)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্য়ুরো: নিজের মেয়েকে হত্যার দায়ে জেল খেটেছিলেন। গোটা দেশের সামনে রাতারাতি খলনায়িকা হয়ে উঠেছিলেন। এত ঝড়ঝাপটা কাটিয়েও ফের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো। শিনা বোরা হত্যাকাণ্ডের (Sheena Bora murder case) সেই ইন্দ্রাণী মুখোপাধ্যায় (Indrani Mukerjea) ফের খবরের শিরোনামে। এবার জানা গেল, নগদ ৭ কোটি টাকা, গয়নাগাঁটি, সব খোয়া গিয়েছিল তাঁর। অন্য কেউ নন, সৎ ছেলে রাহুল মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধেই সর্বস্ব হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠছে।
ইন্দ্রাণীর ছোট মেয়ে বিধি মুখোপাধ্যায় (Bidhi Mukherjea) আদালতে এই তথ্য তুলে ধরেছেন। মঙ্গলবার বয়ান রেকর্ড করতে রাজি হননি বিধি। বরং তাঁর নামে যে নথিপত্র আদালতে তুলে ধরে CBI, সেগুলিকে জাল বলেও দাবি করেন তিনি। CBI আদালতের বিচারক জেপি দারেকরের সামনে মঙ্গলবার হাজিরা দেন বিধি। তিনি জানান, শিনা বরা হত্যাকাণ্ড যখন সামনে আসে, সেই সময় নাবালিকা ছিলেন তিনি। মায়ের গ্রেফতারি থেকে আর যা যা ঘটছিল, তাতে মানসিক ভাবে ঠিক ছিলেন না তিনি। সেই অবস্থাতেই তাঁকে ডেকে পাঠায় মুম্বই পুলিস।
বিধি মুখার্জি প্রাক্তন মিডিয়া এক্সিকিউটিভ ইন্দ্রাণী মুখার্জি এবং তার প্রাক্তন স্বামী সঞ্জীব খান্নার মেয়ে, এক দশক পুরনো চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের মামলায় অভিযুক্ত। শিনা বোরা ইন্দ্রাণী মুখার্জিরও মেয়ে ছিলেন।
বিধি দাবি করেন যে, তার মা নিজেকে রক্ষা করার জন্য কোনও টাকা পাননি। এককথায় কপর্দকশুন্য হয়ে কেস লড়তে যান। কারণ মিডিয়া টাইকুন পিটার মুখার্জির দুই ছেলে রাহুল ও রবিন, ইন্দ্রানী মুখার্জির কোটি কোটি টাকার পৈতৃক গয়না এবং ৭ কোটি টাকা নগদ তার অ্যাকাউন্ট থেকে চুরি করে নিয়েছে।
সাক্ষী বলেন, এই কারণে তারা, জামিনে থাকা ইন্দ্রাণী মুখার্জিকে এই মামলায় মিথ্যেভাবে জড়ানোর স্পষ্ট উদ্দেশ্য ছিল।
হত্যার ঘটনা এবং এই ঘটনা সামনে আসার সময় বিধি নাবালিকা থাকায় তিনি দাবি করেন যে, তাঁর মায়ের গ্রেফতারের পর তিনি প্রচণ্ড মানসিক আঘাতের মধ্যে ছিলেন এবং এখনও সেই মানসিক ক্ষত বহন করছেন।
বিধি মুখার্জি স্বীকার করেন যে, তাকে প্রথমে মুম্বই পুলিস, যারা প্রাথমিকভাবে মামলাটি তদন্ত করেছিল, এবং তারপর সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছিল। তিনি আদালতকে জানান যে, তদন্তকারী সংস্থা তাকে প্রশ্ন করেছিল এবং তিনি সেগুলোর উত্তর দিয়েছিলেন।
তবে, তিনি কেন্দ্রীয় সংস্থা বা পুলিসের কাছে কোনও জবানবন্দি দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন।
সাক্ষী দাবি করেন যে, সিবিআইয়ের অফিসে তাকে ইমেলের কপি (শিনা বোরার সঙ্গে তাঁর কথিত কথোপকথনের) এবং ফাঁকা পৃষ্ঠাসহ একাধিক নথিতে স্বাক্ষর করানো হয়েছিল। আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার সময় যখন সিবিআই চার্জশিটের অংশ থাকা বিবৃতিটি বিধি মুখার্জিকে দেখানো হয়, তখন তিনি স্পষ্টভাবে বলেন যে 'এটি আমার বা আমার নির্দেশে কখনও রেকর্ড করা হয়নি'।
ডিফেন্সের আইনজীবী রঞ্জিত সাঙ্গলের একটি প্রশ্নের জবাবে সাক্ষী বলেন, ''সুতরাং, চার্জশিটে যুক্ত করা বিবৃতিটি 'জাল ও মনগড়া' বলা সঠিক''।
বিধি মুখার্জি যুক্তি দেন যে, যদি তার নামে এমন জাল বিবৃতি রেকর্ড করা হয়ে থাকে তবে এর পেছনে "হয়তো কোনও অসৎ উদ্দেশ্য বা দুরভিসন্ধি ছিল"। তিনি বলেন যে, কেউ তার বিবৃতি জাল ও মনগড়া করে তার জন্মদাতা বাবা-মা, ইন্দ্রাণী মুখার্জি এবং সঞ্জীব খান্নাকে এই মামলায় মিথ্যাভাবে জড়ানোর চেষ্টা করেছে।
সাক্ষী এমনও বলেন যে, শিনা বোরা নিজেকে তার কাছে ইন্দ্রাণী মুখার্জির 'বোন' হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে শিনা এবং ইন্দ্রাণী অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং পিটার মুখার্জির ছেলে রাহুল যখন থেকে তাদের ওরলি ফ্ল্যাটে আসতে শুরু করে, তখন থেকেই তাদের পরিবারে বিরোধ শুরু হয়।
বিধি মুখার্জির মতে, পরিস্থিতি তখন খারাপ হয় যখন তারা জানতে পারে যে রাহুল মাদকাসক্ত এবং শিনাও এই নেশায় জড়িয়ে পড়েছিল। তিনি শেষবার শিনাকে ২০১১ সালে গোয়ায় একটি পারিবারিক বিয়েতে দেখেছিলেন, কিন্তু ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইমেলের মাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল।
মামলার পক্ষের বক্তব্য হল, ২০১২ সালের এপ্রিলে শিনা বোরাকে (২৪) তার মা ইন্দ্রাণী মুখার্জি, তৎকালীন ড্রাইভার শ্যামভার রায় (যিনি পরে মামলার রাজসাক্ষী হন) এবং সঞ্জীব খান্না একটি গাড়িতে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। তার দেহ পুড়িয়ে পার্শ্ববর্তী রায়গড় জেলার একটি জঙ্গলে ফেলে দেওয়া হয়।
২০১৫ সালে অন্য একটি অস্ত্র মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর শ্যামভার রায় এই অপরাধ সম্পর্কে মুখ খুললে হত্যাকাণ্ডটি প্রকাশ্যে আসে। এই ঘটনা প্রকাশের পর পুলিস ইন্দ্রাণী মুখার্জি এবং তার প্রাক্তন স্বামী সঞ্জীব খান্না ও পিটারকে গ্রেফতার করে।
মামলার পক্ষ অভিযোগ করেছে যে, হত্যার পর ইন্দ্রাণী মুখার্জি শিনা বোরার অ্যাকাউন্ট থেকে ইমেল পাঠাতেন, যাতে বোঝানো যায় যে তিনি এখনও বেঁচে আছে।
সাক্ষী তার মায়ের ২০১৫ সালের আগস্টে গ্রেফতারের পর পিটার মুখার্জির পরিবারের জঘন্য ছবি তুলে ধরেন। বিধি মুখার্জি দাবি করেন যে, তাদের বাড়িতে আসা আত্মীয়রা ইন্দ্রাণীর জিনিসপত্র, যার মধ্যে পারফিউম এবং ব্যাগও ছিল, সেগুলোর দখল নিয়ে মারামারি করত।
অভিযোগ করেন যে রবিন মুখার্জি তাকে ভয় দেখিয়েছিলেন, তাকে মুখার্জি "গোষ্ঠী" এবং তার মায়ের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে বাধ্য করেছিলেন, এবং হুমকি দিয়েছিলেন যে যদি তিনি তাদের পক্ষ না নেন তবে তাকে পরিবার থেকে বঞ্চিত করা হবে।
সাক্ষী আরও বলেন যে, তার মায়ের গ্রেফতারে পর তার কোটি কোটি টাকার পৈতৃক গয়না এবং ৭ কোটির বেশি ব্যাঙ্ক সেভিংস 'চুরি' করা হয়েছিল। বিধি এমনও দাবি করেন যে, 'চুরি করা' গয়না রাখার জন্য রাহুল এবং রবিন মুখার্জির নামে একটি নতুন ব্যাঙ্ক লকার খোলা হয়েছিল।
সাক্ষী জবানবন্দি দেন যে, পিটার মুখার্জির গ্রেপ্তারের আগেই টাকা এবং গয়না চুরি হয়েছিল এবং পিটার মুখার্জির সম্মতি ছাড়া (তার ছেলেরা) রাহুল এবং রবিন এটা করতে পারত না। বিধি দাবি করেন যে রাহুল মুখার্জির কোনও চাকরি ছিল না এবং রবিনের আর্থিক অবস্থাও ভালো ছিল না, এবং বেঁচে থাকার জন্য তাদের মরিয়াভাবে টাকার প্রয়োজন ছিল। এছাড়াও, ইন্দ্রাণী মুখার্জি জেল থেকে বেরিয়ে এলে তাদের 'চুরি করা টাকা' এবং 'পৈতৃক গয়না' ফেরত দিতে বাধ্য হতে হত।
অতএব, রাহুল এবং রবিনের, ইন্দ্রাণীকে 'মিথ্যা অপরাধে জড়ানোর' একটি স্পষ্ট উদ্দেশ্য ছিল- এমনই মনে করেন বিধি মুখার্জি।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)