আমি মোদী বলছি

তেরো বছর ধরে মুখ্যমন্ত্রী। চার দশকের বেশি সময় ধরে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাঁর অন্ধ ভক্তের সংখ্যা অগণ্য। আবার তাঁকেই ভারতের রাজনীতির কলঙ্ক মনে করেন অনেকে। নজিরবিহীন হাইপ্রোফাইল নির্বাচনী প্রচারের পর অবশেষে যুদ্ধজয় করলেন নরেন্দ্র মোদী।

Updated: May 25, 2014, 08:42 PM IST

তেরো বছর ধরে মুখ্যমন্ত্রী। চার দশকের বেশি সময় ধরে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাঁর অন্ধ ভক্তের সংখ্যা অগণ্য। আবার তাঁকেই ভারতের রাজনীতির কলঙ্ক মনে করেন অনেকে। নজিরবিহীন হাইপ্রোফাইল নির্বাচনী প্রচারের পর অবশেষে যুদ্ধজয় করলেন নরেন্দ্র মোদী।

নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদী। ষোড়শ লোকসভা নির্বাচন ঘোষণার কয়েক মাস আগে থেকেই যাঁকে ঘিরে ঘুরেছে দেশের রাজনীতির চাকা। লালকৃষ্ণ আডবাণীর বাধা উপেক্ষা করে গত সেপ্টেম্বরে বিজেপির নির্বাচনী লড়াইয়ের নেতা হিসেবে নরেন্দ্র মোদীর নাম ঘোষণা করা হয়।

মাত্র আট বছর বয়সে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ বা আরএসএসের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে জীবনের এক অধ্যায়ের সূচনা হয়ে গিয়েছিল নরেন্দ্র মোদীর। সাতের দশকে সক্রিয় আরএসএস সদস্য হন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম.এ মোদী। প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে আসেন উনিশশো পঁচাশিতে।

গুজরাতে তখন শঙ্করসিং বাঘেলা-কেশুভাই প্যাটেলদের যুগ। বাঘা বাঘা ওই সব নেতাদের মধ্যেই মাটি আঁকড়ে নিজের জায়গা তৈরি করতে ব্যস্ত ছিলেন বিজেপির আজকের মুখ। দলের অন্দরে সকলের প্রিয় হয়ে উঠলেন উনিশশো একানব্বইয়ে। কন্যাকুমারী থেকে শ্রীনগর পর্যন্ত মুরলী মনোহর যোশীর একতা যাত্রার সাফল্য তাঁকে নতুন সুযোগ করে দেয়।

এরপর আরও বড় সাফল্য। উনিশশো পচানব্বইয়ে গুজরাতে বিধানসভা ভোট। বিজেপির বিপুল জয়ের নেপথ্যে নায়ক ছিলেন নরেন্দ্র মোদী। এরপর ধীরে ধীরে রাজ্য রাজনীতির পাশাপাশি জাতীয় স্তরে দলের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব মোদীর ওপর ছেড়ে নিশ্চিন্ত থেকেছেন লালকৃষ্ণ আডবাণী, অটল বিহারী বাজপেয়ীরা।

নরেন্দ্র মোদীর জীবনের মোড় ফিরল দুহাজার একে। লাগাতার দুর্নীতির মুখ, খুঁড়িয়ে চলা গুজরাতের কেশুভাই প্যাটেল সরকারের পরিবর্তন সেই বার অবশ্যসম্ভাবী। তার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছিল ভূজ ভূমিকম্পের পর বিপর্যয় সামলাতে বিজেপি সরকারের ব্যর্থতা। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা ভরসা রাখলেন নরেন্দ্র মোদীর ওপর। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কেশুভাইকে সরিয়ে মুখ্যমন্ত্রী করা হল নরেন্দ্র মোদীকে। তার এক বছরের মাথায় গুজরাটে বিধানসভা নির্বাচন।

মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার চার মাসের মধ্যেই ঘটল গোধরা সবরমতী এক্সপ্রেসে অগ্নিকাণ্ড। তারপর গুজরাত জুড়ে হিংসায় প্রাণ হারালেন অসংখ্য মানুষ। কাঠগড়ায় দাঁড়াল মোদী সরকার। ঘরে বাইরে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েন নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদী। প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীকে তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিতে হল রাজধর্ম পালনের কথা। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সংঘাতের পথে যাননি মোদী। কিন্তু নিজের কট্টরপন্থী অবস্থান থেকে সরেও আসেননি।

গুজরাত হিংসার পরেও দুহাজার দুইয়ের বিধানসভা নির্বাচনে বিশাল মার্জিনে বিজেপিকে জিতিয়ে ফের ক্ষমতায় ফিরলেন মোদী। গুজরাত দাঙ্গার দগদগে স্মৃতি রয়েই গেল। দেশে বিদেশে তা নিয়ে চর্চা আজও চলে। নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে ওঠে গণহত্যায় নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগ। পরবর্তীকালে অবশ্য শীর্ষ আদালত থেকে ক্লিনচিট পান নরেন্দ্র মোদী।

হিন্দুত্ব ইস্যুকে সামনে রেখে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এলেও দুহাজার দুই থেকে নরেন্দ্র মোদী গুরুত্ব দিলেন গুজরাতের অর্থনৈতিক উন্নয়নে। সেই উন্নয়নের কেন্দ্রে ছিল বড় শিল্প আর পরিকাঠামো। সাগ্রহে এগিয়ে এলেন বড় শিল্পপতিরা। রাজ্যে উদ্বৃত্ত জমিকে সফল ভাবে উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করলেন মোদী।

মোদীর উন্নয়ন মডেলই তাঁকে ফিরিয়ে এনেছিল দুহাজার সাতে। তৃতীয়বারের জন্য। আবার দুহাজার বারো সালে। চতুর্থবার। তবে এই উন্নয়ন মডেল মোদীকে কম খোঁচা দেয়নি। অনেকের মতে, মোদীর রাজ্যে উন্নয়নের সুবিধাভোগীরা শুধুমাত্র শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। গ্রামের দরিদ্র মানুষ আরও প্রান্তিক হয়েছেন। দারিদ্রের নিরিখে গুজরাত রয়ে গিয়েছে তেরো নম্বরে। স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, আজও গুজরাতে বড় সমস্যা।

দুহাজার নয়ের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রচারে ক্রাউড পুলার নরেন্দ্র মোদীকে দেখে দলের অন্দরে ভাবনাটা শুরু হয়ে গিয়েছিল। দুহাজার তেরোর জুনে লালকৃষ্ণ আডবাণীর মতো প্রবীণ নেতাদের আপত্তি সত্ত্বেও মোদীকে প্রচার কমিটির প্রধান হিসেবে ঘোষণা করে বিজেপি। আর সেপ্টেম্বরে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে নরেন্দ্র মোদীর নাম ঘোষণা হয়। তারপর থেকেই গোটা দেশজুড়ে একের পর এক সমাবেশ। প্রচারপর্বে সারাদিনে সাত আটটি করে সভা করেছেন। প্রাইভেট প্লেন এবং হেলিকপ্টারে ঘুরে বেড়িয়েছেন গোটা দেশ। গুয়াহাটি হোক বা কন্যাকুমারী, গভীর রাতে কিন্তু ফিরে গেছেন আমেদাবাদে। কয়েক ঘণ্টা বিশ্রামের পর আবার ভোর না হতেই বেরিয়ে বিমানে চড়েছেন। আমেদাবাদে নিজের ঘরে না ফিরলে তাঁর নাকি স্বস্তি হয় না।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর অবশ্য এই স্বস্তি বিসর্জন দিতে হবে নরেন্দ্র মোদীকে। দিল্লির সাত নম্বর রেসকোর্সের নতুন বাসিন্দা নরেন্দ্র মোদী।