)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: যৌন হেনস্থার বিচার মেলেনি! কলেজেই গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা ছাত্রীর! রাহুল বললেন 'প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা', ওডিশা বনধের ডাক...
কলেজ ছাত্রীর আত্মহত্যা:
যে আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তা-ই হল। শেষ হল তিন দিনের জীবন-মরণ লড়াই। মৃত্যু হল ৯৫ শতাংশ দগ্ধ হয়ে যাওয়া ওড়িশার নির্যাতিতার। সোমবার বেশি রাতের দিকে ভুবনেশ্বর এমসে মৃত্যু হয় তাঁর। কুপ্রস্তাবে তিনি রাজি হননি। তাই গত কয়েক মাস ধরে তাঁকে নানা ভাবে হেনস্থা করছেন বিভাগীয় প্রধান। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আর্জি জানিয়ে গত ১ জুলাই কলেজ কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছিলেন ওড়িশার বালাসোরের ছাত্রী।
ঘটনার সূত্রপাত:
পুলিস সূত্রে খবর, চিঠিতে ওই ছাত্রী লেখেন, ‘গত কয়েক মাস ধরে বিএড বিভাগের প্রধান তথা সহকারী অধ্যাপক ক্রমাগত হেনস্থা করে চলেছেন। পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, আমার ব্যক্তিগত সমস্ত তথ্য পরিবারকে জানিয়ে দেওয়ারও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল, বিভাগীয় প্রধান তাঁর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন বার বার। তাঁর প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় নানা ভাবে হেনস্থা করছেন। আমার মানসিক শান্তি কেড়ে নিয়েছেন তিনি। সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যারও চেষ্টা করেছিলাম।’
হাসপাতালের বয়ান:
ভুবনেশ্বর এমস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, সোমবার রাত ১১টা ৪৬ মিনিটে ওড়িশার বালসোরের ওই কলেজছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। গত শনিবার থেকে ভুবনেশ্বর এইমসের বার্ন আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। হাসপাতালের তরফে জানানো হয়েছে, তরুণীকে বাঁচানোর জন্য সম্ভাব্য সবরকম পদক্ষেপ করা হয়েছিল। তাঁর বৃক্কতন্ত্রও প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
ছাত্রীর অভিযোগ:
বালাসোরের ওই কলেজেরই এক বিভাগীয় প্রধান ওই ছাত্রীকে যৌন হেনস্থা করেছিলেন বলে অভিযোগ। তা নিয়ে কলেজের অভ্যন্তরীণ অভিযোগগ্রহণ কমিটি (আইসিসি)-র কাছে গত ১ জুলাই অভিযোগ জানিয়েছিলেন তিনি। কী ভাবে মাসের পর মাস তাঁকে যৌন হেনস্থা করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছিলেন কলেজ কর্তৃপক্ষকে। কিন্তু এর পরেও কর্তৃপক্ষ কোনও পদক্ষেপ করেননি বলে অভিযোগ। এর প্রতিবাদে কলেজ ক্যাম্পাসেও এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভ দেখান ওই নির্যাতিতা এবং তাঁর সহপাঠীরা।
অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কেন কোনও পদক্ষেপ করা হচ্ছে না, তা নিয়ে লাগাতার প্রশ্ন তুলছিলেন নিহত ছাত্রী। গত শনিবার এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষের সঙ্গেও দেখা করতে যান তিনি। সেখান থেকে বেরিয়েই কলেজ ক্যাম্পাসে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন নির্যাতিতা। তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে দগ্ধ হন আরও এক ছাত্র। দু'জনকেই সঙ্গে সঙ্গে জেলা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ছাত্রীর দেহের ৯৫ শতাংশই পুড়ে গিয়েছিল। তাঁর শারীরিক অবস্থা দেখে শনিবারই ভুবনেশ্বর এইমসে স্থানান্তর করা হয় তরুণীকে।
ভুবনেশ্বর এমসে ভর্তি হওয়ার পর থেকে শারীরিক অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি ওড়িশার কলেজের সেই নির্যাতিতার। চিকিৎসকেরা ওই সময় জানিয়েছিলেন, ছাত্রীর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ, তন্ত্র পুড়ে গিয়েছে। কিডনিও পুড়ে যাওয়ার কারণে তা কাজ করছিল না। তরুণীর ডায়ালিসিস চলছিল বলেও জানিয়েছিলেন চিকিৎসকেরা। ভিডিয়ো কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে চিকিৎসায় পরামর্শ দিচ্ছিলেন দিল্লি এমসের বিশেষজ্ঞেরাও। কিন্তু সোমবার রাতেই মৃত্যু হয় তাঁর।
গ্রেফতার অভিযুক্ত অধ্যাপক:
ছাত্রীকে যৌন হেনস্থায় অভিযুক্ত অধ্যাপককে গত শনিবারই গ্রেফতার করে পুলিস। সোমবার গ্রেফতার করা হয় কলেজের অধ্যক্ষকেও। সংবাদ সংস্থা পিটিআই অনুসারে, কলেজের অধ্যক্ষ ওই অভিযুক্তকে আড়াল করার চেষ্টা করছিলেন। তরুণীর বাবাও অভিযোগ তুলেছেন অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে। সংবাদমাধ্যমে তিনি জানিয়েছেন, অভিযোগ প্রত্যাহার করার জন্য অধ্যক্ষ চাপ দিচ্ছিলেন তরুণীকে। গত শনিবার অধ্যক্ষের ঘর থেকে বেরিয়েই যে তাঁর মেয়ে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন, সে কথাও বার বার উল্লেখ করছেন তরুণীর বাবা।
ওড়িশা বনধ:
তরুণীর আত্মহত্যার চেষ্টার পরে গোটা ওড়িশা জুড়ে ক্ষোভ-অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। ওড়িশার ওই ঘটনায় ইতিমধ্যে আসরে নেমেছে ওড়িশা পুলিসের অপরাধদমন শাখা। দুই সদস্যের একটি দল গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি ওড়িশার উচ্চশিক্ষা দফতরও পৃথক ভাবে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।
বাংলার শাসকদলের এক্স হ্যান্ডেলে লেখা হয়েছে, ‘ভিন্ন দিন, ভিন্ন শিকার। বিজেপি সরকারের তত্ত্বাবধানে সর্বত্র একই পচন ছড়িয়ে পড়েছে। ওড়িশার বালাসোরে এক ছাত্রীকে তাঁর বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কুপ্রস্তাব দেয়, তাঁর প্রস্তাব না মানলে ছাত্রীর ভবিষ্যৎ নষ্ট করার হুমকি দেয়। এর জেরে গায়ে পেট্রোল ঢেলে নিজেকে শেষ করে দিতে বাধ্য হন ওই যাত্রী। তাঁর শরীরের ৯৫ শতাংশ পুড়ে গিয়েছে। ছাত্রীকে বাঁচাতে গিয়ে তাঁর সহপাঠীর শরীরের ৭০ শতাংশ পুড়েছে।’ তৃণমূলের তরফে আরও লেখা হয়েছে, ‘গোটা ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝির নীরবতা অত্যন্ত লজ্জাজনক। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একটি শব্দও খরচ করেননি। এই ঘটনা আরও একবার প্রমাণ করে যে ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ প্রহসন ছাড়া কিছুই নয়।’
বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর বক্তব্য:
রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী সূর্যবংশী সূরজের পদত্যাগ দাবি করে পথে নেমেছে একাধিক রাজনৈতিক দল। আগামী ১৭ জুলাই আটটি দল একসঙ্গে মিলে রাজ্যজুড়ে ‘ওড়িশা বন্ধ’ ডেকেছে। গোটা ঘটনাটিকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা’ বলে তোপ দেগেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী।
ছাত্রীর মৃত্যুর খবর পেয়েই এক্স হ্যান্ডেলে ওড়িশার শাসক দল বিজেপিকে একহাত নিয়েছেন রাহুল গান্ধী। তিনি লেখেন, “সুবিচার চেয়ে লড়াই করা কন্যাকে কার্যত খুন করেছে বিজেপির সিস্টেম। যাদের উচিত ছিল তাঁকে রক্ষা করা, তারাই তাঁকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ওড়িশা হোক বা মণিপুর, আমাদের দেশের মেয়েরা মারা যাচ্ছেন। আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চুপ করে রয়েছেন।'
ওড়িশার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়কের বক্তব্য:
ছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় ব্যথিত ওড়িশার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়কও। এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লেখেন, 'সবচেয়ে যন্ত্রণার বিষয় হল, এই মৃত্যু কেবল দুর্ঘটনা নয়। যে সিস্টেমের উচিত ছিল তাঁকে সাহায্য করা, সেই সিস্টেমই চুপ করে থেকে তাঁকে হত্যা করেছে।’ তাঁর কথায়, 'একটি ব্যর্থ সিস্টেম কীভাবে কারও জীবন কেড়ে নিতে পারে তা ভাবতে আরও বেশি বিরক্তিকর লাগে। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হল এটি কোনও দুর্ঘটনা ছিল না বরং এমন একটি সিস্টেমের ফল যা সাহায্য করার পরিবর্তে নীরব ছিল। ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করতে করতে ওই ছাত্রী শেষ পর্যন্ত তার চোখ বন্ধ করে ফেলেছে।'
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ, গোটা ঘটনার বিচারবিভাগীয় তদন্তের মতো একাধিক দাবিতে বন্ধের ডাক দিয়েছে সিপিএম, বিজেডি, কংগ্রেস-সহ আটটি দল। আগামী ১৭ জুলাই ওড়িশাজুড়ে বন্ধ ডাকা হয়েছে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)