নির্মম ব্রিটিশ আগ্রাসনের সাক্ষী ইডেনের ২২গজ

Last Updated: Saturday, December 8, 2012 - 19:31

পরাজয়ের চিত্রনাট্য তো কালকেই লেখা হয়ে গিয়েছিল। তবু কোন অলৌকিকের সন্ধানে সপ্তাহন্তের শনিবাসরীয় ইডেনে ভিড় জমিয়ে ছিল কলকাতা। জয় না হয় নাই হল, একটা সম্মানজনক ড্রয়ের আশায়। আগের ইনিংসে সচিনের ফর্ম ফিরে পাওয়ার ঝলক যদি আর একবার দেখা মেলে, যদি ক্লিক করে যায় বীরু-গোতি জুটি, নিদেনপক্ষে যদি দেখা মেলে চেতেশ্বর পূজারার কোন ধ্রুপদী ইনিংসের। কিন্তু কিচ্ছু হল না। চা বিরতির পরেই ইডেনের ২২ গজে যখন অশ্বিন আর ইশান্ত শর্মা, স্কোরবোর্ড ইঙ্গিত দিচ্ছে ৮ উইকেট পতনের। রান মেরেকেটে ১৬১। আর ইডেনের বাইরে তখন ঘর ফেরত হতাশ মুখের সারি। নিজের শহরে লজ্জাজনক হারের সাক্ষী হতে চাইল না অধিকাংশ ইডেনবাসী। তবে শেষ বেলায় রয়ে যাওয়া গুটি কতক দর্শকদের কিছুটা চোখের শান্তি জোগালেন অশ্বিন। রথী মহারথীদের ব্যার্থতার দিনে ইডেন জুড়ে উজ্জ্বল একা তিনি। পিচ জুজুর গল্প কালকেই বোর্ড প্রেসিডেন্টের গলাতে শোনা গিয়েছিল। অশ্বিনের ব্যাটে জয় না আসুক, পিচ বোধহয় দোষ মুক্ত হল। এই ভারতীয় স্পিনার দেখিয়ে দিলেন ব্যর্থতার কারণ ২২ গজে নয়। লুকিয়ে আছে টিম ইন্ডিয়ার `বিগি`দের ব্যাটের মাঝখানেই। মূলত অশ্বিনের জন্যই ইডেনের সঙ্গে ওয়াংখেড়ের কি়ঞ্চিত পার্থক্য রয়ে গেল। চারদিনে বান্ডিল হওয়ার বদলে অন্তত টেস্টের শেষদিনে মাঠে নামবে ধোনিবাহিনী। ইডেন টেস্টের চতুর্থ দিনের শেষে ভারতের স্কোর ৯ উইকেটে ২৩৯। ক্রিজে ৮৩ রানে অপরাজিত অশ্বিন। সঙ্গে রয়েছেন প্রজ্ঞান ওঝা। এখনও পর্যন্ত ৩৭ রানে এগিয়ে রয়েছে টিম ইন্ডিয়া।
শুধু লজ্জাজনক? ইডেন টেস্টের চতুর্থ দিনে বিশ্বের তথাকথিত সেরা ব্যাটিং লাইনাপের শোচনীয় প্যারফর্মেন্স দেখলে লজ্জা শব্দটাও বোধহয় তীব্রতা অনুসন্ধানী হবে। শ্রীনিবাসনও যতই পিচ কিউরেটর প্রবীর মুখার্জীকে কাঠগোড়ায় দাঁড় করাতে চান না কেন, এ লজ্জাজনক পরিস্থিতির দায়ভার ধোনিবাহিনীকে নিতেই হবে। এই পিচেই তো গত দু`দিন ধরে বীর বিক্রমে রাজত্ব করেছেন কুক অ্যান্ড কোম্পানী। সেই পিচেই কেন অ্যান্ডারসনকে খেলতে হাঁটুর কাপুনি ধরবে বিশ্ব ক্রিকেটের তাবড় তাবড় ব্যাটসম্যানদের? বিদেশের মাঠে হোয়াইট ওয়াশ হওয়ার থেকেও হোম গ্রাউন্ডে এরকম নাকানিচোবানি খেয়ে পরাজয়ের কলঙ্ক কি অনেক বেশি নয়? জাহির খান, ইশান্তরা যেখানে বহু কারসাজি শেষেও চরম ব্যর্থ, কী ভাবে সেখানে এতটা সফল ফিন, পনেসররা? এই সব প্রশ্নের উত্তর কোথায় গেলে পাওয়া যাবে তারই বোধহয় সন্ধান করছে আজকের ইডেন।
শুরুটা অবশ্য ভালই করে ছিলেন বীরু-গোতি। সেওয়াগের ব্যাটিং তান্ডবের ঝিলিকে লাঞ্চের আগে হাসি ফুটেছিল ইডেনের মুখে। কিন্তু লাঞ্চের পর সবাই কেমন যেন শুধু যাওয়া আসার ফর্মুলায় মেতে উঠলেন। লাঞ্চের পরেই প্রথম ইন্দ্রপতন শুরু সেওয়াগকে দিয়ে। সয়ানের যে বলটা বীরুর ব্যাটের ভিতরের কিনারা ছুঁয়ে যেতেই অফ স্টাম্পকে নাড়িয়ে দিল, সত্যিই কি সেওয়াগকে সেই বলে আউট হওয়া মানায়? এক রানের জন্য অর্ধশতরানটাও মাঠেই ফেলে এলেন তিনি। আগের দুই টেস্টের ভারতের ব্যাটিং ত্রাতা পুজারার অবদান ছিল ১৬। দ্বিতীয় ইনিংসে এর অর্দ্ধেক রান যোগ করলেন স্কোরবোর্ডে। তিনি প্রমাণ করলেন দ্রাবিড় হওয়ার জন্য আরও বহু পথ হেঁটে আসতে হবে তাঁকে। এরপরেই সতীর্থদের সঙ্গ দিতে ৪০ রানে প্যাভিলিয়নে ফিরে গেলেন গম্ভীর। এবং তিনি, সচিন তেন্ডুলকর। প্রথম টেস্টে তাঁর ৭৩ রানে ফেরার মধ্যে দিয়ে আশায় বুক বেঁধেছিল আপামর ক্রিকেটপ্রেমীরা। কিন্তু টেস্টে ৫১ শতরানের মালিক দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁর খারাপ খেলার ঐতিহ্যটা ইডেনেও বজায় রাখলেন। মাত্র ৫ রানে সয়ানের বলে আউট হয়ে ফিরে গেলেন তিনি। সঙ্গে উসকে দিয়ে গেলেন তাঁর অবসরের সমস্ত জল্পনাকে। তারপর যুবরাজ ১১ আর অধিনায়ক ধোনি শূন্য রানে আউট হয়ে ব্রিটিশদের কাছে পরাজয় নিশ্চিত করে ফেললেন। শেষ কবে যেন টেস্টে ধোনির ব্যাটে আগুন জলেছিল?
চতুর্থ দিনের শুরুতে ইংরেজবাহিনী ৫২৩ রানে সব উইকেট খুইয়ে প্রথম ইনিংস শেষ করেছিল। গতকালের ক্লান্ত ভারতীয় বোলাররা আজ হঠাত্ই যেন ঝলসে ওঠে। তৃতীয় দিনের শেষে ইংল্যান্ডের রান ছিল ৬ উইকেটে ৫০৯ রান। গতকাল দিনের শেষে ক্রিজে টিকে থাকা দুই ইংরেজ ব্যাটসম্যান সকাল সকাল প্যাভিলিয়নমুখী হন। প্রথম ওভারের দ্বিতীয় বলের মাথায় সয়ানকে (২১) তুলে নেন প্রজ্ঞান ওঝা। পরের ওভারে জাহির খান আউট করেন প্রায়রকে (৪১)। রবিচন্দ্রন অশ্বিন পরপর ২টো উইকেট নিয়ে ইংরেজ এক্সপ্রেসকে থামিয়ে দেন। জেমস অ্যান্ডারসন ৯ ও মন্টি পনেসর কোনও রান না করে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান। আজ শুরুতে মাত্র ৫ ওভারের মধ্যে ৪টি উইকেট তুলে নেয় ভারতীয় বোলাররা। অবশ্য তাতে লাভ যে কিছুই হল না তার প্রমাণ মিলল ভারতীয়রা প্যাড বেঁধে হাতে ব্যাট নিয়ে খেলতে নামার পর থেকেই।
কালকে ভারত মাঠে নামবে ইংল্যান্ডের ইডেন জয়ের সাক্ষী থাকতে। এরপরের টেস্ট নাগপুরে। হারনো সম্মান পুনরুদ্ধার অসম্ভব। তাও নাগপুর টেস্টে জয় আসলে হয়ত মুখ টুকু দেখাতে পারবেন ধোনিরা। যদিও পরপর ২টো টেস্টে পরাজয়ের পর তাঁদের উপর ভরসা অতি বড় দেশপ্রেমীও করবেন না। বার বার ব্যর্থ হয়ে শুধু নামের ভারে এ দেশে পার পেয়ে যান অনেকেই। অস্ট্রেলিয়ানদের মত দুঃসাহস দেখাতে না পারার দরুণ চিরকালই ভুগতে হয়েছে ভারতকে। হয়ত মনোজ, দিন্দারা নাগপুরেও ব্রাত্যই রয়ে যাবেন। কিন্তু এভাবে আর কত দিন? এবং ক্যাপ্টেন কুল? বোর্ড প্রেসিডেন্টের বদান্যতাও কী এরপরেও তাঁর ব্যার্থতাকে আড়াল করতে পারবে? তবে ধন্যবাদ ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলকে। তাঁদের সৌজন্যেইতো টেস্টে ভারতের দৈন্যদশার কঙ্কালটা গুহা থেকে অন্তত বেড়িয়ে এল।



First Published: Saturday, December 8, 2012 - 19:31


comments powered by Disqus