা ছবিতে আমার লিপ-এ কোনও গান নেই। গলিঘুঁজির মধ্যে দিয়ে শ্যুটিং। সুজয়কে তো প্রথমে কোনও প্রোডিউসার টাকা দিতে রাজি হচ্ছিল না। শর্ত দিচ্ছিল গেস্ট অ্যাপিয়েরেন্স হিসেবে কোনও নামকরা সেলিব্রিটিকে নিতে হবে। সুজয় কোনও কম্প্রোমাইজের রাস্তায় হাঁটেনি। একদিন আমায় বলল, নিজের বাড়ি মর্টগেজ দিয়ে শ্যুটিং শুরু করবে। আমি ওকে আরও কিছুদিন চেষ্টা করতে অনুরোধ করলাম। তারপর অবশেষে পাওয়া গেল প্রোডিউসার। বিদ্যার চরিত্রটা আমার কাছে চ্যালেঞ্জ ছিল বলতে পারেন।
প্রঃ
বিদ্যা তো কলকাতা মাত করেছেই...সঙ্গে `সিল্ক`-এর দাপটে `শীলা`-`মুন্নি`-`চিকনি চামেলি`-রা সব মুখ লুকোচ্ছে! ব্যাপারটা এনজয় করছেন?

বিদ্যাঃ
(হাসি) তাই নাকি! ওরে বাবা। শুনুন, সিল্ক কিন্তু শুধুই `উ-লা-লা` গার্ল নয়। সিল্ক মানে শুধু নারীর শরীরও নয়। প্রথমতঃ, দর্শক ভালবেসেছে সিল্ককে। দ্বিতীয়তঃ, প্রতিটি মহিলা নিজের জীবনকে কোনও না কোনও ভাবে সিল্কের সঙ্গে আইডেনটিফাই করেছে। তাদের মনের কোনে জায়গা করে নিয়েছে। মোদ্দা কথা, সিল্ক কোনও কম্পিটিশন ছুঁড়ে দেয়নি চিকনি চামেলির দিকে। শরীর ব্যবহার করে শীলা বা মুন্নির সঙ্গে যুদ্ধে নামতে চায়নি। এই জন্যই দর্শক ভালবেসেছে তাকে। সিল্ক জীবনের সব অমসৃণ পথ তার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে, শরীর দিয়ে পার হয়েছে। খুব কঠিন। কিন্তু এই কঠিন পরীক্ষাতেই সিল্ক জিতেছে।

প্রঃ
শরীরের প্রসঙ্গ যখন এল, বিদ্যা, আপনাকে টিডিপি-র জন্য ভীষণভাবে ফিজিক্যাল স্ট্রেস নিতে হয়েছে। তাই তো? চরিত্রের প্রয়োজনে দেহের ওজন অস্বাভাবিক বাড়া-কমা স্ট্রেসফুল তো বটেই!

বিদ্যাঃ
দেখুন, সুযোগটা পেয়েছি এটাই সবচেয়ে বড় কথা। আমি পুরো ১২ কেজি ওজন বাড়িয়েছিলাম। শেষদিকের সিল্ককে জীবন্ত করে তোলার জন্য। ফ্যাট জাতীয় খাবার খেয়ে।

প্রঃ
এখন তো জিরো ফিগার-এর নায়িকারা সেক্সি বিদ্যাকে দেখে রীতিমত প্রমাদ গুণছেন, তাঁদের দিন ঘনিয়ে এল...
বিদ্যাঃ ( হাসি) আপনার বডি টাইপ যাই হোক না কেন, সেটাই সেলিব্রেট করা উচিত্‍। সেটাই সুন্দর, যদি রোগা হও, তা-ও সুন্দর। যদি স্বাস্থ্যবতী হও, সেটাও সুন্দর। ভারতীয় মহিলাদের গড়নে কার্ভস-ই সৌন্দর্য্য বাড়ায়। শরীরের ওপর অযথা জোর খাটিয়ে রোগা হওয়ার কোনও মানে নেই। দেখুন, ১২ কেজি ওজন বাড়িয়েও লোকে আমাকে সেক্সি বলেছে।
প্রঃ তবু সিল্ক চরিত্রের ওপর আপনার জীবনের বাজি ধরা ছিল। ছবি ফ্লপ করলে, অতিরিক্ত মেদবহুল চেহারা, যেটা দর্শক দেখে ফেলেছে, সেটা সমস্যা হয়ে দাঁড়াত না কেরিয়ারে?
বিদ্যাঃ দেখুন সিল্কের ইমেজের কাছে বিদ্যার স্টার পাওয়ার কিন্তু বড় নয়। অতিরিক্ত মেদ জমেছে সিল্কের শরীরে, বিদ্যার শরীরে নয়। বিদ্যা শুধু আশা ভরসা অক্ষুণ্ণ রেখেছে সিল্কের ওপর। এখানেই চরিত্রটা ক্লিক করেছে। আমার তো মনে হয় অভিনেত্রী বিদ্যার ওপর কোনও ক্ষতিকর প্রভাবই পড়ত না।

প্রঃ আজ যখন আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখেন, প্রতিবিম্বে কোনওদিন কেরিয়ারের শুরুর দিকের সংগ্রামী বিদ্যাকে দেখতে পান? তখন কি রাগে ক্ষোভে ফেটে পড়তে ইচ্ছা করে না?
বিদ্যাঃ সত্যি বলছি, একদম না! আয়নায় দেখা অতীতটা খুব সুন্দর। স্বপ্নময়। প্রিয়জনের ভালবাসা। বড়দের আশীর্বাদ। আমার এগিয়ে চলা। সত্যি বলতে কী, অতীতের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। অতীতই গড়ে দিয়েছে আজকের বিদ্যাকে।
প্রঃ কিন্তু সেইসব সুখগুলোর কী হবে, যারা একদিন `চলবে না` বলে লিড রোল থেকে বাদ দিয়েছিল?

বিদ্যাঃ
আমার মনে পড়ে। কিন্তু তাঁদের সম্পর্কে আজ আমার কোনও অভিযোগ নেই। বরং, ওঁরা আমায় জীবনের কঠিন পথটা চিনতে শিখিয়েছিলেন। আমি কৃতজ্ঞ।
প্রঃ আপনাকে এসএমএস করলে উত্তর পাওয়া যায় রাত ৩টে-৪টের সময়। এত রাত জেগে থাকেন কেন? প্রেম, না পরিশ্রম?

বিদ্যাঃ
পরিশ্রম, পরিশ্রম! হার্ড ওয়ার্ক...প্রেম নয়।

প্রঃ
চান্স পেলে কোনও বাঙালি ছেলেকে বিয়ে করবেন? তাহলে কিন্তু আপনি ১০০ শতাংশ বাঙালি হতে পারবেন!
বিদ্যাঃ যা বলেছেন। (বাংলায়) আমার ঘরবাড়ি তো কলকাতাই। শ্বশুরবাড়িটাও বাঙালি হবে কি না জানি না। (ইংরেজি) ভাল বাঙালি পাত্র পেলে তো ভালই হয়। ১০০ ভাগ বাঙালি হতে চাই আমি।

প্রঃ শেষ প্রশ্ন, আপনার বাংলা গানের ভাণ্ডার তো দিন কে দিন বেশ শক্তিশালী হচ্ছে শুনেছি। একটা গেয়ে শোনান।
বিদ্যাঃ (একটু চুপ) আমাকে আমার মতো থাকতে দাও/ আমি নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছি/ যেটা ছিল না, ছিল না...হুঁ...আই থিঙ্ক আই অ্যাম মিসিং দ্য লাইন্‍স...
প্রঃ সেটা না পাওয়াই থাক...
বিদ্যাঃ ইয়েস্‍...(সুর করে) সব পেলে নষ্ট জীবন!
প্রঃ
থ্যাঙ্কস্‍ বিদ্যা।
বিদ্যাঃ থ্যাঙ্ক ইউ। ভাল থেকো।



First Published: Saturday, March 31, 2012 - 20:58


comments powered by Disqus