হাত বাড়ালেই কাঞ্চনজঙ্ঘা

Last Updated: Monday, December 3, 2012 - 17:40

সিকিম রাজ্যটার প্রতিটা বাঁকেই প্রকৃতি বেশ সুন্দর সাজুগুজু করে থাকে। এলোমেলো ছোট্ট ঝরনা, মুখ ছুঁয়ে যাওয়া ছেঁড়া ছেঁড়া নরম ভেজা মেঘ, গভীর সবুজের হাতছানি, অনাবিল কিছু মুখ এবং সঙ্গে তিনি- কাঞ্চনজঙ্ঘা। গুটিকতক ছড়ানো ছিটনো কাঠের বাড়ি নিয়ে তৈরি পুঁচকি গ্রামও অনন্য টুরিস্ট স্পট। সবটুকু মিলিয়ে মিশিয়ে সিকিম একটা নেশা। ফি বছর অন্তত একবার `সিকিম রূপ সুধা` পান না করলে জীবন বড়ই জোলো, পানসে। তা জীবনটা যখন একটাই তাকে আর কেন জেনে বুঝে বিস্বাদ করে রাখা? তাই হাতের কাছে যা কিছু পাওয়া ব্যাগে গুঁজে ট্রেনে ঝাঁপিয়ে পড়া। রাতটুকু এসির তাল বেতাল খেয়াল, হলদেটে ছোপ ধরা বালিস-চাদর, কুটকুটে কম্বলের আদর, ট্রেনের শৌচালয়ের অ-সাধারণ `সু`গন্ধের মৌতাতে (সৌজন্যে ভারতীয় রেলওয়ে) কোনও রকমে কাটিয়ে দিয়েই ভোর ভোর নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন। গন্তব্য চেনা সিকিমের অজানা ওখড়ে আর ভার্সে ( রাস্তায় সরকারি হোর্ডিং, পাহাড় লিখনে কোনও কোনও জায়গায় `বার্সে` বলেও উল্লেখ করা আছে)।

কাঞ্চনজঙ্ঘার সঙ্গে বন্ধুতা বেশ পুরনো। নভেম্বরের প্রথম সকালে সেই বন্ধুতাকে মাথায় রেখেই নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে বেশ হাসি হাসি মুখে ওয়েলকাম করল সে। গোটা গাড়ি ভাড়া করে না নিলে সরাসরি ওখড়ের গাড়ি নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে পাওয়া যাবে না। আর গোটা গাড়ি নেওয়ার ক্ষমতা বছর শেষের পকেট একটুও পারমিট করে না। অতঃকিম? অন্ধের লাঠি শেয়ার আছে না? গ্যাংটকগামী শেয়ার গাড়ি চেপে প্রথমে মল্লি। সেখানে রাত ভোর না হওয়া ঘুমের জমে থাকা হাই-টাই গুলো তুলে নেওয়া। তারপর গরম গরম নরম মোমো দিয়ে পেট পুজো করে জোড়থাং। জোড়থাং থেকে সিকিমের যে কোন প্রান্তের গাড়িই মেলে। সেখানেই মিলল ওখড়ের এক লওতা গাড়ি। বেশ ঝড়ঝড়ে একটা উইলি জিপ। ড্রাইভার জোড়থাং থেকে ওখড়েতে ময়দা, আটা সরবারহ করেন। তা সেই গমজাত দ্রব্যগুলির সৌজন্যে ওখড়ে যাত্রাটা ভালয় ভালয় মিটেই গেল। খালি অতি পুরনো জিপের টুকুশ টুকুশ চাকা চালনায় যাত্রাসময় স্বাভাবিকের থেকে কিঞ্চিৎ দীর্ঘায়িত হল। সঙ্গে চোখ, মু্‌খ, সোয়েটারের সঙ্গে আটা ময়দার গভীর ভাবসাব উপরি পাওনা।
ওখড়ে আদতে ছোট্ট একটা গ্রাম। অ্যামেচার ট্রেকারদের প্রথম পদক্ষেপ ভার্সের গেটওয়ে। কিন্তু তাই বলে তার নিজের রূপের দেমাক কি কিছু কম? মোটেও না। একদিকে ভার্সে যাওয়ার পাকদণ্ডী, অন্যদিকে দিগন্ত ছুঁয়ে থাকা নীল পাহাড়। নিজের মত করে দিব্যি সতেজ সুন্দর সে। ওখড়েতে বসত বাড়িই মাত্র কয়েকটা। থাকার জায়গাও তাই একটা দুটোর বেশি হবে না তা বলাই বাহুল্য। ওখড়ের থাকার আস্তানাগুলোয় অকারণ বাহুল্য বা বিলাসিতার চিহ্নমাত্র নেই। তবে রয়েছে স্বাভাবিক জীবনযাপনের পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থাপনা। আর পেটুক পেটের দিব্যি করে বলছি, খাঁটি সিকিমিজ খানার লোভেই শুধুমাত্র এখানে চলে আসা যায়। বিকেল হতেই সুয্যি মামা পাটে যেই না ঘুমোতে যান শীতটা বেশ হাড়ে হাড়েই মালুম দিয়ে যায় ওখড়েতে। তবে পশ্চিম সিকিমের ছোট্ট এই জনপদের রাত কিন্তু দিনের থেকে অনেক বেশি সুন্দর। সৌজন্যে দার্জিলিং। ওখড়ের ঠিক উল্টো দিকের পাহাড়টাই দার্জিলিং। নির্জন ওখড়ের নিঝুম রাতকে বড় বেশি মায়াবি করে দেয় দূর পাহাড়ের শৈলশহর। দার্জিলিংয়ের এক ঝাঁক ঝিকমিকে জোনাকি আলোর সমারোহ কোথাও যেন এসে রাতের তারার সঙ্গে মিশে যায়। অপার্থিব? এছাড়া আর কোনও উপমা মস্তিষ্ক কোষের সঙ্গে মস্তানি করেও মাথায় এল না।

পরের দিন ভার্সে যাত্রা। বড় ব্যাগপত্তর গুলো ওখড়েতেই জমা রেখে এক রাত কাটানোর সরঞ্জাম কাঁধের ব্যাগে গুছিয়ে নিয়ে সক্কাল সক্কাল গাড়িতে চেপে বসা। আধ ঘন্টার গাড়ি পথ পেরিয়ে ভার্সে রডোডেনড্রন স্যানচুয়ারির গেটে পৌঁছনো গেল। পাহাড়ের কোলে এই অভয়ারণ্যের উচ্চতা ১০,৫০০ ফুট। অভয়ারণ্যের গেট থেকে ৪ কিলোমিটারের ছোট্ট, সহজ ট্রেক। কিন্তু জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। চারদিকে ঘন রডোডেনড্রনের বন। সঙ্গে পাইন, ফার, ওক, দেওদর হেমলকের ছায়ায় ঘেরা আর্দ্র সংকীর্ণ পথ। বড় বড় মহীরুহের ফাঁক দিয়ে আলোছায়ার লুকোচুরি। পায়ের তলায় ফার্ণ, মস আর নাম না জানা পাহাড়ি গুল্মের নরম সবুজ গালিচা। ভাগ্য সুপ্রসন্ন। তাই মোলাকাত হয়ে গেল এক ভাবুক রেড পান্ডার সঙ্গে। তবে শুকনো পাতার উপর স্নিকার্সের কচমচ শব্দে তার ভাবনার সুর কেটে যেতেই সে নিমেশে হাপিশ হয়ে গেল। শুধু রেড পান্ডা নয়, এই জঙ্গল শিয়াল, সজারু, জায়েন্ট কাঠবেড়ালী, হিমালয়ান ব্ল্যাক বিয়ার, বুনো শুকর, বার্কিং ডিয়ার, মার্টেনের ঘরবাড়ি। কিন্তু বোধহয় তারা নিজের আস্তানা, সংসার ছেড়ে মোটেও ক্যামেরাবন্দী হতে রাজি ছিল না। তাই তাদের দেখাও মিলল না। যাই হোক। পথ পেরিয়ে অবশেষে এসে পৌঁছনো গেল ভার্সের কেন্দ্রস্থলে। যেখানে চারপাশের পাহাড় রডোডেনড্রন ঘেরা। স্থানীয় ভাষায় যার নাম গুরাস। মার্চের শেষ থেকে গোটা এপ্রিল মাস প্রতি বছর আগুন জ্বলে ভার্সেতে। লাল গুরাসের আগুন। মাঝে মাঝে সেই আগুনে হলুদ শিখার সংযোজন ঘটায় হলুদ গুরাস। শীতে অবশ্য গুরাস ফোটেনা। কিন্তু গুরাস গাছের শুকনো ডালে বাসা বাঁধে সাদা কুঁচি বরফ। শীত বাড়লে বরফ চাদর ঢেকে ফেলে ভার্সের হৃদয়। অনন্ত সাদাই কি লাল আগুনের আগমনী রচনা করে? বোধহয়।

ভার্সেতে থাকার জায়গা একটাই। গুরাস কুঞ্জ। খাতায় কলমে সরকারি হলেও বর্তমানে এক স্থানীও যুবক লিজ নিয়েছেন। ভার্সেতে কোনও বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই, নেই লাগাতার জলের জোগান। তাই রাত বাড়লে মোমের টিমটিমে আলোই ভরসা। বস্তুত, নাগরিক সভ্যতার যান্ত্রিক জীবনযাপন থেকে শত যোজন দূরে বেঁচে থাকে এই একফালি পাহাড়। ভার্সেতে পৌঁছে মন বেশ খারাপ হল। আকাশের গোমড়া মুখের জন্য মেঘের আড়ালে লুকিয়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। পরের দিন সকালেও আকাশের জমাটি অভিমান কান্না হয়ে না নামলে তার দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা বড়ই ক্ষীণ। কিন্তু তবুও আশায় তো চাষা বুক বাঁধেই। বিকেল হতেই মেঘের চাদরের ফাঁক দিয়ে একটু টুকি দিয়ে গেলেন তিনি। আশা তখন উর্দ্ধমুখী। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বাড়ল ঠান্ডা। দুখানা বেশ জম্পেশ সোয়েটার, মোজা, টুপি তার উপর বিষম ভারি যমজ লেপেও বাধ মানে না এই শীত। বুড়ো হলেই যে তেজ কমে না, এখানকার শীত তার জ্যান্ত প্রমাণ। যাই হোক। কেঁপেকুঁপে কষ্টের রাত কাটিয়ে ভোর হল। আর সেই ভোরে ঘর থেকে বেরিয়েই দেখা মিলল তার। এক্কেবারে সপার্ষদে উপস্থিত কাঞ্চনজঙ্ঘা। একদিকে পন্ডিম, অন্য পাশে জোড়ামাথা কাবারু। যদিও দূরত্বটা পায়ে হেঁটে পেরিয়ে যাওয়ার নয়। তবুও এই শৃঙ্গের বিশালতাই
হাতের মুঠোয় এনে দিল তাকে। মনে হল যেন হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যাবে। কিছুক্ষণ পরেই পুব আকাশে উঁকে দেওয়া সূর্য পরম আদরে চুমু খেয়ে গেল কাঞ্চনজঙ্ঘার কপালে। সুন্দরী পাহাড় তখন লজ্জায় কমলা। সেই লজ্জার রঙ কিছুক্ষণের মধ্যেই ছড়িয়ে গেল পিছনের আকাশে। তারপর দিগন্ত জুড়ে একের পর এক রঙ পরিবর্তনের সাক্ষী থাকল কয়েক জোড়া চোখ। মূহুর্ত বন্দী করার চেষ্টায় চারপাশে ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক।
এরপর ফিরে আসার পালা। একরাশ ভাললাগা সঙ্গে করে। যাওয়ার পথ আর ফিরে আসার রাস্তাটা যেহেতু একই তাই তার বর্ণনা নিষ্প্রয়োজন।



First Published: Monday, December 3, 2012 - 17:40


comments powered by Disqus
Live Streaming of Lalbaugcha Raja