মধুপুরে হনিমুন

Last Updated: Monday, February 11, 2013 - 19:02

পার্থ প্রতিম চন্দ্র
কী বলো কী ঘোষ! আমাদের অ্যাড এজেন্সির ৫০ বছরের গ্রান্ড সেলিব্রেশনের এত বড় পার্টি, বলিউডের হিরো আসছে, তাতে তুমি থাকবে না! তাছাড়া তোমার জীবনের এতগুলো বসন্ত কেটে গেল, কিন্তু সেই অতি দামী মণিটাকে মানে তোমার জীবনসঙ্গিনীকে তো কেউই দেখলই না। কোনও পার্টি, কোনও অনুষ্ঠান বাড়ি কিছুতেই তো নিয়ে এলে না। এবার গ্র্যান্ডসেলিব্রেশন অন্তত তাকে নিয়ে এসো।
কথাটা শুনে জলের গ্লাসটা হাতে তুলে নিয়ে পরিতোষ বলল, না বিগ ব্রাদার, গত ২৪ বছরের মত এবারও আমি অফিসের বার্থ ডে সেলিব্রেশনে থাকতে পারছি না। জানোই তো ফেব্রয়ারির ওই সপ্তাহেই প্রতিবার আমার বউকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে যাই। তাছাড়া এবার আমাদের ২৫ তম বিবাহবার্ষিকী। ব্যাপরটা একটু বোঝো। জানি অফিসের এবার কড়া সার্কুলার। সবাইকে পার্টিতে থাকতেই হবে, মুখার্জি সাহেব কিছুতেই আমায় ছুটি দিতে চাইছেন না। কিন্তু তুমি তো বোঝো নিজের বউয়ের জন্য এটুকু না করতে পারলে কতটা খারাপ লাগে। তুমি অফিসের সবচেয়ে সিনিয়ার মানুষ। তুমি মুখার্জি সাহেবকে বললে হয়তো আমি ছুটিটা পেয়েও যেতে পারি।
ব্যস, আবেগি মানুষ মিত্রদাকে ওই কথাগুলো বলে দারুণ কাজে দিয়েছিল। এই কারণেই পরিতোষ ঘোষ এখন দূরপাল্লার এসি ট্রেনের কামরার সিটে বসে পা দোলাচ্ছে। অফিসের কড়া রুলকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পরিতোষ ঘোষ এখন চলেছে হনিমুনে, হ্যাঁ এই ৫৫ বছর বয়সেও.... আর আধঘণ্টা পরেই সে নেমে পড়বে তাঁর গন্তব্যের স্টেশনটায়। গত ২৪ বছর ধরে মধুপুর নামের এক জায়গায় তার পছন্দের হনিমুন স্পটে সে এবারও পৌঁছে যাবে। ভাবতেও আনন্দ হচ্ছে পরিতোষের। অবশ্য গতকাল রাতে বড় একটা অঘটন ঘটে যাচ্ছিল, যে অঘটনটা ঘটে গেল যে একেবার মরে যেত পরিতোষ।
রাতে এখন আর সেভাবে ঘুম আসে না পরিতোষের। ট্রেনের প্রচণ্ড দুলুনিতে ঘুম বাবাজি ধরা দেবেন না বলে, ঘুম বাবাজিকে ধরতে ট্রেনের মধ্যেই হাঁটতে শুরু করেছিল পরিতোষ। কী একটা চিন্তা করতে করতে একটার পর একটা কম্পার্টম্যান্ট টপকে যেতে থাকল। কিন্তু বিপদটা বাধল সেকেন্ড ক্লাসের থ্রি টায়ার কামরার মুখটায়। হঠাত্‍ ধাক্কাটা লাগল এমন একজনের সঙ্গে যাকে দেখে বুকস্পন্দনটা মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল পরিতোষের।

আরে ঘোষ দা তুমি! সিকদারের কথার ধাক্কাটা সামলে নিয়ে পরিতোষ বলল, আরে এটা তো আমি তোমায় জিজ্ঞাসা করব। সিনিয়ার হিসাবে আগে এটা তো আমার প্রশ্ন হওয়ার কথা। কিন্তু মিস্টার ঘোষ আপনাকে সম্মানের সঙ্গে জানাই, আপানাকে তো আমি অফিসের আড্ডা, অফিসিয়াল মেলে বাবরার বলেছি শ্বাশুড়ি মায়ের শরীর খারাপের জন্য বউকে নিয়ে কটকে আমার শ্বশুরবাড়ি যেতে হচ্ছে। আর এ কথাও তোমার জানা যে আমি এই ট্রেনেই সফর করব। কিন্তু অবাক করলে তুমি। শুধু বউয়ের সঙ্গে নীরবে সফর করবে বলে আমার কাছে তোমার সফরসূচি এভাবে চেপে গেলেন! আগে বললে দুজনে পাশাপাশি সফর করতে পারতাম। সে যাই হোক। দেখাই যখন হয়ে গেল তখন চলো বৌদির সঙ্গে এবার আলাপটা করিয়ে দাও।
পরিতোষ ঠিক বুঝতে পেরে গেছে আর পালানোর কোনও পথ নেই, বছর ৩২-এর এই ছেলেটার যুক্তি, এনার্জির কাছে তাকে হার মানতেই হবে। হাতটাকে চেপে শ্রীমান সিকদার বলল, আরে ঘোষ দা চলো চলো, তোমার কামরায় চলো। বৌদির একটা ছবি তুলতে হবে। যতই হোক বাজি জেতার ব্যাপার। কথাটা পরিতোষের টেনশনটা আরও বাড়িয়ে দিল। তবু কৃত্রিম হেসে বলল... বাজি! কিসের বাজি!
সিকদার বলল, আরে বাবা অফিসে তোমার আড়ালে আমাদের একটা চ্যালেঞ্জ মানে গেম আছে। চ্যালেঞ্জটা হল পৃথিবীর দুটো জিনিসের একটা ছবি জোগাড় করতে পারলেই কলকাতার সবচেয়ে বড় রেস্টুরেস্টে পেট ভরে বিনামূল্যে খাওয়ানো হবে। কিসের ছবি! কাঁপা কাঁপা গলায় পরিতোষ জিজ্ঞাসা করল। একটা ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কান্নার ছবি, আর এতদিন ধরে তোমার লুকিয়ে রাখা বউয়ের ছবি। যে কোনও একটা ছবি জোগাড় করতেই পারলেই সে জিতে যাবে।
এত ভয়ের মাঝেও পরিতোষ এবার সত্যি হেসে ফেলল, সে নিজেও জানে তার বউকে সবার কাছ থেকে আড়াল করে রাখাটা অফিসের সহকর্মীদের কাছে আলোচনার একটা বড় খোরাক।
তাড়াতাড়ি চলো ঘোষ দা। সিকদারের এই কথাটা পরিতোষকে আবার বাস্তবের রুক্ষ মাটিতে নিয়ে এল। আর কিছু করার নেই। এবার তো সবাই দেখে নেবে, জেনে ফেলবে তার আসল ব্যাপরটা। ২৫ বছর ধরে সে যে এই বিষয়টার জন্য এত পরিশ্রম করল সেগুলো সব জলে চলে যাবে। সিকদার যখন বলেছে, ও মধুশ্রী মানে তার সাতপাকে বাধা পরা স্ত্রীকে দেখবেই তখন ও দেখে ছাড়বেই। কত বড় ভুল সে করে ফেলল, হায় রে এই ট্রেনেই তাকে উঠতে হল। একবারও খেয়াল করল না এতগুলো বছরের একটা গোপনীয়তার স্বার্থে তার মনে রাখার উচিত ছিল এই একই ট্রেনে তার অফিসের এক সহকর্মীও সফর করবে!
আস্তে আস্তে নিজের কামরার দিকে এগিয়ে চলল পরিতোষ। কিছুটা আগে চলেছে সিকদার। কী সব জানো বলে যাচ্ছে ও। কিছু মাথায় ঢুকছে না। কিছু শুনতে পাচ্ছে না সে। এই তো আর মাত্র দুটো কামরা পেরোলেই তার বসার জায়গা এসে যাবে। তারপর মধুশ্রী... এরপর তার কান্নাভেজা স্বীকারোক্তি...

কিন্তু এত সহজে হাল ছেড়ে দেবে ও! অফিস হলে এরকম বিপদের সময়ে সে কী করত... তার অ্যাড এজেন্সির কোম্পানিতে কাজ ঠিকমত না হলে সবাইকে জ্ঞান দিয়ে সে বলত ঠিকমত বিজ্ঞাপন করলে কুঁড়েঘরকেও অনায়াসে দামী ফ্ল্যাটের দামে বিক্রি করা যায়। আসল হল বিজ্ঞাপন, বুঝলে বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন মানে তো কৌশলে সত্যিকে আড়াল করে প্রোডাক্টের এমন একটা দিক তুলে ধরা যে আছে না নেই সেটা আসল নয়, আসল হল জোর গলায় সেটা বলা। এখন সেটাই করতে হবে পরিতোষকে। সেটা মনে করে সে খুব তাড়াতাড়ি ভেবে নিল পরিস্থিতিটা। তার সিটের উল্টো দিকে শুয়ে বছর ২৫এর এক যুবক। তার ওপরের বাঙ্কে তার মা। আর পরিতোষের মাথার ওপরের বাঙ্কে শুয়ে ছেলেটার দিদি। এখন ওরা সবাই ঘুমিয়ে রয়েছে। এই দারুণ একটা সুযোগ।
নিজের কামরায় ঢুকেই নিজের সিটের ওপরের বাঙ্কের দিকে হাত দেখিয়ে পরিতোষ বলল, এই রে ওই দেখ তোমার বৌদি নিদ্রাপুর স্টেশনে নেমে পড়েছেন। দাঁড়াও এবার ওকে ডেকে তুলি। সিকদার এই প্রথমবার একটু অপ্রস্তুত হল। সিকদার ভাবল সত্যিই তো এত রাতে কাউকে ডেকে তুলে বলা যায়! ঘুম থেকে তুলে কি বলবে সে! বৌদি আমি অমুক, আপনার একটা ছবি তুলব কারণ অফিসের একটা বাজি জেতা। সবদিক ভেবে সিকদার বলে উঠল, না না ঘোষ দা ছেড়ে দাও এত রাতে আর... তাছাড়া ঘণ্টাখানেক পরেই আমার স্টেশন এসে পড়বে। তখন তো রাত তিনটে বাজবে। থাক বুঝতে পারলাম এবার আর আমার বাজি জেতা হল না। তবে বৌদির পা`টা দেখতে পেলাম সেটাও কম কীসের, কি বলো! তুমি বরং এখন চলো আমার কামরায় কিছুক্ষণ বসবে। এখন আর ঘুমবো না, নামতে হবে তো।
কথাগুলো ভেবে এখন হাসছে পরিতোষ। অঙ্কের স্যার একবার বলেছিল, উপস্থিত বুদ্ধিটা তোর বেশ ভাল রে পটা। বিপদের সময় সেটা আরও একবার প্রমাণ হল। যাই হোক তার স্টেশন এসে যাচ্ছে। এবার নামতে হবে তাকে। আগে থেকে খোঁজ নিয়ে জেনেছে, এই স্টেশনে নেমে টানা আড়াই ঘণ্টা যাওয়ার পর বাস। তারপর আধ ঘণ্টা ট্রেকার, সেখান থেকে আরও আধ মাইল মত পথ ভ্যানে গেলে মধুপুর নামের সেই হনিমুন স্পট। কিন্তু কী আশ্চর্য সে এক অবাক হনিমুনে চলেছে। তার হাতে শুধু গড়িয়াহাটের ফুট থেকে কেনা সস্তা একটা ব্যাগ। তার ভিতর অছে একটা তোয়ালে, দুটো বিস্কুটের প্যাকেট আর একটা কম্বল। সঙ্গে আর কেউ নেই, কিচ্ছু নেই।
সে একাই চলেছে হনিমুনের পথে। কিন্তু একা একা আবার হনিমুন হয় নাকি! হয়, হয় পরিতোষের পৃথিবীতে হয়। গত ২৪ বছর ধরে এটাই হয়ে আসছে। গোটা দুনিয়ার চোখে ধুলো দিয়ে ফেব্রুয়ারির মাঝের সপ্তাহে সে হনিমুন করতে আসে শুধু একটা কথাকে বিশ্বাসে রূপ দিতে। বছর ২৬ আগে ট্রামে এমন একজনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তার, সেই মানুষটাই তাকে এই কল্পনার বিশ্বাসের সমুদ্রে গা ভাসাতে শিখিয়েছিল। তার নামটা ছিল মধুশ্রী।
রোজ অফিস যাওয়া আর ফেরতের পথে দেখা হত ওর সঙ্গে। প্রথমে চোখাচোখিতে আলাপ, সেই আলাপটা হতে অবশ্য ছ মাস লেগে গিয়েছিল। তারপর ঘনিষ্ঠ হতে লেগেছিল আরও দু মাস। অবশ্য ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল বলে পার্কে কিংবা সিনেমা হলে কোথাও দেখা করেনি ওরা। শুধু সোম থেকে শুক্রবার অফিসে একসঙ্গে যাওয়া আর ফেরা। আসলে ওদের ভালবাসাটা এই রকমই ছিল। প্রেমের বেশিটাই হত ট্রামে। দুজনে দুজনকে একবারও ছুঁয়ে দেখেনি কখনও।

এরকমই চলতে চলতে একদিন বলে বসল পরিতোষ। এই জানুয়ারিতেই তোমায় বিয়ে করব মধুশ্রী। তারপর ফেব্রুয়ারিতে হনিমুনে। কথাটা শুনে মধুশ্রীর মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছিল। শুধু বলেছিল তুমি সত্যি বলছো! কিন্তু আমি কি এতটা ভাগ্যবান। উত্তরটা শুনে চমকে পরিতোষ বলেছিল, আর ওসব ছাড়ো। আগে বল হনিমুনে কোথায় যাবে। মধুশ্রী হাসি মুখে বলল, মধুপুর। জানো মধুপুর আমার খুব ফেভারিট জায়গা। স্বপ্নে দেখি আমি তোমার সঙ্গে মধুপুর যাচ্ছি।
ব্যস সেই শেষ কথা। তারপর সে মধুশ্রীকে আর কোনওদিন দেখতে পায়নি। অনেক খোঁজ করেছে। তার পরিচিত এক বন্ধুর দাদা লালবাজারে পুলিসের এক বড় কর্তা। তাঁর কাছে দ্বারস্থ হয়েও ফল মেলেনি। মধুশ্রী সম্বন্ধে সে বিশেষ কিছু জানত না। শুধু জানত সে উত্তর কলকাতায় থাকে, আর ধর্মতলায় একটা কাপড়ের দোকানে কাজ করে। আর কোনও বিষয়ে জানার প্রয়োজনই সে মনে করেনি। এমনকী ওর পদবিটা অবধি। মধুশ্রীকে খোঁজ করতে নেমে একটা উত্তর সে পেয়েছে, ওইরকম কোনও মেয়ে এই শহরে কোনওদিন ছিল না।
পরিতোষের সাতকুলে কেউ নেই। মা অনেক ছোটবেলাতেই মারা যান। পরিতোষের যখন ১৫ বছর বয়স, তখন ওর বাবাও পৃথিবীর মায়াত্যাগ করে চলে যান। ঘর থেকে বেরোয় না বলে পাড়ার কেউ তাকে চেনে না। সমাজ বলতে তার কাছে শুধু অফিস। সেই অফিসে সে বলেছিল জানুয়ারিতেই সে মধুশ্রী নামের একটা মেয়েকে বিয়ে করবে। মেয়ের বাবা কর্মসূত্রে লখনউতে থাকে। তাই বিয়ে করতে তাকে লখনউ যেতে হবে। তাই একেবারে ফেব্রুয়ারিতে হনিমুন করে অফিসে জয়েন করবে। ব্যস...এরপর সে ২৫ বছর ধরে একটা মিথ্যা ঢাকতে আর বিশ্বাসের ভালবাসাকে জেতাতে ফেব্রুয়ারিতে হনিমুনে যেতে থাকল।
এই এতগুলো বছর ধরে সে যে অবিবাহিত এই কথাটা ঢাকতে অনেক মিথ্যা বলতে হয়েছে। অবশ্য এটা যে মিথ্যা সেটা পরিতোষ মোটেও বিশ্বাস করে না। বিশ্বাস করবে নাই বা কেন। সে যে এতগুলো বছর ধরে কল্পনার মধুশ্রীর সঙ্গে সংসার করেছে, ইচ্ছামত আদর করেছে। কলকাতার যাতায়াত ব্যবস্থা আগের চেয়ে এখন অনেক উন্নত হয়েছে। তবু মেট্রো, ট্যাক্সিতে না চড়ে এখন পরিতোষ রোজ আউটলাইন হয়ে যাওয়ার রোগ থাকা ট্রামেই অফিস যায় আর ফেরে। আর ট্রামে উঠে বুঝতে পারে মধুশ্রী এখনও তাকে দেখছে।
তবে তার একটাই আফশোস। মধুশ্রীর সঙ্গে শেষ দিনটায় তাড়াহুড়োর চোটে জিজ্ঞাসা করতে ভুলে গেছিল, তার প্রিয় হনিমুনের জায়গা মধুপুরটা ঠিক কোথায়। কারণ এত বড় দেশে মধুপুর নামের জায়গা কম করে অন্তত একশোখানা তো হবেই। এই ভুলটার জন্যই এই ২৪ বছর ধরে ভারতের ২৪ টা মধুপুর নামের জায়গায় সে ঘুরতে গেছে। প্রথমটা শুরু হয়েছিল বিহার দিয়ে, এরপর উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ এমনকি পুরুলিয়াতেও সে ঘুরেছে। প্রত্যেকবার সে ভেবেছে এটাই তাদের হনিমুন স্পট।
রোদটা বেশ উঠেছে। তবু ভালই লাগছে। তাকে তাড়াতাড়ি পা চালাতে হবে এখন। এখনও তাকে অনেক পথ যেতে হবে। মধুপুর যে অনেক দূর, অনেক অনেক দূর...



First Published: Monday, February 11, 2013 - 19:02


comments powered by Disqus