পুরসভার ত্রিফলা দুর্নীতিতে সিলমোহর ক্যাগের

পুরসভার ত্রিফলা দুর্নীতিতে সিলমোহর ক্যাগের

পুরসভার ত্রিফলা দুর্নীতিতে সিলমোহর ক্যাগেরত্রিফলা দুর্নীতির অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরেই জেরবার কলকাতা পুরসভা। এবার সেই অভিযোগে সিলমোহর দিল ক্যাগ। বিনা টেন্ডারে বরাতের পাশাপাশি ত্রিফলা আলো বসানোর ক্ষেত্রে একাধিক নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করা হয়নি বলেই জানানো হয়েছে তাদের রিপোর্টে। এখানেই শেষ নয়। মেয়র এবং মেয়র পারিষদদের অজ্ঞাতে যে এই দুর্নীতি হয়নি তারও ইঙ্গিত মিলেছে রিপোর্টে।

দেখা যাচ্ছে, কাজ তাড়াতাড়ি করতে হবে এই যুক্তিতে সব কটি ক্ষেত্রেই পাঁচ লক্ষ বা তার কম টাকার ওয়ার্ক অর্ডারে ভেঙে শর্ট টেন্ডার নোটিস বা স্পট টেন্ডারের প্রস্তাব পাঠিয়েছে ইই(ই)। ডিজি সেই প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছেন এবং মেয়র পারিষদ সদস্য (আলো এবং বিদ্যুত্‍) সব ক্ষেত্রেই তাঁর অনুমোদন দিয়েছেন, কিন্তু কখনই বাল্ক টেন্ডরারিংয়ের কথা বলেননি। 

অডিটে মনে করা হচ্ছে, রাস্তার আলোর মাঝে সুসজ্জিত আলো দেওয়া এমন কোনও জরুরি কাজ নয়, যার জন্য কলকাতা পুরসভার নিয়ম লঙ্ঘন করতে হবে। একটি কাজকে এইভাবে ছোট ছোট টুকরোয় ভেঙে একাধিক শর্ট বা স্পট টেন্ডার ডাকা নিয়ে কেন মেয়র পারিষদ সদস্য (আলো এবং বিদ্যুত্‍) কোনও প্রশ্ন তোলেননি, তা অডিটকে জানানো হোক।

শুধুই দুর্নীতির সাতসতেরো নয়। কীভাবে যাবতীয় নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই দুর্নীতি চালিয়ে যাওয়া হয়েছে তাও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে ক্যাগের রিপোর্টে।

মেয়র পারিষদ সদস্য (আলো)-র অনুমোদনে অনিয়ম- সব ক্ষেত্রেই জরুরি ভিত্তিতে শর্ট টেন্ডার নোটিস বা স্পট টেন্ডার জারির কথা বলা হয়েছিল। মেয়র পারিষদ বা পুরসভার কমিটির সামনে প্রস্তাব পেশ করার পরিবর্তে ডিজি(আলো)-র মাধ্যমে মেয়র পারিষদ সদস্য (আলো)-র অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল। মেয়র পারিষদ সদস্য (আলো)-র অনুমোদনের পর তা কলকাতা পুরসভার নোটিস বোর্ডে টাঙানো হয়। তাতে শর্ট টেন্ডার নোটিস বা স্পট টেন্ডার জমা দেওয়ার জন্য মাত্র চারদিনের স্বল্প সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়।  এর থেকেই স্পষ্ট, মেয়র পারিষদ (আলো) নিয়ম ভেঙে প্রস্তাবে অনুমোদন দেন যাতে টেন্ডার নোটিসের সম্পর্কে খুব বেশি লোক জানতেই না পারেন।

ত্রিফলা দুর্নীতির দায়ে বারবার আঙুল উঠেছে শাসকদলের দখলে থাকা কলকাতা পুরসভার বিরুদ্ধে। তবে দুর্নীতির সমস্ত অভিযোগ খারিজ করে মেয়রকে ঢালাও সার্টিফিকেট দিয়েছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী।
 
তবে কী বলছে ক্যাগের রিপোর্ট?

রিপোর্ট বলছে,  ডিজির সম্মতিতে এক-একটি বাতিস্তম্ভের দর ধার্য করা হয় পাঁচ হাজার নশো আঠারো টাকা। তবে এন্টালি ওয়ার্কশপে  ত্রিফলা বাতির একটি স্তম্ভ তৈরি খরচ হত তিন হাজার একশো আটত্রিশ টাকা। সেক্ষেত্রে এন্টালি ওয়ার্কশপ থেকে কেনা হলে প্রতি দশ হাজারটি বাতিস্তম্ভে বাঁচানো যেত পুরসভার দুকোটি আঠাত্তর লক্ষ টাকা।  

একটি স্তম্ভ তৈরি করতে বেসরকারি সংস্থা মাইক্রোন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে খরচ পড়ত তিনহাজার তিনশো আশি টাকা। সেক্ষেত্রে প্রতি দশ হাজারটি বাতিস্তম্ভে বাঁচানো যেত পুরসভার দুকোটি চুয়ান্ন লক্ষ টাকা।
 
একটি স্তম্ভ তৈরি করতে বেসরকারি সংস্থা আবদুল নৌসাদে খরচ পড়ত তিনহাজার তিনশো তেতাল্লিশ টাকা। সেক্ষেত্রে প্রতি দশ হাজারটি বাতিস্তম্ভে বাঁচানো যেত পুরসভার দুকোটি সাতান্ন লক্ষ টাকা।
 
অর্থাত্ ক্যাগের রিপোর্ট থেকে স্পষ্ট, লাগামছাড়া বেনিয়মের জেরে ত্রিফলা আলো বসাতে ইতিমধ্যেই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়েছে আট কোটি।  সাধারণ মানুষের করের টাকা নয়ছয়ের দায় বর্তাবে কাদের ওপর?
 
ত্রিফলা কেলেঙ্কারির জেরে পুরকর্তৃপক্ষ অবশ্য বারবার কাঠগড়ায় তুলেছে তত্কালীন আলো বিভাগের ডিজি গৌতম পট্টনায়ককে। এমনকি অবসরের পর আটকে দেওয়া হয়েছে তার যাবতীয় পাওনাগণ্ডাও।

তবে ক্যাগের রিপোর্ট বলছে অন্যকথা। রিপোর্ট স্পষ্ট, ত্রিফলা নিয়ে এই দুর্নীতির বিষয়ে সবই জানতেন আলোবিভাগের মেয়র পারিষদ মনজর ইকবাল। তবে এখানেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে,  মেয়রকে না জানিয়ে মেয়রপারিষদ একা এতবড় সিদ্ধান্ত কি আদৌ নিতে পারেন? ক্যাগ রিপোর্টে যে দুর্নীতির খতিয়ান সামনে এসেছে, তার দায় কীভাবে এড়াতে পারেন খোদ মেয়রও?

 
 
 
 
 
 






First Published: Saturday, June 29, 2013, 13:31


comments powered by Disqus