রাইসিনাতেই সম্পূর্ণ জীবনের বৃত্ত

Last Updated: Wednesday, July 25, 2012 - 10:17

ভারতীয় রাজনীতির চাণক্য! গত কয়েক দশক ধরে কেন্দ্রের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্ব সামলেছেন। কংগ্রেসের একচ্ছত্র আধিপত্যের জমানায় যেমন স্বচ্ছন্দ তিনি, তেমনই জোট রাজনীতির যুগেও শরিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ রচনার সেতুও তিনি। বীরভূমের কীর্ণাহারের নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ এবার আগামী ৫ বছরের জন্য রাইসিনা হিলসের বাসিন্দা।
রাজনীতির হাতেখড়ূ হয়েছিল অজয় মুখোপাধ্যায়ের বাংলা কংগ্রেসে। ১৯৬৯-এ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের রাজনীতিতে যুক্ত হন। আর সে বছরই ইন্দিরা গান্ধীর সৌজন্যে রাজ্যসভার সাংসদ মনোনীত হন প্রণব মুখোপাধ্যায়। সূত্রপাতেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল যাঁর ভাবী রাজনৈতিক জীবনের নাটকীয়তা। এরপর ১৯৭৫, ১৯৮১, ১৯৯১ এবং ১৯৯৯-এও রাজ্যসভার সাংসদ নির্বাচিত হন। 
এর মাঝখানে ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন প্রতিমন্ত্রী হয়ে মন্ত্রিসভায় ঢোকার পর ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের দায়িত্ব সামলেছেন প্রণব মুখোপাধ্যায়।  পি ভি নরসীমা রাওয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বে প্রথমে যোজনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান পরে ১৯৯৫-৯৬-এ কেন্দ্রীয় বিদেশমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলেছেন প্রণববাবু। এর আগে ১৯৮৬-তে রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধাচারণ করে কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে রাষ্ট্রীয় সমাজবাদী কংগ্রেস নামে নতুন একটি দল তৈরি করেছিলেন তিনি। তবে ৩ বছর পরেই আবার কংগ্রেসে ফিরে আসেন।
 
সোনিয়া গান্ধী কংগ্রেস সভানেত্রী হওয়ার পর কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। ২০০০ থেকে২০১০ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি পদে আসীন ছিলেন তিনি। ২০০৪-এ মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর থেকে জিতে প্রথম লোকসভায় পদার্পণ তাঁর। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট কেন্দ্রে সরকার গড়ার পরে লোকসভায় দলনেতা নির্বাচিত হন তিনি। এরপর ইউপিএ সরকারের প্রথম দফার কার্যকালে তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রক এবং বিদেশমন্ত্রকের দায়িত্বে ছিলেন। তারপর দ্বিতীয় পর্বে আসেন অর্থমন্ত্রকের দায়িত্বে।  
 
রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসাবে তাঁর নাম ঘোষণার সময় ২৭টি মন্ত্রিগোষ্ঠীর মধ্যে ১৩টির সদস্য প্রণববাবু। ১২টি বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রিগোষ্ঠীর সবকটিতেই তাঁর নাম। ১০টি ক্যাবিনেট কমিটির মধ্যে ৮টির সদস্য তিনি। পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, ইউপিএ সরকারের ক্রাইসিস ম্যানেজার রাইসিনা হিলসে চলে গেলে প্রতি মুহূর্তে তাঁর অভাব বোধ করবে জনপথ-রেসকোর্স রোড।
বলেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রণব মুখোপাধ্যায়ের দীর্ঘ পাঁচ দশকের রাজনৈতিক জীবনের সুর বাঁধা রয়েছে, তাঁর প্রথম জীবনের শিক্ষকতাতেই।  সেই প্রাজ্ঞ-একনিষ্ঠ-স্থিতধী-শৃঙ্খলাপরায়ণ রাজনীতিক, প্রণব মুখোপাধ্যায় আজ বসবেন দেশের অভিভাবকের পদে। শিক্ষকতার নতুন অধ্যায়। যদিও, অনেক রাজনীতিবিদের মতে, প্রণববাবুর প্রথম জীবনের শিক্ষকতায় শুরু বৃত্তই আজ সম্পূর্ণ হবে।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫৯-এ ইতিহাস ও ১৯৬২-তে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পান প্রণব মুখোপাধ্যায়। ১৯৬৩-তে আইন পাশ করেন। কর্মজীবনের শুরুতে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষায়তনে পড়াতেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। সাংবাদিক, সরকারি কর্মচারী ও আইনজীবী হিসেবেও কাজ করেছেন। ষাটের দশকের শেষ থেকে পুরোদস্তুর রাজনীতিক। রাজনীতির বাইরে তাঁর পেশাগত জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও দুটি পরিচয়। অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদ। ইন্দিরা গান্ধীর সময় থেকেই ভারতীয় অর্থনীতিতে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের পরিচিতি বিশেষজ্ঞ হিসেবেই। অর্থমন্ত্রী, যোজনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান, এআইসিসির অর্থ সেলের প্রধান, সমস্ত দায়িত্বই সামলেছেন তিনি। ১৯৮৪ সালে বিশ্বের সেরা অর্থমন্ত্রী মনোনীত হন। ২০১০-এ পান এশিয়ার সেরা অর্থমন্ত্রীর সম্মান।   
প্রণব মুখোপাধ্যায়ের শিক্ষাবিদ পরিচয়টি অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ পরিচিতির অনুপাতে অনেকটাই সুপ্ত। কিন্তু, ঘনিষ্ঠেরা বলেন প্রথম জীবনের শিক্ষকতাই তাঁর গোটা কেরিয়ারের সুর বেঁধে দিয়েছিল। প্রণব মুখোপাধ্যায়ের শিক্ষক পরিচয় প্রকাশ পায় তাঁর প্রগাঢ় জ্ঞান, নির্ভুল স্মরণশক্তি এবং শৃঙ্খলা পরায়ণতায়। এই শৃঙ্খলা পরায়ণতার কারণেই ১৯৯৭-এ শ্রেষ্ট সাংসদ নির্বাচিত হন প্রণব মুখোপাধ্যায়। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনে প্রশাসকের ভূমিকায় কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট উপাধি রয়েছে তাঁর। অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিলিট উপাধি পেয়েছেন। ডক্টরস অফ লেটার উপাধি পান উলভারহ্যামটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ২০০৮-এ দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান পদ্মবিভূষণ পেয়েছেন প্রণব মুখোপাধ্যায়। আর বুধবার বসবেন দেশের সর্বোচ্চ পদে। রাষ্ট্রপতি। সংসদীয় গণতন্ত্রের অভিভাবক। এও তো এক শিক্ষকতাই!



First Published: Wednesday, July 25, 2012 - 10:17


comments powered by Disqus