অনার কিলিং; ১৪ দিনের জেল হেফাজত খুনি দাদার

Update: December 8, 2012 14:04 IST

অনার কিলিংয়ের ঘটনায় আজও থমথমে নাদিয়াল। ঘটনার আকস্মিকতায় স্তম্ভিত এলাকাবাসী। অভিযুক্ত মেহতাব আলমকে আলিপুর আদালতে তোলা হলে ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন বিচারক। ময়নাতদন্ত হয়েছে মৃতদেহের। ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে তলোয়ারটি। শুক্রবার নাদিয়াল থানা এলাকায় এই ভয়াবহ ঘটনার রেশ আজও রয়ে গিয়েছে। মোবাইল ফোনে তোলা সেই ছবি ছড়িয়ে পড়েছে আশপাশের এলাকাতেও।

গতকাল পরিবারের সম্মানরক্ষার নামে বোনকে প্রকাশ্য রাজপথে গলা কেটে খুন করে দাদা।। প্রথম 'অনার কিলিং' এর ঘটনা ঘটল খোদ কলকাতার বুকে। বন্দরের কাছে নাদিয়াল থানা এলাকায় শ্বশুরবাড়ি থেকে পালিয়ে আসা অত্যাচারিত বোন নীলফারের মাথা কেটে খুন করেছিল দাদা। পরে সেই কাটা মাথা নিয়েই থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করে খুনি মেহতাব আলম।  

আতঙ্ক কাটেনি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের। ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি  ফিরোজের বৌদি সাব্বু খাতুনের পরিবারও। শনিবার সকালেও থানার সামনে ছিল জনতার ভিড়। এদিন অভিযুক্ত মেহতাব আলমের সঙ্গে নাদিয়াল থানায় দেখা করতে যান তাঁর মা মনসুরা বিবি। ছিলেন বাবাও। আদালতে নিয়ে যাওয়ার পথে মেহতাবের চেহারায়  অনুতাপের কোনও লক্ষণও দেখা যায়নি। বরং  ঠিক কাজ করার বহিঃপ্রকাশ ছিল তার শরীরি পরিভাষায়।

নাদিয়ালে অনার কিলিংয়ের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে বিভিন্ন মহলে। দুহাজার বারো সালে খাস কলকাতার বুকে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন বিশিষ্ট থেকে সাধারণ মানুষ। কিন্তু তার মাঝে এমন প্রতিক্রিয়া পাওয়া গিয়েছে, যা ওই অপরাধের থেকে কোনও অংশে কম অপরাধ নয়। অনার কিলিং। সম্মান রক্ষায় খুন। মারাত্মক এই ঘটনার পরে প্রতিক্রিয়াও উঠেছে চরম স্তরে। নিন্দায় মুখের হয়েছেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। যদিও তার মাঝে মারাত্মক ও নির্মম সমর্থনের প্রতিক্রিয়াও মিলেছে।
নাদিয়ালেরই কেউ এই বর্বরতার সমর্থনেও গলা মিলিয়েছেন। যেখানে দাঁড়িয়ে এই বক্তব্য, এই মধ্যযূগীয় প্রতিক্রিয়া পাওয়া গিয়েছে, সেখানকার মানুষের গলাতেও অবশ্য পাওয়া গিয়েছে ভিন্ন সুর।

শুধু সাধারণ মানুষ নন, এই সময়ে এমন ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন বিশিষ্টরাও। পরিবারের সম্মান রক্ষায় এই খুনের পরেও যেভাবে সামান্য কিছু মানুষ সমর্থন যোগাচ্ছেন তাতে সমাজের পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা বলে মনে করছেন সবাই।

প্রশন এখন একটাই, অনার কিলিংয়ের ভয়ঙ্কর ব্যধি কি খাস কলকাতাতেও এসে পড়ল? মাসতিনেক আগেই নদিয়াতে পরিবারের অমতে বিয়ে করার জন্য বাড়ির লোকেরা পিটিয়ে খুন করেছিল এক কিশোরীকে। তারপরই নাদিয়ালের ঘটনা রাজ্যবাসীকে নতুন করে ভাবাচ্ছে। দেশের অন্য কিছু রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গেও কি এখন মেয়েরা এই নতুন বিপদের শিকার হবে?  কখনও মনোজ-বাবলি, আবার কখনও নিরুপমা পাঠক। কিংবা হয়ত নাম না জানা আরও বহু মানুষ। তথাকথিচ সম্নানরক্ষার নামে যারা শিকার আত্মীয়-পরিজনেরই নৃশংশতার।

দুহাজার সাতে বিয়ে করেছিলেন হরিয়ানার কৈথাল জেলার কারোরা গ্রামের বাসিন্দা মনোজ-বাবলি। দুজনের প্রেমের মাঝে বাধা হয়নি তাঁদের ভিন্ন গোত্র। কিন্তু বাধা হতে দেরি করেনি গ্রামের খাপ পঞ্চায়েত। ফল, বিয়ের কিছুদিনের মধ্যে অপহরণ করে দুজনকেই খুন করা হয়। দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হত্যাকারীদের মৃত্যুদণ্ডের সাজা শোনায় জেলা আদালত।

দিল্লির বাসিন্দা সাংবাদিক নিরুপমা পাঠক হত্যাকাণ্ডও একসময় সাড়া ফেলেছিল গোটা দেশে। খুনের অভিযোগ ওঠে তাঁরই মায়ের বিরুদ্ধে। অপরাধ বলতে, ভিন্ন গোত্রীয় এক পাত্রকে নিজের জন্য বেছেছিলেন ২২ বছরের ওই সাংবাদিক। ঝাড়খণ্ডে বাড়ি গিয়ে এখবর জানানোর পরই সেখানে রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয় নিরুপমার। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট থেকে জানা যায়, শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিল তাঁকে। গ্রেফতার হন নিরুপমার মা। মামলাটি এখনও বিচারাধীন।

অতি সম্প্রতি খোদ রাজধানীর বুকেই সুলতানপুরীতে ঘটেছে অনার কিলিংয়ের ঘটনা। এর শিকার ২৬ বছরের স্কুল শিক্ষিকা। মা, ভাই সহ পরিবারের অন্য সদস্যদের হাতে প্রাণ খুইয়েছেন তিনি। কারণ, নিম্ন গোত্রের পাত্রকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন তিনি। পুলিসি জেরায় খুনের কথা স্বীকার করেছে অভিযুক্তেরা।

সম্মানরক্ষার নামে এধরনের খুনের ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে দেশের কোনও না কোনও প্রান্তে। বিশেষ করে, উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতে এধরনের অপরাধের বাড়বাড়ন্ত সবচেয়ে বেশি।

দেশের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় বাংলার সমাজে নারীর মর্যাদা বেশি বলে গর্ব করে এরাজ্যের মানুষ। প্রথমে নদিয়া, তারপর নাদিয়ালের ঘটনা কি সেই শ্লাঘাকে প্রশ্ন করে? বাংলার সমাজও কি ফিরে যাচ্ছে মধ্যযুগে?

পড়ুন:কলকাতায় অনার কিলিং, বোনের মাথা কেটে আত্মসমর্পণ দাদার






Post Your Comment

Total Comments:4

Nic.....................

dharmio andhatatwoer nidorshan ei ghatana. eke honour killing bola uchit noi borang dishonour killing bola uchit.

I am looking for

নিজেকে খুব অসুরক্ষিত মনে হয় । প্রত্যেক ধর্মান্ধ ধর্মের ভূল ব্যখ্যাকে মেনে এই জঘন্য কাজগুলো করে । তারা বোঝেনা ধর্ম মানুষকে সৃষ্টি করেনি, মানুষই এর রচয়িতা । ধর্মীয় অনুশাসণ কখনো মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা বা সুরক্ষার থেকে বড় হতে পারেনা । প্রাচীণ কাল থেকে যাঁরাই যুক্তিবাদকে প্রচার করতে চেয়েছেন তাঁদের অবস্হাটা কি হয়েছিল ভাবুন, গ্যালিলিও,জিওর্দার্ণো ব্রুনো এরকম কত কেউ । তালিবানরা মানুষের মাথা কেটে ``আল্লাহ আকবর`` ধ্বণি দেয় । ইসলাম ধর্মের অর্থই হল শান্তি । এখনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভগবানের কাছে ইষ্ট লাভের জন্য বলি দেওয়া হয় । সমাজকে শিক্ষিত না করার চেষ্টা করে ধর্মীয় মৌলবাদকে সুড়সুড়ি দেওয়া হয় । অনেক ``কমিউনিষ্ট`` কেও দেখেছি মন্দিরে গেলেন না কিন্তু ঈদে মসজিদের সামনে গিয়ে মাথায় ফেজ পরে ঘোরাঘুরি করছেন । দেশের উচ্চ পদাধিকারীগণও শপথ বাক্য পাঠ,প্রচার,জন্মদিন পালনে ধর্মীয় আশ্রয় নিয়ে থাকেন । মেহতাব আলমের নৃশংশ হত্যাকান্ডের পরেও বীরের ভাব দেখে মনে হয় আমরা কি সত্যিই সভ্য ?

দিন দিন আমাদের সমাজের প্রকৃ্তি এমন হয়ে দাড়িয়েছে যে,আমরা অন্যের সমালোচনা করতে,অন্যের দোষ ধরতে খুব বেশি পছন্দ করি,অন্যের দোষ ঘাটাঘাটি করতে করতে মুখে ফেণা তুলে ফেলি,অথচ খুব ভালো করেই জানি এটা সংশোধনের কোন বাস্তব সম্মত পন্থা নয়।আমরা অবক্ষয় আর অধঃপতন নিয়ে সমালোচনা করার জন্য নিত্য নতুন পন্থা আবিস্কার করে চলেছি অথচ এ সমস্ত অবক্ষয়কে রোধ করার জন্য কোন পদ্ধতি ঠিক ভাবে মানতে আমরা রাজী নই!মনে হয় আমাদের মাথায় একটা কথা খুব ভালো ভাবে গেঁথে গেছে আর তা হল,আমি ছাড়া আর দুনিয়ার সবাই খারাপ।খুব কম মানুষই আমরা চিন্তা করে থাকি যে আমাদের নিজেদের ও অনেক দোষ আছে,সে গুলো সংশোধন করা খুব আবশ্যক।

blog-img আজ যদি চেতনার মাঝে পড়ে আছে লাশ... বহুদিন আগের লেখা একটি লাইন আবারও ধাক্কা মেরে গেল। একটু অন্য পরিসরে। নিউ গড়িয়ার, ঢালুয়া গমকল মোড় আমাদের সবাইকে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সামনে অসংখ্য প্রশ্নমালা। ডাইনে মোরাম বিছানো হতবাক্ সরুগলি। সুদীপ্তর বাড়ির রাস্তা। রাস্তার শেষপ্রান্তে সুদীপ্তদের বাড়ি 'সরগম'। সেখানে প্রায় প্রলাপের মত জেগে রয়েছেন এক বৃদ্ধ। অভ্যাস, অস্বস্তি আর হাপড় টেনে বেঁচে থাকতে চেয়ে বেহালায় ছর টানছেন। স্বরলিপি লেখা কাগজগুলো মাঝে মধ্যেই এলোমেলো হয়ে পড়ছে। যেভাবে মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটের পর থেকে সবটাই যেন কেমন এলোমেলো হয়ে গেছে এই চৌষট্টি বছরের অশক্ত মানুষটির। প্রলাপ। একমাত্র প্রলাপ বলাটাই প্রণব কুমার গুপ্তের সঙ্গে এখন মানায়। সদ্যপ্রয়াত ছেলের কথা বলতে বলতেই বলছেন, "ভায়োলিনটাই এখন আঁকড়ে ধরতে চাইছি, আচ্ছা কী মনে হয় বলুন তো, আবার বাজাতে পারবো তো?" প্রলাপের মত বলে চলা, জলজ্যান্ত প্রলাপের মতই তিনতলা বাড়িটার ওপর নিচ হাতড়ে বেড়ানো। এই সিঁড়িগুলোর বাঁকে যদি একবার দেখা হয়ে যায় তার তেইশ বছরের হারিয়ে যাওয়া ছেলেটার সঙ্গে। তাইতো কথা বলতে বলতেই হঠাত্‍ বলে উঠছেন, "একটু দাঁড়ান আসছি।" আলো আঁধারিতে সিঁড়ি ভাঙছেন সুদীপ্ত গুপ্তর বাবা। যেভাবে জীবনর এতগুলো সিঁড়িগুলো পেরিয়ে এসে হঠাত্‍ই যেন ওঁর মনে হচ্ছে সব সিঁড়িই কেমন যেন থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। বেহালার কাছে ফিরতে চাইছেন প্রণববাবু। পালিয়ে যেতে চাইছেন। পালিয়ে যাওয়ার যে কোনও সিঁড়ি নেই সামনে।