)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: নব্বইয়ের দশকে আমাদের দেশের ড্রইং রুমগুলি প্রায় একই রকম দেখতে ছিল। সেখানে থাকত একটি মাত্র টেলিভিশন এবং একটিই চ্যানেল, দূরদর্শন। বিনোদনের সুযোগ ছিল খুবই সীমিত। কিন্তু সেই সময়, হরিয়ানার কোথাও, সরকারি প্রচারের আলো থেকে দূরে এক ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁর মিডিয়া বা গণমাধ্যম নিয়ে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। তিনি দেখেছিলেন অন্যরকম ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
হরিয়ানার ওই ব্যবসায়ীর ইচ্ছা ছিল, ভারতীয় দর্শকরা যেন এমন কনটেন্ট বা অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ পান, যা বিভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষাকে তুলে ধরে। চেয়েছিলেন, ভারত যেন শুধু বিশ্ব বিনোদনের গ্রহণকারী না হয়ে, উৎপাদনকারী (producer) হয়ে ওঠে এবং সারা বিশ্বের পর্দায় অনুষ্ঠান সরবরাহ করে। এই দূরদর্শী এবং নতুন ভাবনার মানুষটি ছিলেন ড. সুভাষ চন্দ্র।
ড. সুভাষ চন্দ্রের যে ভাবনা শুরুতে সাহসী বলে মনে হয়েছিল, সেটি খুব শীঘ্রই ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিডিয়া বিপ্লব হয়ে উঠল। ১৯৯২ সালে জি টিভি (Zee TV) চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ড. সুভাষ চন্দ্র শুধু একটি নতুন চ্যানেলই নিয়ে আসেননি; তিনি মানুষের কাছে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। এটা ছিল এমন একটি সময় ছিল যা ভারতীয় পরিবারগুলির দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তন এনেছিল। এবং গোটা মিডিয়া পুরো শিল্পকে নতুন করে সাজিয়ে দিয়েছিল। এর পরের দশকগুলিতে, তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্তগুলি সবসময় সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিল। কেউ কেউ সেগুলিকে 'ঝুঁকিপূর্ণ' বলতেই পারে।
যখন শুধুমাত্র দূরদর্শনই একমাত্র সম্প্রচারকারী সংস্থা ছিল, সেই সময় ড. সুভাষ চন্দ্র জি টিভি (Zee TV) চালু করলেন। এটি ছিল ভারতের প্রথম বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেল (first private satellite channel)। এই পদক্ষেপটি ছিল একটি বিপ্লবী কাজ। কারণ সেই সময় ভারতে বেসরকারি সম্প্রচার সহজ ছিল না এবং এর উৎসাহও দেওয়া হতো না। জি টিভিকে সম্ভব করে তুলতে, চন্দ্র হংকং-এর এশিয়াস্যাট স্যাটেলাইট থেকে একটি ট্রান্সপন্ডার ভাড়া নেন। এর আগে কোনো ভারতীয় কোম্পানি এমন চেষ্টা করেনি। তাঁর এই একটিমাত্র সিদ্ধান্তের কারণে ভারত বহু চ্যানেলের (multi-channel) টেলিভিশন যুগে প্রবেশ করল।
ড. সুভাষ চন্দ্র প্রথমেই বুঝেছিলেন যে, ভারতের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যই তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি। জি টিভি সফল হওয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই, তিনি জি মারাঠি এবং জি বাংলা-এর মতো আঞ্চলিক ভাষার চ্যানেলগুলি চালু করেন। এর ফলে সারা দেশে আরও বেশি স্থানীয় বিনোদনের পথ তৈরি হয়ে যায়। জি-এর প্রথম মারাঠি ধারাবাহিক, 'আভালমায়া' (Abhalmaya), একটি সাংস্কৃতিক মাইলফলক হয়ে ওঠে।
ড. সুভাষ চন্দ্র শুধু ভারতের মধ্যেই থেমে থাকেননি। তিনি প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে ভারতীয় কনটেন্টের বিশ্বব্যাপী চাহিদা দেখতে পেয়েছিলেন। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে, জি ইন্টারন্যাশনাল মধ্যপ্রাচ্য, ইউকে, আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকায় চ্যানেল চালু করে। এর ফলে জি (Zee) হয়ে ওঠে প্রথম ভারতীয় সম্প্রচারকারী যার বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ড। আজ, জি-এর কনটেন্ট ১৯০টিরও বেশি দেশে পৌঁছায়।
ডিশ টিভি
ভারতীয় সম্প্রচার প্রসারিত হচ্ছিল, কিন্তু কেবল বিতরণের ব্যবস্থাটি ছিল অপরিষ্কার। এই সমস্যার সমাধান করার জন্য, ড. সুভাষ চন্দ্র ডিশ টিভি (Dish TV) চালু করেন। এটি ছিল ভারতের প্রথম ডাইরেক্ট-টু-হোম (DTH) স্যাটেলাইট টেলিভিশন পরিষেবা। ডিশ টিভি যখন শুরু হয়েছিল, তখন কেবল অপারেটররা বাধা দিয়েছিল এবং জি চ্যানেলগুলি সম্প্রচার করতে অস্বীকার করেছিল। তবে চন্দ্র পিছিয়ে না এসে, স্যাটেলাইট বিতরণে ব্যাপক বিনিয়োগ করেন। ধীরে ধীরে ডিটিএইচ ব্যবস্থাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
ড. চন্দ্র জি নিউজ (Zee News) (ভারতের প্রথম দিকের বেসরকারি সংবাদ চ্যানেলগুলির মধ্যে একটি), সিনেমার জন্য জি স্টুডিওজ (Zee Studios) এবং ডিজিটাল স্ট্রিমিং-এ আসার জন্য Zee5 চালু করেন। ওটিটি-র (OTT) বৃদ্ধি আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন। এই সংযোজনগুলির মাধ্যমে জি একটি পূর্ণাঙ্গ মিডিয়া গোষ্ঠী হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে।
এই কাজগুলির মাধ্যমে ড. সুভাষ চন্দ্র শুধু ভারতের মিডিয়া বিবর্তনে তাঁর স্থানই নিশ্চিত করেননি, বরং বিশ্ব মিডিয়ার ইতিহাসে একটি অধ্যায়ও রচনা করেছেন। তাঁর দূরদর্শী ঝুঁকি, প্রযুক্তিনির্ভর বাজি টেলিভিশন ব্যবস্থাকে বদলে দিয়েছে।
তিনি এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন যা সৃষ্টিকর্তাদের ক্ষমতা দিয়েছে, অ্যাক্সেস বাড়িয়েছে এবং ভারতীয় গল্প বলার ধারাকে দেশের সীমানা পেরিয়ে নিয়ে গেছে। তাঁর এই অর্জন আজও বিশ্বজুড়ে ভারতকে কীভাবে দেখা হয়, শোনা হয় ও অনুভব করা হয়—তাকে প্রভাবিত করে চলেছে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)