West Bengal Assembly Election 2026: আদালত সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ লক্ষ ৪ হাজার মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। কিছু কারিগরি সমস্যার কারণে মাত্র ২ হাজার মামলা এখনও বিচারাধীন।

রাজীব চক্রবর্তী ও অর্ণবাংশু নিয়োগী: বিধানসভা নির্বাচনে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া সংক্রান্ত ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিপোর্ট’ (SIR) মামলার শুনানি সোমবার সুপ্রিম কোর্টে হল। একদিকে তৃণমূল সাংসদ তথা বর্ষীয়ান আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জোরাল সওয়াল, অন্যদিকে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের কঠোর আইনি পর্যবেক্ষণ-- সব মিলিয়ে সোমবার দিনভর আলোচনার কেন্দ্রে ছিল রাজ্যের প্রায় ৩৪ লক্ষ ভোটারের ভবিষ্যৎ। তবে দিনের শেষে ট্রাইব্যুনালে আবেদনকারীদের ভোটাধিকার নিয়ে কোনও সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দেয়নি শীর্ষ আদালত। সুপ্রিম কোর্ট আজ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে, তাঁদের এই মুহূর্তে সরাসরি ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে আদালত কোনও হস্তক্ষেপ করবে না।
ভোটাধিকার ও ভোটার তালিকা ‘ফ্রিজ’ সংক্রান্ত জটিলতা
বর্তমানে রাজ্যে দু’দফায় বিধানসভা ভোট হওয়ার কথা। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন অর্থাৎ প্রথম দফার জন্য ৬ এপ্রিল এবং দ্বিতীয় দফার জন্য ৯ এপ্রিল রাত ১২টার সময় ভোটার তালিকা ‘ফ্রিজ’ বা চূড়ান্ত করে দেওয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, এই তালিকার বাইরে থাকা কারোর পক্ষে ভোট দেওয়া সম্ভব নয়।
আদালতে আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সওয়াল করেন যে, প্রায় ৩৪ লক্ষ মানুষ বৈধ ভোটার হওয়া সত্ত্বেও তালিকায় স্থান পাননি। তিনি দাবি জানান, সুপ্রিম কোর্ট যেন তার বিশেষ ক্ষমতা (১৪২ নম্বর ধারা) প্রয়োগ করে এই বিশাল সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করে। এর জবাবে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “যাঁদের নাম তালিকায় নেই, তাঁদের এখন ভোটদানের সুযোগ দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। যদি আমরা এটার অনুমতি দিই, তবে যাঁদের নাম তালিকায় রয়েছে, তাঁদের ভোটাধিকারও স্থগিত করতে হবে।”
মূল পয়েন্টসমূহ একনজরে:
ভোটাধিকার: ট্রাইব্যুনালে আবেদনকারীদের ভোটদানের অনুমতি দিতে অস্বীকার সুপ্রিম কোর্টের।
নিরাপত্তা: ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিচারকদের কড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ।
পরিসংখ্যান: ৩৪ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে; ৬০ লক্ষ ৪ হাজার মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে।
পর্যবেক্ষণ: ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ শুধু পশ্চিমবঙ্গে কেন—প্রশ্ন বিচারপতি বাগচীর।
সোমবারের সিদ্ধান্ত: সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট প্রকাশের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে বেঞ্চ।
ট্রাইব্যুনাল ও ‘ব্ল্যাকমেল’ বিতর্ক
শুনানির শুরুতেই এক আবেদনকারীর আইনজীবী অভিযোগ করেন যে, ট্রাইব্যুনালে আবেদন শোনা হচ্ছে না। এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে প্রধান বিচারপতি কান্ত কড়া ভাষায় জানান, কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি তাঁকে নিশ্চিত করেছেন যে সোমবার সকাল থেকেই ট্রাইব্যুনালে শুনানি শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, 'ট্রাইব্যুনালকে এভাবে ব্ল্যাকমেল করা যাবে না। যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ট্রাইব্যুনালই নেবে।'
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ লক্ষ ৪ হাজার মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। কিছু কারিগরি সমস্যার কারণে মাত্র ২ হাজার মামলা এখনও বিচারাধীন। তবে ট্রাইব্যুনালে নতুন করে যে আবেদনগুলি জমা পড়েছে, তার সংখ্যা প্রায় ৩৪ লক্ষ। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী জানান, ইতিমধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ আবেদন খারিজ করা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রেখে আদালত জানিয়েছে, যারা ‘পাশ’ করবেন তাঁদের বিষয়টি পরবর্তী ধাপে বিবেচনা করা হবে, তবে এখনই ভোটের সুযোগ মিলছে না।
বিচারকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষাকবচ
এদিন শুনানিতে ‘মালদহকাণ্ড’ এবং বিচারকদের ওপর সম্ভাব্য চাপের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপিল ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের যথাযথ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দিতে হবে। প্রধান বিচারপতি সাফ জানিয়ে দেন, “সুপ্রিম কোর্টের অনুমতি ছাড়া কোনওভাবেই এই নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা যাবে না।” বিচারকদের ওপর যাতে বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বেঞ্চ।
সাংবিধানিক বনাম আবেগ
শুনানি চলাকালীন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী নির্বাচন কমিশনের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, 'যে দেশে জন্ম, সেখানে ভোট দেওয়ার অধিকার শুধু সাংবিধানিক নয়, এটি আবেগের বিষয়ও বটে।' তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন যে, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা তথ্যগত অসংগতির মতো বিষয়টি কেন শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, অন্য কোনও রাজ্যে কেন নয়?
নির্বাচন বাতিলের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, যতক্ষণ না বিপুল সংখ্যক ভোটার বাদ পড়ছেন বা ভোটের ফলের ওপর তার বাস্তবিক প্রভাব পড়ছে, ততক্ষণ নির্বাচন বাতিল সম্ভব নয়। যদি জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা বেশি হয়, তবেই বিষয়টি গভীর চিন্তার। তবে প্রধান বিচারপতি এই আলোচনাকে বর্তমানে ‘তাত্ত্বিক’ বলে অভিহিত করেছেন।
সাপ্লিমেন্টারি তালিকার ক্ষীণ আশা
আবেদনকারীদের পক্ষে আইনজীবী শ্যাম দিবান সওয়াল করেন যে, ট্রাইব্যুনাল যদি আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে কিছু মামলার নিষ্পত্তি করে, তবে একটি ‘সাপ্লিমেন্টারি’ বা অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা উচিত। প্রধান বিচারপতি এই প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে জানান, “আমরা বিষয়টি দেখছি।” আদালত কক্ষেই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে অন্য এক আইনজীবীর বচসা বেঁধে যায় এই ভোটাধিকারের অধিকার নিয়ে।
আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া
মামলাকারীদের পক্ষে আইনজীবী অরিন্দম দাস কিছুটা আশাবাদী সুর শুনিয়েছেন। তিনি মনে করছেন, শেষ মুহূর্তে হলেও সংবিধানের ১৩২ নম্বর ধারা প্রয়োগ করে সুপ্রিম কোর্ট এই ৩৪ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ভাবতে পারে। অন্যদিকে, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বারংবার আবেদন জানান যে, বাংলার মানুষ শীর্ষ আদালতের দিকে তাকিয়ে রয়েছে এবং আদালতের উচিত তার ‘সুপ্রিম পাওয়ার’ ব্যবহার করা।
সোমবারের দীর্ঘ শুনানির পর এটুকু স্পষ্ট যে, আইনি মারপ্যাঁচে পশ্চিমবঙ্গের এক বিশাল অংশের ভোটারের ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। ট্রাইব্যুনাল দ্রুত শুনানি শেষ করলেও ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি বাধা (তালিকা ফ্রিজ হওয়া) কাটবে কি না, তা নিয়ে কোনও চূড়ান্ত আশ্বাস মেলেনি। ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা লক্ষ লক্ষ মানুষের ২০২৬ সালের নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা এই মুহূর্তে প্রায় নেই বললেই চলে। আদালত বিষয়টি ঝুলেই রেখেছে এবং পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে।
সোমবারের শুনানি শেষে বোঝা যাচ্ছে যে, ট্রাইব্যুনালে ‘পাস’ করলেও এবার তাঁদের বুথমুখী হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। আপাতত পশ্চিমবঙ্গের নজর আগামী কয়েক দিনের ট্রাইব্যুনাল প্রক্রিয়া এবং সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী নির্দেশের দিকে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)