রক্তস্নানের বছর কুড়ি পর অযোধ্যার পথে

Last Updated: Thursday, December 6, 2012 - 09:11

উনিশশো বিরানব্বইয়ের ৬ ডিসেম্বর। আজ থেকে ঠিক ২০বছর আগে ধুলোয় মিশেছিল গণতান্ত্রিক ভারতের ধর্ম নিরপেক্ষতার অহংকার। ধর্মের জিগির তুলে অযোধ্যায় বহু শতাব্দী প্রাচীন এক ধর্মীয় স্থাপত্যকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল কিছু উন্মাদ। ধর্মীয় আবেগকে কেন্দ্র করে জ্বলে ওঠা সেই আগুনে পুড়েছিল গোটা দেশ। তারপর কেটে গিয়েছে দুটি দশক। পায়ে পায়ে হাজির আরেকটা ছই ডিসেম্বর। রক্তস্নানের ২০ বছর পর কেমন আছে অযোধ্যা?
দাঙ্গার পড়েই মুখ থুবড়ে পড়েছিল ধর্মনগরী অযোধ্যার অর্থনীতি। অশান্তির আশঙ্কায় দিনে দিনে কমেছে পর্যটকের সংখ্যা। তুলসীর মালা বা সাদা পাথরের মূর্তি কিনতে আজ আর ভিড় চোখে পড়ে না দোকানের সামনে। স্বচ্ছল থেকে ক্রমশ সম্বলহীন হয়ে পড়েছেন এইসব শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষজন। এক সময় পর্যটকরা আসতেন। মন্দির নগরীতে তাঁরা থাকতেন, ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করতেন দেব-দেবীর মূর্তি, তুলসী বা রূদ্রাক্ষের মালা। কিন্তু ৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের পর সবই অতীত। এখন আর পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় নেই অযোধ্যা। 
তুলসীর মালা আজও অবশ্য বিক্রি হয় অযোধ্যা শহরের পথের ধারের দোকানে। কিন্তু আগের তুলনায় চাহিদা অনেকটাই কম। তাই ব্যবসায়িদের মধ্যে অনেককেই গ্রাস করেছে হতাশা। এঁরা প্রত্যাকেই চান, এগিয়ে আসুক সরকার।
এই শিল্পীদের বাঁচাতে, অযোধ্যার শিল্পগুলিকে বাঁচাতে প্রশাসনের অবশ্য কোনও হেলদোল নেই। এক সময় এই শিল্পীরা মনে করতেন, রাম মন্দির তৈরি হলে তাঁদের অবস্থার উন্নতি হবে। কিন্তু বাবরি-কাণ্ডের বিশ বছর পরে রাম মন্দির বিশ বাঁও জলে। মানুষ বুঝতে পেরেছেন, আসল রাজনীতিটা ঠিক কোথায়। রাজনৈতিক ইস্যুই যে প্রভাব ফেলেছে তাঁদের জীবন এবং জীবিকার ওপর।  
ধর্মের জিগির তুলে যারা দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরি করতে চেয়েছিল, অযোধ্যা তাদের সফল হতে দেয়নি। মন্দির-মসজিদের শহরে হিন্দু-মুসলিম উভয়েই পরস্পর পরস্পরের ওপর নির্ভরশীলতায় বেঁচে রয়েছেন। ধর্মনগরী অযোধ্যা। পর্যটক, তীর্থযাত্রী থেকে শুরু করে সাধু-সন্ত, পুজারী-পুরোহিতদের নিত্য আসা-যাওয়া। এসবের জেরে জমে উঠেছে ব্যবসাও। দীর্ঘদিন ধরেই অযোধ্যায় মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ খড়ম তৈরি করে আসছেন। মালা গাঁথেন মন্দিরের জন্য। অযোধ্যায় এ সবে কোনও বাধা নেই। সমস্যা তৈরি করে শুধু বাইরের লোকেরা। রাজনীতির কারবারিরা। এখানকার মানুষ আর মন্দির-মসজিদের নামে ধর্মের জিগির তোলার পক্ষে নন। অযোধ্যায় অশান্তির আগুন জ্বললে মানুষ আর এ মুখো হবেন না। পর্যটকরা না এলে ব্যবসাও যে মার খাবে একথা বিলক্ষণ জানেন এখানকার সাধারণ অধিবাসীরা।
শুধু অযোধ্যায় নয়, ১৯৯২-এ বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রভাব পড়ে গোটা ভারতে। ধাক্কা খায় দেশের ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি। আজ কুড়ি বছর পর প্রশ্ন উঠছে, শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যেই কি সেদিন অযোধ্যায় ধর্মের জিগির তুলেছিল বিজেপি ? উত্তর খুঁজছেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষই।

দুদশক পরেও বন্ধ হয়নি কমুণ্ডলের রাজনীতি। গো-বলয়ে তাদের পৃথক অস্তিত্বের লড়াইয়ে বিজেপি এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ রাম মন্দির ইস্যুকে এখনও জাগিয়ে রাখতে চাইছে। যদিও, তারা স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দুদশক আগের আন্দোলন বর্তমানে অনেকটাই  প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। রাম মন্দির একসময় ছিল বিজেপির অন্যতম প্রধান ইস্যু। ধর্মের ভিত্তিতে ভোটারদের মেরুকরণ ঘটানোর উদ্দেশ্যও অনেকটাই সফল হয়েছিল। মসজিদ ভেঙে মন্দির নির্মাণের উন্মাদনা উস্কে দিয়ে একসময় যে তারা রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছিল, তা মেনে নিচ্ছে বিজেপি।
এলাহাবাদ হাইকোর্টের লখনউ বেঞ্চের রায়ে বর্তমানে তিনভাগে বিভক্ত অযোধ্যার বিতর্কিত জমি। যদিও, এই রায়ে সন্তুষ্ট নয় বিজেপি, ভিএইচপি। তারা চাইছে সর্বোচ্চ আদালতে যত দ্রুত সম্ভব চূড়ান্ত মীমাংসা।
আর, মন্দির-মসজিদ বিতর্কের মধ্যে না গিয়ে অযোধ্যার সাধারণ মানুষ চাইছেন শান্তি। তাঁরা আর চাইছেন না স্বার্থান্বেষী কিছু মানুষের হাতের পুতুল হতে।
গত ২০ বছর ধরে নিরাপত্তার চাদরে মোড়া ধর্মনগরী অযোধ্যা। বিতর্কিত জমি থেকে অনেক দূরেও ব্যারিকেডের বাধা। সমস্যায় তীর্থযাত্রী থেকে শুরু করে স্থানীয় বাসিন্দারা। দুদশক ধরে নিরাপত্তার বজ্র আঁটুনি দেখতে দেখতে হাঁফিয়ে উঠেছেন তাঁরা। মন্দির-মসজিদ নয়। চাই একটু শান্তিতে বাঁচার সুযোগ। উন্নয়ন। কর্মসংস্থান। বলছে নতুন শতকের অযোধ্যা। কেন অযোধ্যায় ভাল কলেজ নেই ? কেন যেতে হবে লখনউ ? প্রশ্ন তুলছে অযোধ্যার যুবসমাজ।
অযোধ্যা বদলে যাচ্ছে। কিন্তু, রাষ্ট্র যাঁরা চালান, তাঁদের মনে ভয় দূর হয়নি। হঠাত্‍ করে যদি জ্বলে ওঠে অশান্তির আগুন ? তাই সর্বত্র নিরাপত্তার কড়াকড়ি। ভারী বুটের শব্দ। বিতর্কিত জমির চারপাশে পাঁচিল। অসংখ্য নিরাপত্তারক্ষী। জমি থেকে৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ঘোষিত হয়েছে ইয়োলো জোন। এই এলাকায় ঢুকতে গেলে পেরোতে হবে ব্যারিকেডের বাধা।
ধর্মের জিগির তুলে সেদিন যাঁরা ধ্বংসের খেলায় মেতেছিলেন সময়ের সঙ্গে তাঁদের অনেকেই মত বদলেছেন । বিতর্কিত জমিও আদালতের বিচারধীন। তবু, আজও চলছে মন্দিরের জন্য পাথর খোদাইয়ের কাজ। কিন্তু কেন? সবই রাজনীতি,বলছে অযোধ্যা। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের আগে ১৯৯০ সালে শিলান্যাস হয়েছিল রামমন্দিরের। সেসময় দেশজুড়ে প্রচারে নেমেছিল বিজেপি ও ভিএইচপি। রামমন্দির সমর্থকদের প্রত্যেককে একটি করে ইট সঙ্গে আনার আহ্বান জানানো হয়। সারাদেশ থেকে রামমন্দির সমর্থকদের বয়ে আনা ইট স্তুপাকারে জমতে থাকে বিতর্কিত জমির আশেপাশে। শুধু ইট নয়, মন্দির তৈরির জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে রাজস্থান থেকে আনা হয় পাথর। আসেন খোদাই শিল্পীরাও। মন্দিরের জন্য তৈরি হয় অসংখ্য স্তম্ভ। সেই স্তম্ভের গায়ে এখন শুধুই শ্যাওলার পুরু আস্তরণ।
অযোধ্যায় বহু শতাব্দী ধরে পাশাপাশি শান্তিতে বাস করেছিল দুই সম্প্রদায়। কোনওরকম বিরোধ ছাড়াই। সেই কালো শুক্রবারেও সম্প্রীতির বন্ধন ছিল অটুট। তাহলে কী করে রাতারাতি বদলে গেল সেই শান্তির পরিবেশ? অযোধ্যাবাসীর ধারণা, এর পিছনে কাজ করেছিল গভীর কোনও ষড়যন্ত্র। তবে কুড়ি বছর আগের সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি আর নেই। ধীরে ধীরে ফিরে এসেছে শান্তি। ফিরেছে সম্প্রীতি। মসজিদের দাবি ছাড়েননি মুসলিমরা। হিন্দুরাও অনড় তাঁদের মন্দিদের দাবিতে। তবে এই সমস্যার এখন আইনি সমাধানই চায় দুই সম্প্রদায়। আরেকটা কালো শুক্রবার চান না অযোধ্যাবাসী।



First Published: Thursday, December 6, 2012 - 09:11


comments powered by Disqus