সালাম তোমায়, ২৪ ঘণ্টায় আত্মপ্রকাশ পার্কস্ট্রিটের ধর্ষিতা সুজেটের

২৪ ঘণ্টার পর্দায় আত্মপ্রকাশ করলেন পার্কস্ট্রিটের ধর্ষিতা সুজেট। জানালেন, "ধর্ষণ সমাজের লজ্জা, ধর্ষিতার নয়। এভাবে মুখ ঢেকে থাকব কেন? আমি ক্রিমিনাল নই তবু কেন মুখ ঢাকব? জঘন্য অপরাধের শিকার আমি। আমার মুখ ঝাপসা করবেন না। নাম, পরিচয় জানাতে লজ্জাবোধ করি না।"

Updated: Jun 18, 2013, 09:24 PM IST

এ যেন কুয়াশার চাদর ভেদ করে ঝলমলে সূর্যোদয়। এতদিন সুজেটের ঝাপসা, ঘষা, ঘষা ছবি দেথতেই অভ্যস্ত ছিলাম আমরা। অস্পষ্ট এক অবয়ব, যার শুধু আউট লাইনটুকুই বোঝা যায়।
কিন্তু কুয়াশার চাদর সরে গেল মঙ্গলবার। ২৪ ঘণ্টার স্টুডিওতে। যে পার্কস্ট্রিট চরম বিপর্য়ের দিকে তাঁকে ঠেলে দিয়েছিল, মঙ্গলবার সেই গ্রাউন্ড জিরো থেকেই শুরু হল নতুন আত্ম নির্মাণ। বলা ভাল, এক নতুন লড়াই। ২৪ ঘণ্টার পর্দায় আত্মপ্রকাশ করার পর পার্কস্ট্রিটের ধর্ষিতা সুজেট জানালেন , "ধর্ষণ সমাজের লজ্জা, ধর্ষিতার নয়। এভাবে মুখ ঢেকে থাকব কেন? আমি ক্রিমিনাল নই তবু কেন মুখ ঢাকব? জঘন্য অপরাধের শিকার আমি। আমার মুখ ঝাপসা করবেন না। নাম, পরিচয় জানাতে লজ্জাবোধ করি না।" গতবছর ৫ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে চলন্ত গাড়িতে ধর্ষণের শিকার হন সুজেট।
দেখুন আত্মপ্রকাশের সেই এক্সক্লুসিভ ভিডিও
সাধারণ মানুষের অসাধারণ লড়াইয়ের কথা আমাদের প্রেরণা জোগায়। ২০১২ পাঁচই ফেব্রুয়ারি সুজেটকে ধর্ষণ করা হয়। ঘটনার পর তিনি এতটাই মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন, যে থানায় যাওয়ার কথাও ভাবেননি। আত্মীয়ের পরামর্শে অভিযোগ যখন জানাতে গেলেন, ততক্ষণে তিনদিন পেরিয়ে গিয়েছে। পানশালা থেকে বেরিয়ে গাড়ির ভিতর ধর্ষণ। তাই চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন দুই পুলিস অফিসার।
এরপর আরও বড় আঘাত। সবচেয়ে বড়। খোদ মুখ্যমন্ত্রী পার্কস্ট্রিটের ঘটনাকে সাজানো ঘটনা বললেন। তারপর থেকে ধেয়ে এসেছে একের পর এক বাক্যবাণ। ধর্ষণ যে হয়েছে, তা বলেছিলেন একজন। ব্যস। তারপরে ইনিও যুগ্ম কমিশনার অপরাধ থেকে বদলি হয়ে গেলেন বারাকপুরে ডিআইজি ট্রেনিং পদে। দময়ন্তী সেনের বদলির পর থেকেই অথৈ জলে পার্ক স্ট্রিট ধর্ষণ কাণ্ডের তদন্ত। ঘটনার পর একবছর পেরিয়ে গেলেও মূল অভিযুক্ত এখনও ফেরার।
মন্দ মেয়ের তকমা। আশপাশের লোকেদের ভুরু কোঁচকানো দৃষ্টি। লজ্জা, ভয়, আতঙ্ক আর সঙ্কোচ। সব মিলিয়ে এক দুর্বিষহ পরিস্থিতি। চাকরি খুইয়ে আর্থিক অভাব সেই সঙ্কটকে আরও তীব্র করে। কিন্তু দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে মা লড়াই ছাড়েনি। সম্প্রতি একটি চাকরিতেও যোগ দিয়েছেন সুজেট। তাও আবার নারী কল্যাণের কাজে। সুজেট জানিয়েছেন নিজের অভিজ্ঞতা থেকে অন্যান্য নির্যাতিতাদের সমস্যা উপলব্ধি করতে চান তিনি।
তবু তাঁকে ঘিরে ঝাপসা চাদরটুকু ছিল। কিন্তু তা সরিয়ে দিল একটি মৃত্যু। কামদুনির পরিত্যক্ত জমি লাগোয়া খালের ধারে কুড়ি বছরের এক তরুণীর দেহ উথালপাথাল করে দিল সুজেটের হৃদয়।
 
কামদুনি, গাইঘাটা, গেদে, সব ক্ষোভে ফুটছে। আর পারলেন না সুজেট। গৌতম বুদ্ধ বলেছিলেন, আত্মদীপ ভব। সুজেটও সেটাই করলেন। নিজেই নিজের প্রদীপ হলেন।
 
অন্তরালবর্তিনী থেকে আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠার কাজটা মোটেই সহজ ছিল না। পোড়া বাংলায় মেয়েদের সম্মান আজ ধুলোয়। তাই সুজেট নিজেই নিজের ঝাপসা বর্ম ছিন্ন করলেন। এখন তিনি এক অনির্বাণ দীপশিখা।