জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: নারকীয় হত্যাকাণ্ড! তেলেঙ্গানার হনুমকোন্ডা জেলায় প্রায় ৩০০টি বেওয়ারিশ কুকুরকে গণহারে হত্যার অভিযোগে দুই গ্রাম প্রধানসহ (সরপঞ্চ) ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পুলিস।
Add Zee News as a Preferred Source
একটি বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার (NGO) অভিযোগের ভিত্তিতে শায়মপেট পুলিস এই মামলা দায়ের করে। অভিযোগ অনুযায়ী, হনুমকোন্ডা জেলার শায়মপেট এবং আরেপল্লী গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় সুপরিকল্পিতভাবে বিপুল সংখ্যক বেওয়ারিশ কুকুরকে হত্যা করা হয়েছে। গত ৬ জানুয়ারি থেকে ৮ জানুয়ারির মধ্যে তিন দিন ধরে এই নৃশংস কাজ করা হয়।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, কুকুরগুলোকে মেরে ফেলার জন্য বিশেষ করে দু’জন ব্যক্তিকে ভাড়া করা হয়েছিল। তারা কুকুরগুলোকে প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেয়, যার ফলে তাদের মৃত্যু ঘটে। পরে মৃত কুকুরগুলোকে গ্রামের উপকণ্ঠে নির্জন স্থানে ফেলে আসা হয়। প্রায় ৩০০টি কুকুরের এই মৃত্যু স্থানীয় এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
কেন এই হত্যাকাণ্ড?
অভিযুক্তরা এবং গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তিরা এনজিও-র অভিযোগের প্রতিবাদ করেছেন। তাদের দাবি, এই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল জনগণের তীব্র চাপের মুখে। গ্রামে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে আসন্ন সরপঞ্চ নির্বাচনের প্রাক্কালে এটি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। নির্বাচনী প্রচারের সময় গ্রামবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং জনরোষ কমাতে এই চরম পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
আইনি ব্যবস্থা ও অভিযুক্ত: পুলিসের কাছে অভিযোগ আসার পর, 'প্রিভেনশন অফ ক্রুয়েলটি টু অ্যানিমেলস অ্যাক্ট, ১৯৬০' (প্রাণী নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ আইন) অনুযায়ী মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এই মামলায় যে ৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা হলেন:
শায়মপেট ও আরেপল্লী গ্রাম পঞ্চায়েতের দুই মহিলা সরপঞ্চ।
উক্ত দুই সরপঞ্চের স্বামী।
একজন ডেপুটি সরপঞ্চ।
দু’জন গ্রাম সচিব (Village Secretaries)।
দুইজন দিনমজুর (যাঁরা সরাসরি কুকুর নিধনের কাজ করেছেন)।
এনজিও-র পক্ষ থেকে সরকারকে অনুরোধ জানানো হয়েছে যেন ভবিষ্যতে এই ধরণের সমস্যা সমাধানে কোনো অমানবিক পথ বেছে না নেওয়া হয়। তারা হত্যার পরিবর্তে এনিম্যাল বার্থ কন্ট্রোল (ABC) প্রোগ্রাম, বন্ধ্যাকরণ (Sterilisation) এবং টিকাকরণের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক ও জাতীয় প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব:
এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এল যখন পুরো ভারত জুড়েই বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে সাধারণ মানুষের আক্রান্ত হওয়া বা মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে রয়েছে। গত ৯ জানুয়ারি টানা তৃতীয় দিনের মতো সুপ্রিম কোর্ট কুকুর কামড়ানোর মামলাগুলোর শুনানি করেছে।
শুনানি চলাকালীন আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে যে, অনলাইনে এমন অনেক ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে কুকুর শিশু এবং বয়স্ক মানুষদের আক্রমণ করছে। তবে আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা এই ইস্যুটিকে 'প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা বনাম মানুষের নিরাপত্তা'—এই দুই পক্ষের লড়াই হিসেবে দেখতে চায় না। বরং একটি সুশৃঙ্খল সমাধানের দিকে এগোতে চায়।
উল্লেখ্য যে, গত বছর সুপ্রিম কোর্ট দিল্লির বেওয়ারিশ কুকুরগুলোকে একটি নির্দিষ্ট ঘেরা এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল, যাতে জননিরাপত্তা বজায় থাকে এবং জলাতঙ্ক (Rabies) প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।
তেলেঙ্গানার এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে ভারতের শহর এবং গ্রামগুলোতে বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণ একটি বড় সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। একদিকে অবলা প্রাণীদের রক্ষা এবং অন্যদিকে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আইন নিজের হাতে নিয়ে প্রাণীদের হত্যা করা যে দণ্ডনীয় অপরাধ, পুলিশি পদক্ষেপের মাধ্যমে সেই বার্তাই দেওয়া হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, উচ্চ আদালত এবং সরকার এই দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা সমাধানে কী ধরণের বিজ্ঞানসম্মত পথ বের করে।