)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাস বিশ্ব ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হতে চলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে যে অস্থিরতা গত কয়েক বছর ধরে ধিকিধিকি জ্বলছিল,তা এখন এক ভয়াবহ দাবানলে পরিণত হয়েছে। ইরানের সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপ কেবল ইসরায়েল নয়, বরং গোটা অঞ্চলের সাতটি দেশকে যুদ্ধের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, ইরানের এই বহুমুখী আক্রমণ মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দেওয়ার পাশাপাশি এক বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিয়েছে।
সাতটি দেশে ইরানের নিশান: হামলার নৃশংসতা
বরং একযোগে মধ্যপ্রাচ্যের ৭টি গুরুত্বপূর্ণ দেশে তাদের সামরিক শক্তি প্রদর্শন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে:
১. ইসরায়েল: চিরশত্রু ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটি এবং তেল আবিবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরান শত শত ড্রোন ও ব্যালিস্টিক মিসাইল ছুড়েছে।
২. সৌদি আরব: আঞ্চলিক আধিপত্যের লড়াইয়ে ইরান সৌদি আরবের তেল শোধনাগার এবং কৌশলগত অবস্থানগুলোতে আঘাত হেনেছে।
৩. বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE): আব্রাহাম অ্যাকর্ডের মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করায় এই দেশগুলোকেও ইরানের রোষানলে পড়তে হয়েছে।
৪. ইরাক ও সিরিয়া: এই দুই দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং ইসরায়েল-ঘেঁষা গোষ্ঠীগুলোর ওপর ইরান সরাসরি হামলা চালিয়েছে।
৫. জর্ডান: আকাশসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগে জর্ডানের ওপরও নেমে এসেছে আক্রমণের ছায়া।
কেন এই সর্বাত্মক আক্রমণ? নেপথ্যের কারণ
ইরানের এই আগ্রাসনের পেছনে বেশ কিছু জোরালো কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন সমর বিশেষজ্ঞরা:
ইসরায়েলি আগ্রাসনের জবাব: সম্প্রতি ইসরায়েলি বিমান বাহিনী ইরানের অভ্যন্তরে পরমাণু কেন্দ্র এবং উচ্চপদস্থ সেনাকর্তাদের লক্ষ্য করে যে হামলা চালিয়েছিল, তারই ‘প্রতিশোধ’ নিতে এই পাল্টা হামলা।
আমেরিকার উপস্থিতি চ্যালেঞ্জ করা: মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতি এবং তাদের রাডার ব্যবস্থাকে অকেজো করাই ছিল ইরানের অন্যতম লক্ষ্য।
আঞ্চলিক শক্তির প্রদর্শন: সৌদি আরব এবং বাহরাইনের মতো সুন্নি প্রধান দেশগুলোকে বার্তা দেওয়া যে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা যে কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চুরমার করতে সক্ষম।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের পাল্টা হুঙ্কার: যুদ্ধের ময়দান যখন বিশ্বমঞ্চ
ইরানের এই হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জরুরি বৈঠক করেছেন। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, 'আমরা আমাদের মিত্রদের রক্ষায় সবটুকু শক্তি নিয়োগ করব।'
ইসরায়েল ইতিমধ্যেই 'অপারেশন আয়রন শিল্ড' শুরু করেছে, যার মাধ্যমে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলোকে মাঝ আকাশেই ধ্বংস করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, পেন্টাগন পারস্য উপসাগরে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করেছে। এর ফলে সংঘাত কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আমেরিকা বনাম ইরান এবং তার প্রক্সি যোদ্ধাদের (হিজবুল্লাহ, হুথি) এক মহাযুদ্ধে রূপ নিচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে এর প্রভাব: হাহাকার সাধারণ মানুষের
এই যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের পকেটে। ইরানের হামলার খবর ছড়ানোর পর থেকেই:
অশোধিত তেলের দাম: আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সোনা ও রূপার রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি: শেয়ার বাজারে ধস নামায় বিনিয়োগকারীরা সোনা ও রূপার দিকে ঝুঁকছেন, যার ফলে ভারতের বাজারে সোনার দাম প্রতি ১০ গ্রামে ১,৬০,০০০ টাকা ছাড়িয়ে রেকর্ড গড়েছে।
জাপান ও দক্ষিণ এশিয়ার শেয়ার বাজারে ধস: এশিয়ার বড় বড় স্টক মার্কেটগুলো ৫%-৭% পর্যন্ত পড়ে গিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ: শান্তি নাকি ধ্বংস?
বাহরাইন থেকে সৌদি আরব—গোটা মধ্যপ্রাচ্য এখন কার্যত একটি বারুদের স্তূপ। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি রাষ্ট্রসংঘ এবং রাশিয়া-চীনের মতো বড় শক্তিগুলো অবিলম্বে মধ্যস্থতা না করে, তবে এই সংঘাত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দেয় বা আমেরিকা সরাসরি তেহরানে আক্রমণ চালায়, তবে তার ফলাফল হবে বিপর্যয়কর।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তারিখটি বিশ্ববাসী আতঙ্ক ও উদ্বেগের সাথে প্রত্যক্ষ করছে। ইরানের এই ৭ দেশে হামলা কেবল সামরিক শক্তির আস্ফালন নয়, বরং বিশ্ব ব্যবস্থার এক আমূল পরিবর্তনের সংকেত। ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো এই পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে, কারণ জ্বালানি সংকট এবং অর্থনৈতিক মন্দার কালো মেঘ ইতিমধ্যেই ঘনিয়ে এসেছে। শান্তি আলোচনা না শুরু হলে, মধ্যপ্রাচ্যের এই আগুন নেভানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।