)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ভূমিকা পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতির সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে ‘সবুজ ফাইল’ বিতর্ক এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) এবং রাজ্য সরকারের মধ্যে সংঘাত নতুন নয়, তবে সরাসরি কোনো তল্লাশি অভিযানে মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি এবং সেখান থেকে ফাইল নিয়ে বেরিয়ে আসার ঘটনা নজিরবিহীন। গত ৮ জানুয়ারি ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক (I-PAC)-এর কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি ও অফিসে ইডির অভিযানের সময় এই নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ইডির পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে ‘তদন্তে বাধা’ এবং ‘নথি চুরি’ হিসেবে চিহ্নিত করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়া হয়েছিল। এবার সেই অভিযোগের পাহাড় উড়িয়ে দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে হলফনামা পেশ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্য সরকার।
ঘটনার প্রেক্ষাপট:
৮ জানুয়ারির সেই নাটকীয় দিন বেআইনি কয়লা পাচার মামলার তদন্তের জাল গুটিয়ে আনতে গত ৮ জানুয়ারি কলকাতায় জোড়া অভিযান চালায় ইডি। কেন্দ্রীয় সংস্থার দাবি অনুযায়ী, কয়লা মাফিয়া অনুপ মাজির চক্রের মাধ্যমে পাচার হওয়া বিপুল টাকা হাওয়ালার মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে এবং সেই সূত্রের একটি অংশ আইপ্যাকের মাধ্যমে প্রতীক জৈনের কাছে পৌঁছেছে। প্রায় ১০ কোটি টাকার এই আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ খুঁজতেই ইডির একটি দল সল্টলেকের সেক্টর ফাইভের আইপ্যাক অফিসে এবং অন্য একটি দল লাউডন স্ট্রিটে প্রতীক জৈনের বাড়িতে হানা দেয়।
আইপ্যাকের ভূমিকা:
আইপ্যাক যেহেতু রাজ্য সরকারের পরামর্শদাতা সংস্থা হিসেবে কাজ করে, তাই এই অভিযান শুরু হতেই রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছয়। খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে সশরীরে উপস্থিত হন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ইডির অভিযোগ ছিল, মুখ্যমন্ত্রী কেবল সেখানে উপস্থিতই হননি, বরং তদন্তে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন। লাউডন স্ট্রিটে প্রতীক জৈনের বাড়ি থেকে তাঁকে হাতে একটি সবুজ রঙের ফাইল নিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। কেন্দ্রীয় সংস্থার দাবি, ওই সময় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে থাকা তৎকালীন রাজ্য পুলিসের ডিজি রাজীব কুমার, কলকাতা পুলিসের কমিশনার মনোজ কুমার ভার্মা এবং দক্ষিণ কলকাতার ডেপুটি কমিশনার প্রিয়ব্রত রায় তদন্তে বাধা দিতে সহযোগিতা করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল প্রমাণ ও নথি সরিয়ে নিয়ে যান।
ইডির অভিযোগ ও সুপ্রিম কোর্টের পদক্ষেপ ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে ইডি সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করে। ইডির পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতে সওয়াল করেন যে, যেখানে তল্লাশি চলছিল সেখান থেকে মুখ্যমন্ত্রী নিজে এবং পুলিশের শীর্ষকর্তারা প্রামাণ্য নথি নিয়ে চলে গিয়েছেন, যা আইনত ‘চুরি’র সমান অপরাধ। তাঁর মতে, এটি তদন্ত প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ নষ্ট করার একটি পরিকল্পিত চেষ্টা। গত ১৫ জানুয়ারি শীর্ষ আদালত এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সব পক্ষকে নোটিস জারি করে এবং দুই সপ্তাহের মধ্যে হলফনামা পেশ করার নির্দেশ দেয়।
সবুজ ফাইলে আসলে কী ছিল?
মুখ্যমন্ত্রীর হলফনামা মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া পাল্টা হলফনামায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইডির সমস্ত অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। তাঁর হলফনামার মূল বিষয়গুলি নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হল:
১. দলীয় নথির দাবি: মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, ইডির বাজেয়াপ্ত করা কোনো নথি তিনি নেননি। যে সবুজ ফাইলের কথা বলা হচ্ছে, তাতে কেবল তৃণমূল কংগ্রেসের নিজস্ব দলীয় কাজ সংক্রান্ত কিছু সংবেদনশীল এবং অত্যন্ত গোপন রাজনৈতিক নথিপত্র ও কিছু ইলেকট্রনিক গেজেটস ছিল। এগুলি তদন্তের বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
২. ইডির অনুমতি গ্রহণ: হলফনামায় একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দাবি করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ওই ফাইল বা নথিগুলি নিয়ে আসার সময় সেখানে উপস্থিত ইডি আধিকারিকদের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, বেআইনিভাবে বা ছিনতাই করে কিছু আনা হয়নি। ফলে ইডির ‘চুরি’র অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
৩. তদন্তে বাধার অভিযোগ নাকচ: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তিনি অত্যন্ত অল্প সময়ের জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। কোনোভাবেই তদন্তকারী আধিকারিকদের কাজে বাধা দেওয়া হয়নি। বরং তদন্তের নামে রাজনৈতিক দলের গোপন তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল ইডি, যা রুখতেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।
৪. বেআইনি অভিযানের অভিযোগ: হলফনামায় অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, ইডির এই অভিযান ছিল পুরোপুরি বেআইনি। ইডি কোনো বৈধ ‘সার্চ ওয়ারেন্ট’ দেখাতে পারেনি এবং কয়লা পাচারের টাকার সঙ্গে প্রতীক জৈনের যোগসূত্র নিয়ে কোনো আইনি প্রমাণ ছাড়াই এই তল্লাশি চালানো হয়েছে।
রাজ্য সরকারের কড়া অবস্থান রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও এই মামলার আইনি ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। হলফনামায় বলা হয়েছে:
হাইকোর্টকে অবজ্ঞা: এই সংক্রান্ত একটি মামলা ইতিমধ্যেই কলকাতা হাইকোর্টে বিচারাধীন রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী হাইকোর্টে মামলা চলাকালীন কেন্দ্রীয় সংস্থা সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে আসার কোনো মৌলিক অধিকার রাখে না। ইডি কেন যথাযথ প্রক্রিয়া না মেনে শীর্ষ আদালতে এল, সেই প্রশ্ন তুলেছে রাজ্য।
রাজনৈতিক প্যাটার্ন: রাজ্য সরকারের দাবি, ভোটের আগে বা রাজনৈতিক স্বার্থে বিরোধী শাসিত রাজ্যে হানা দেওয়া এখন কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর একটি নিয়মিত ‘প্যাটার্নে’ পরিণত হয়েছে। আইপ্যাককে কোনো আগাম নোটিস না দিয়েই এই অভিযান চালানো আইনের লঙ্ঘন।
আইনি লড়াই ও বর্তমান পরিস্থিতি
মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার শুনানি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রাজ্য সরকার গত রবিবার ও সোমবার তাদের হলফনামা পেশ করায়, তার উত্তর দেওয়ার জন্য ইডির পক্ষ থেকে সময়ের আবেদন জানানো হয়। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানান যে, রাজ্যের দেওয়া হলফনামার যুক্তিগুলি খণ্ডন করে পালটা জবাব দিতে তাঁদের অন্তত সাত দিন সময় প্রয়োজন।
বিচারপতিরা ইডির এই আবেদন মঞ্জুর করেন এবং শুনানি পিছিয়ে দেন। আগামী মঙ্গলবার, অর্থাৎ ১০ ফেব্রুয়ারি এই মামলার পরবর্তী শুনানি হওয়ার কথা। এই সময়ের মধ্যে ইডি রাজ্য সরকারের দেওয়া ‘অনুমতি নিয়ে নথি আনা’র দাবির বিপরীতে তাদের তথ্য ও যুক্তি সাজাবে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব এই আইপিএসি-ইডি কাণ্ড কেবল একটি আইনি লড়াই নয়, এটি কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের অবনতির এক জ্বলন্ত উদাহরণ। তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, আইপ্যাকের মাধ্যমে তাদের নির্বাচনী রণকৌশল জেনে নিতে চাইছে বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার। অন্যদিকে, বিজেপি ও ইডির দাবি, দুর্নীতির টাকা উদ্ধার করতেই এই তল্লাশি। মুখ্যমন্ত্রীর আইনজীবী কপিল সিব্বল এবং অভিষেক মনু সিংভি শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তদন্তকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সবুজ ফাইলটি এখন রাজ্য রাজনীতির এক রহস্যময় প্রতীকে পরিণত হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর হলফনামা অনুযায়ী সেটি যদি নিছকই ‘পার্টি নথি’ হয়, তবে ইডি কেন তাকে ‘তদন্তের নথি’ বলে দাবি করছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই যাচ্ছে। আগামী মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে যখন ইডি তাদের পালটা জবাব দেবে, তখন বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে। আইনজ্ঞদের মতে, যদি ইডি প্রমাণ করতে না পারে যে মুখ্যমন্ত্রী তাদের ‘অনুমতি ছাড়া’ এবং ‘তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ নথি’ সরিয়েছিলেন, তবে এই মামলা ইডির জন্য ব্যুমেরাং হতে পারে। অন্যদিকে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা নজিরবিহীন আইনি ও সাংবিধানিক সংকটের জন্ম দেবে। আপাতত সবার নজর আগামী ১০ ফেব্রুয়ারির দিকে, যেদিন দিল্লির সর্বোচ্চ আদালতে নির্ধারিত হবে এই হাই-ভোল্টেজ মামলার ভবিষ্যৎ।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)