জঙ্গলমহলে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন

Last Updated: Tuesday, September 27, 2011 - 22:55

জঙ্গলমহলে আরও জোরদার হচ্ছে যৌথ বাহিনীর অভিযান। এই মুহূর্তে ৪১ কোম্পানি আধা সামরিকবাহিনী মোতায়েন রয়েছে সেখানে। মাওবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও ব্যাপক ও দীর্ঘমেয়াদি করতে অতিরিক্ত বাহিনী চেয়ে কেন্দ্রকে চিঠি পাঠাল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। সম্ভবত পুজোর পরেই অতিরিক্ত বাহিনী পৌঁছে যাবে রাজ্যে। যৌথবাহিনী প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি থেকে যা তিনশো ষাট ডিগ্রি উল্টোদিকের অবস্থানে দাঁড়িয়ে।
জঙ্গলমহল থেকে যৌথবাহিনী প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি ছিল গত বিধানসভা ভোটে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রচারের অন্যতম হাতিয়ার। বস্তুত লোকসভা নির্বাচনের আগে থেকেই এনিয়ে বারবার সরব হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গে তেরো মে ভোট গণনার পর, এখন পরিবর্তের জমানায় কিন্তু যৌথ বাহিনী প্রত্যাহারের বিষয়টি থেকে কয়েক যোজন দূরে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর সরকার। জঙ্গলমহলে তথাকথিত "মাওবাদী` অস্তিত্ব নিয়ে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একসময় প্রশ্ন তুলেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী হয়ে এখন তাঁর গলাতেই কড়া হুঁশিয়ারির সুর। যে সিঙ্গুর জমি আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তৃণমূল কংগ্রেস-মাওবাদী সখ্যতা ও আঁতাঁতের শুরু, সেই মঞ্চ থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কড়া বার্তা-খুনজখম আর শান্তি আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না। হত্যার রাজনীতির পথে হাঁটলে তার মাসুল দিতে হবে মাওবাদীদের। অর্থাত শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই তা বিশ বাঁও জলে।ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মাওবাদী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের সংঘাত প্রকাশ্যে চলে আসে। মূলত বন্দিমুক্তি এবং যৌথবাহিনী প্রত্যাহারের ইস্যুতেই বাড়তে থাকে দূরত্ব। ভোটে জিতে এলে জেলবন্দি মাওবাদীদের মুক্তি দেবে সরকার, এই ঘোষণা যে কার্যত ফাঁকা আওয়াজ তা কয়েকদিনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যায়। যে রকমভাবে স্পষ্ট হয়ে যায় যৌথবাহিনী প্রত্যাহারের ব্যাপারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের প্রকৃত মনোভাবটি। সরকারের তৈরি করা যে বন্দিমুক্তি কমিটি, তার সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন থেকে মাওবাদীদের একাংশের মধ্যে। কেন জঙ্গলমহলে নিয়ে আসার মত পরিস্থিতি তৈরি হল? কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করলে বিষয়টি পরিস্কার হবে। দু-হাজার আট সালের ২ নভেম্বর, শালবনিতে জিন্দালদের ইস্পাত প্রকল্পের উদ্বোধন করে ফিরছিল তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কনভয়। পথে ভাদুতলার কাছে কনভয় মাওবাদী নাশকতার মুখে পড়ে।

পুলিস ঘটনায় জড়িত সন্দেহে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। এরই প্রতিবাদে আত্মপ্রকাশ করে পুলিসি সন্ত্রাসবিরোধী জনসাধারণের কমিটি। যা মাওবাদীদের প্রকাশ্য সংগঠন। লোকসভা নির্বাচনের পর শুধু জঙ্গলমহলেই খুন হয়ে যান তিনশোরও বেশি সিপিআইএম কর্মী।
১ ৮ জুন, দু-হাজার নয়। লালগড়ে অভিযান শুরু করে যৌথবাহিনী। কাদাশোলের মত বেশ কয়েকটি জায়গায় শক্ত প্রতিরোধের মুখেও পড়তে হয় যৌথবাহিনীকে। যদিও বাহিনীর এই অভিযান চলাকালীনই বেশ কয়েক বার বড় মাপের নাশকতা ঘটায় মাওবাদীরা। দুহাজার নয় সালের ৮ অক্টোবর, সাঁকরাইল থানায় হামলা চালায় মাওবাদীরা। থানায় মধ্যেই গুলি করে খুন করা হয় দুই পুলিস কর্মীকে। অপহরণ করা হয় ওসি অতীন্দ্রমোহন দত্তকে। দু-হাজার দশের ১ ৮ ফেব্রুয়ারি, শিলদা ক্যাম্পে বিস্ফোরণ ও হামলায় নিহত হন ২৪ জন জওয়ান। হামলার পেছনে ছিলেন মাওবাদী নেতা কোটেশ্বর রাও ওরফে কিষেনজি। ওই একই বছরের ২৮ মে, জ্ঞানেশ্বরী এক্সপ্রেসে নাশকতা ঘটে। ট্রেনলাইনের প্যান্ড্রল ক্লিপ খুলে নেওয়া হয়। ভয়াবহ এই দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় প্রায় ১ ৫০ জন সাধারণ মানুষের। সিবিআই তদন্তেও পরিস্কার হয়ে যায় মাওবাদী ষড়যন্ত্রের কথা।পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন এগিয়ে আসতেই মাওবাদী এবং তৃণমূল কংগ্রেসের আঁতাঁতের অভিযোগ বারবার উঠতে থাকে তত্কালীন শাসক দল সিপিআইএম এবং রাজ্য সরকারের পক্ষে থেকে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যে কোনও "মাওবাদী` অস্তিত্ব মানতেই নারাজ ছিলেন সেসময়। দু-হাজার দশের ৯অগাস্ট, লালগড়ে রামকৃষ্ণ স্কুলের মাঠে জনসভা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সভাকে প্রকাশ্যেই সমর্থন জানায় পুলিসি সন্ত্রাস বিরোধী জনসাধারণের কমিটি। এরইমধ্যে বিধানসভা ভোট এগিয়ে আসতেই ভাঁটা পড়ে যৌথ বাহিনীর অভিযানে। ফের নতুন করে জঙ্গলমহলে নিজেদের শক্তি সংগঠিত করতে থাকে মাওবাদীরা। এবার মাওবাদীদের প্রতিরোধ করতে জন জাগরণ মঞ্চ, ভৈরব বাহিনী-র মতো বেশ কয়েকটি সংগঠন তৈরি হয় । যার নেতৃত্ব দেন তৃণমূল কংগ্রেসেরই স্থানীয় নেতারা। ফলে বাধা পেয়ে ফের খুন। এবার শিকার তৃণমূল কংগ্রেস। শান্তি প্রক্রিয়া এক ধাক্কায় কার্যত বন্ধ। দু`পক্ষই এবার ফের সরাসরি লড়াইয়ের ময়দানে।



First Published: Tuesday, September 27, 2011 - 22:55


comments powered by Disqus