`রেলমন্ত্রী` মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ পুলিসকর্তার

Last Updated: Wednesday, May 22, 2013 - 18:51

রেল মন্ত্রকের সাম্প্রতিক দূর্নীতির মধ্যেই ফের পুরনো এক ঘুষকাণ্ডের কথা প্রকাশ্যে আনলেন এক পুলিসকর্তা। এরাজ্যেরই আইপিএস অফিসার নজরুল ইসলাম সেই দূর্নীতির জন্য কার্যত দায়ী করেছেন এরাজ্যেরই বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী থাকাকালীন ওই ঘটনার কথা এখন ফের লিখিতভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকে জানিয়েছেন তিনি।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে এই চিঠি পাঠানো হয়েছে এরাজ্যের ডিজি এবং স্বরাষ্ট্রসচিবের মাধ্যমে। বর্তমানে রেলমন্ত্রকে যে দূর্নীতির অভিযোগ উঠেছে তার পরিপ্রেক্ষিতেই এই চিঠিটি দেওয়া হচ্ছে বলে গত ১০ মে জানিয়েছেন এরাজ্যের এডিজি প্রভিশনিং ডঃ নজরুল ইসলাম। মধ্যে রেলের চিফ সিকিউরিটি অফিসারের বিরুদ্ধে দূর্নীতির অভিযোগ জানিয়ে ২০১০ সালের ২২ মার্চ একটি চিঠি দিয়েছিল সিবিআই। যার তদন্ত করেছিলেন সেই সময় রেলমন্ত্রীর বিশেষ আস্থাভাজন নজরুল ইসলাম। আর সেই তদন্তকে কেন্দ্র করেই দূর্নীতির হদিশ মিলেছিল। যার উল্লেখ ও বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে এই চিঠিতে।
"আমি রেলমন্ত্রীর মতামত জানতে চেয়েছিলাম। সেই কারণে আমি তাঁর চেম্বারে গিয়ে অভিযোগগুলি দেখাই এবং তাঁর মতামত জানতে চাই। রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, "সিধু অত্যন্ত দুর্নীতিপরায়ণ। ওকে সাসপেন্ড কর। তাড়িয়ে দাও।`` আমি ভেবেছিলাম, উনি দুর্নীতিতে যুক্ত আইপিএস অফিসারের বিষয়ে অত্যন্ত বিরক্ত এবং তার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিতে চান। আমি যথেষ্ট নিষ্ঠার সঙ্গে তদন্ত শুরু করলাম এবং অভিযোগ খতিয়ে দেখে এই সম্পর্কিত আইন এবং নিয়মগুলি খতিয়ে দেখলাম। আমি মুম্বই যেতে চেয়েছিলাম আরও তথ্য সংগ্রহের জন্য। রেলমন্ত্রীর ওএসডি বা অফিসার অন স্পেশ্যাল ডিউটি গৌতম সান্যাল আমায় জানালেন, পুরভোট এসে যাওয়ায় রেলমন্ত্রী আমাকে কাছাকাছি থাকতে বলেছেন এবং মুম্বই যাওয়ায় আপত্তি করেছেন। সুতরাং আমি দিল্লিতে বসেই যতটা সম্ভব তথ্য জোগাড় করে কাগজপত্র তৈরি করলাম। ডিজি, সেক্রেটারি, মেম্বার স্টাফ এবং রেলমন্ত্রীর ওএসডি আমার সঙ্গে কাগজপত্র নিয়ে আলোচনা করল। আমি ব্যক্তিগতভাবে রেলমন্ত্রীর ওএসডিকে জানালাম, রেলমন্ত্রী নির্দিষ্ট করে ওই দুর্নীতিপরায়ণ আইপিএস অফিসারকে সাসপেন্ড এবং বরখাস্ত করতে চেয়েছেন, তাই আমি রেলমন্ত্রীকে পুরো বিষয়টি জানাতে চাই। ওএসডি বললেন, "আমায় প্রথমে আলোচনা করে নিতে দিন। তারপর আপনাকে ডাকব।" কিন্তু আমাকে ডাকা হয়নি।"
 
তদন্তে বেশকিছু তথ্য পাওয়া গেলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে তা জানায়নি রেলমন্ত্রক। সাসপেন্ড করা দূরের কথা, বরং কোনও অনুমোদন ছাড়াই রেলমন্ত্রক সেই অফিসারকে ছেড়ে দেয়। নজরুল অসলাম লিখেছেন, "খবর পেয়েছি, ওই অফিসারকে বাঁচাতেই এই ব্যবস্থা করা হয়েছিল, তবে তার জন্য মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছিল। রেলমন্ত্রীর দফতরে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে যথেষ্ট ঘুষ দেননি ওই চিফ সিকিউরিটি কমিশনার। সেই কারণেই ওই অফিসারের বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ। আর যার তদন্তভার আমাকে দেওয়া হয়েছিল, কারণ ঘুষ দিয়ে আমার সঙ্গে এই বিষয়টি নিয়ে সমঝোতার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। এবার ও যথেষ্ট টাকা দেওয়ায় এবার বাঁচানোর চেষ্টা শুরু হয়ে যায়। একটি সিডি থেকে মারাত্মক তথ্য পাওয়া গেলেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি আমাকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করায়, যে মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়ার বিষয়টি সত্যি। অভিযোগগুলি সম্পর্কে কয়েকজন আমাকে বেশকিছু তথ্যও দিয়েছিল, যার মধ্যে একটি সিডি ছিল। একটি সিডিতে একজন উচ্চপদস্থ আরপিএফ অফিসার একদম স্পষ্ট করে বলছিলেন রেলমন্ত্রকে কয়েক লক্ষ টাকা ঘুষ দেওয়ার কথা। আমি এই সিডি সম্পর্কে রেলমন্ত্রীর ওএসডি গৌতম সান্যাল এবং রেলবোর্ডের সচিব এস রক্ষিতকে জানিয়েছিলাম। কীভাবে রেলের অফিসাররা রেলমন্ত্রককে ঘুষ দেওয়ার কথা বলছেন তা বোঝার জন্য আমি ওঁদের সিডি-টি দেখতেও বলি। অফিসার অন স্পেশ্যাল ডিউটি সিডি দেখতেই চাননি। রেলবোর্ডের সচিব আমার চেম্বারে এসে সিডি দেখে একটি শব্দও উচ্চারণ না করে চলে যান। কিছুই হয় না।"
 
বিযয়টি সরাসরি তত্কালীন রেলমন্ত্রীকে জানাতে চেয়েছিলেন নজরুল ইসলাম। তিনি লিখেছেন, "এবার আমি বিষয়টি মমতা ব্যানার্জিকে  জানানোর সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু সেইসময় তাঁর সঙ্গে আমার দেখা করাটা সমস্যার হয়ে পড়ে। প্রথমদিকে আমি তাঁর চেম্বারে সরাসরি চলে যেতাম। কিছুদিন বাদে, গৌতম সান্যাল আমাকে বলেন, রেলমন্ত্রী অনুমতি নিয়ে ঢোকার কথা বলেছেন। আমি তাঁকে জানিয়ে দিই, এটা কোনও সমস্যা নয়। ভবিষ্যতে আমি ওএসডিকে জানিয়ে অনুমতি নিয়েই ঢুকব। কিন্তু পরে আমি বুঝতে পারলাম, এটা রেলমন্ত্রীর সঙ্গে যাতে আমার যোগাযোগ না থাকে তার জন্যই করা, এব্যাপারে রেলমন্ত্রীর অনুমোদনও থাকতে পারে। আমি ঠিকই করেছিলাম, ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি রেলমন্ত্রীকে জানাবো। পরের বার রেলমন্ত্রী যখন দিল্লি এলেন, তখন আমি আগের মতোই কোনও অনুমতি বা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়াই তাঁর ঘরে ঢুকে যাই। আমি তাঁকে মনে করিয়ে দিই, উনিই আমাকে এই কেসের তদন্ত দিয়েছিলেন যাতে ওই অফিসারকে সাসপেন্ড ও চাকরি থেকে বরখাস্ত করা যায়। কিন্তু আশপাশের লোকেরা বলছে, বিশাল অঙ্কের টাকা মন্ত্রককে ঘুষ দিয়ে ও পার পেয়ে গিয়েছে। উনি(রেলমন্ত্রী) বললেন, "রেলভবনের কাউকে ঘুষ দিলেও রেলমন্ত্রকের কেউ ঘুষ নিতে পারে না।" আমি পরিস্কার করি, সিডিতে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে রেলমন্ত্রী বা তাঁর ব্যক্তিগত কর্মী যেমন, ওএসডি, পিএস, ইডিপিজিদের দিকে। উনি(রেলমন্ত্রী) অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে ওএসডি গৌতম সান্যালকে ডেকে আমার কথা না শোনার জন্য যা-তা বলেন। আমি আশা করেছিলাম, এবার বোধহয় কিছু হবে। কিন্তু আমাকে চরম আশ্চর্য করে, কিছুই হয় না। এমনকি আমাকে ফাইলও দেখানো হয় না।
 
সবকিছু বুঝে আইপিএস নজরুল ইসলাম শেষপর্যন্ত মারাত্মক অভিযোগ এনেছেন খোদ তত্কালীন রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধেই।
 বলেছেন, পরিস্থিতির বিচারে আমার মনে হয়
১) আমাকে ওই চিফ সিকিউরিটি অফিসারের কাছ থেকে বাড়তি ঘুষ আদায়ের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল
২) আমার যা করা উচিত ছিল  তা করতে পারিনি, কারণ আমার পদটি ছিল অস্থায়ী এবং কোনও ফাইল আমার কাছে আসা বা আমার কাছ থেকে যাওয়ার ব্যবস্থা ছিল না।
৩) রেলমন্ত্রী এই ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি জানতেন না, এমনটা নয়।
 
রেলমন্ত্রী থাকাকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর মন্ত্রকের বিরুদ্ধে ওঠা ওই অভিযোগ পেয়ে এবার নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে।



First Published: Wednesday, May 22, 2013 - 18:52


comments powered by Disqus