)
প্রবীর চক্রবর্তী: সদ্য শেষ হয়েছে বিধানসভা নির্বাচন। বিজেপি রাজ্যে সরকার গড়েছে। তৃণমূল পেয়েছে ৮০টি সিট আর বিজেপি ২১০ টি সিট। ১৫ বছর পর মমতা তথা তৃণমূল কংগ্রেসের পতনে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র রক্তক্ষরণ। কে ঠিক কে ভুল? কোথায় ভুল হল? অভিষেক না আইপ্যাক-- কার ভুলে দলের এত বড় ভরাডুবি, তা নিয়ে চলছে বিস্তর কাটাছেঁড়া। ইতোমধ্যে দল ৪ জনকে সাসপেন্ড করেছে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ করে তৃণমূলের বিরুদ্ধে মুখ খোলায়।
আর এই আবহেই, যখন এক এক করে জয়ী প্রার্থীরা বিধানসভায় শপথ নিচ্ছেন, তখন তৃণমূলের একদা মুখপাত্র, বর্তমান জয়ী প্রার্থী কুণাল ঘোষ শপথ গ্রহণের পরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় বিস্ফোরক পোস্ট করলেন।

বেলেঘাটা বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক হিসেবে শপথ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিজ দলের একাংশের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন কুণাল ঘোষ। রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় পড়ে গিয়েছে এরপর। বৃহস্পতিবার বিধানসভায় শপথ গ্রহণের পর সামাজিক মাধ্যমে তিনি যে দীর্ঘ পোস্ট করেছেন, তাতে সরাসরি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশের বিরুদ্ধে স্বজনপোষণ এবং ‘হোয়াটসঅ্যাপ কাঁদুনি পলিটিক্স’-এর অভিযোগ তুলেছেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, নাম না নিলেও কুণালের মূল নিশানায় ছিলেন উত্তর কলকাতার সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।
বৃহস্পতিবার বেলেঘাটা কেন্দ্রের বিধায়ক হিসেবে কুণাল ঘোষকে শপথবাক্য পাঠ করান বিধানসভার প্রোটেম স্পিকার তাপস রায়। উল্লেখ্য, তাপস রায় একসময় তৃণমূলের হেভিওয়েট নেতা ছিলেন, যিনি বর্তমানে বিজেপির টিকিটে মানিকতলা থেকে জয়ী হয়েছেন। এই দৃশ্যকে ‘ভাগ্যচক্র’ বলেছেন কুণাল। তিনি ফেসবুকে লেখেন, 'দীর্ঘদিনের দাদা এবং নেতা তাপসদাকে তৃণমূলে রাখতে আমরা চেষ্টা করেছিলাম। পারিনি, দুর্ভাগ্য। পরে রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে আমি তাপসদাকে ভালো বলায় আমাকে দল সাসপেন্ড করেছিল। ঘটনাচক্রে আমি আজ দলের বিধায়ক এবং শপথবাক্য পাঠ করছি বিজেপির হয়ে জিতে আসা তাপসদার হাতে।'
সজল-তাপসদের দলত্যাগের নেপথ্যে তাহলে কারা?
কুণাল ঘোষ সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, তাপস রায় এবং সজল ঘোষের মতো দক্ষ নেতাদের ইচ্ছাকৃতভাবে তৃণমূল ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, উত্তর ও মধ্য কলকাতায় দলের পুরনো ও লড়াকু কর্মীদের কোণঠাসা করার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া চলছে। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, 'যাঁর বা যাঁদের জন্যে তাপসদা, সজলরা, আরও অনেকে দল ছেড়েছে, দলের ক্ষতি হয়েছে, তারপরেও একইরকম হোয়াটসঅ্যাপ কাঁদুনি পলিটিক্স করে স্বজনপোষণ চলছে, সেটা খুবই আপত্তির এবং উদ্বেগের।'
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘হোয়াটসঅ্যাপ কাঁদুনি পলিটিক্স’ এবং ‘স্বজনপোষণ’—এই দুই দিয়ে কুণাল সরাসরি সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কেই বিঁধেছেন। দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপে ‘আবেদন’ করে নিজের পছন্দের লোকেদের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার যে অভিযোগ সুদীপের বিরুদ্ধে বারংবার ওঠে, কুণাল এদিন সেই ক্ষতকেই উসকে দিয়েছেন। বিশেষ করে সুদীপের স্ত্রী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়কে সম্প্রতি পরিষদীয় দলের উপদলনেতা করায় কুণালের ক্ষোভ আরও বেড়েছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
'পুরানো বনাম নতুন'
কুণাল ঘোষ তাঁর পোস্টে সাফ জানিয়েছেন যে, তৃণমূলকে চাঙ্গা করতে হলে ‘আত্মবিশ্লেষণ’ জরুরি। তিনি নিজেকে ‘তৃণমূলের সৈনিক’ হিসেবে দাবি করলেও কর্মীদের ধৈর্য হারানোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর এই পোস্ট তৃণমূলে আরেকবার ‘পুরনো বনাম নতুন’ বা গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের তর্ক আবারও প্রকাশ্যে নিয়ে এল। কুণাল সম্ভবত বোঝাতে চেয়েছেন যে, উত্তর কলকাতায় দলের কিছু নেতার একাধিপত্যের কারণে নিচুতলার কর্মীরা হতাশ হয়ে পড়ছেন।
পাল্টা তোপ তাপস রায়ের
কুণালের এই মন্তব্য নিয়ে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন প্রোটেম স্পিকার তাপস রায়। ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলেন, 'মমতা তো খুব ভাল মানুষের পালস বোঝেন। দেওয়াল লিখন বোঝেন। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লবি, আর অন্যদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লবি! অরাজনৈতিক ও ধান্দাবাজ লোকেদের জন্য দলটার যা হওয়া উচিত, তাই হচ্ছে। ঐ দলের আর কিছু হবে না।
কুণাল ঘোষের এই বিস্ফোরক পোস্টের শেষে ‘পুনশ্চ: কেস দেবেন না প্লিজ’ লেখেন। রাজনৈতিক মহলের মতে আগামী দিনে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল আরও বাড়তে পারে।
খাস কলকাতায় তৃণমূলের টলোমলো অবস্থায় জয়লাভ করার পর কুণালের এই ‘বিদ্রোহ’ দলের উচ্চ নেতৃত্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে কি না, সেটাই দেখার। তবে কুণাল ঘোষের এই ‘আত্মবিশ্লেষণ’-এর ডাক যে শাসক শিবিরের অস্বস্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)