LPG Price Hike due to Iran Israel War EXPLAINER: যুদ্ধের ছায়া-- ভারতের ৩৪ কোটি পরিবারের রান্নাঘরে এখন জমছে অন্ধকার, আর জ্বলবে না গ্যাস?

Strait of Hormuz: হরমুজ় প্রণালী বন্ধ, কাতারের গ্যাস উৎপাদন স্তব্ধ— ভারতের ৩৪ কোটি পরিবারের রান্নাঘরে এখন আতঙ্কের কাউন্টডাউন...

নবনীতা সরকার | Updated By: Mar 5, 2026, 06:09 PM IST
LPG Price Hike due to Iran Israel War EXPLAINER: যুদ্ধের ছায়া-- ভারতের ৩৪ কোটি পরিবারের রান্নাঘরে এখন জমছে অন্ধকার, আর জ্বলবে না গ্যাস?

জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবার সরাসরি ঢুকে পড়েছে ভারতের রান্নাঘরে। পার্সিয়ান গালফে আগুন জ্বলছে — আর সেই আগুনের তাপ এসে পৌঁছে যাচ্ছে দিল্লি থেকে দুর্গাপুর, মুম্বই থেকে মাদুরাইয়ের সাধারণ মানুষের কাছে। বিষয়টা কেবল তেলের দাম বাড়া নয়, বিষয়টা হলো — গ্যাস আসবে কিনা।

Add Zee News as a Preferred Source

১. যুদ্ধের আগুন কোথায় লাগল, কী ভাবে পৌঁছাল ভারত পর্যন্ত

মার্চ ২০২৬-এর শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। ইরান পাল্টা জবাব দেয় মিসাইল ও ড্রোন দিয়ে — এবং লক্ষ্য হয় সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান এবং সৌদি আরব। ইরান স্ট্রেইট অব হরমুজ় দিয়ে জাহাজ চলাচলে সতর্কতা জারি করে, বিমা সংস্থাগুলো কভারেজ প্রত্যাহার করে নেয় — কার্যত ট্যাংকার চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

এই হরমুজ় প্রণালী কতটা গুরুত্বপূর্ণ? বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অশোধিত তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং LNG-র প্রায় ২০ শতাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে যায়। ভারতের জন্য এটি শুধু একটি শিপিং রুট নয় — এটি জীবনরেখা।

২. ভারত কতটা নির্ভরশীল? সংখ্যায় ভয়াবহ চিত্র

সমস্যার গভীরতা বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে ভারত কতটা মধ্যপ্রাচ্যমুখী তার শক্তি-চাহিদায়:

LPG (রান্নার গ্যাস) :

ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম LPG ক্রেতা এবং তার মোট LPG সরবরাহের ৯০ শতাংশেরও বেশি আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। অর্থাৎ দেশের কোটি কোটি রান্নার সিলিন্ডার কার্যত মধ্যপ্রাচ্যের মুখাপেক্ষী।

LNG (শিল্প ও পাইপড গ্যাস) :

ফেব্রুয়ারি ২০২৬-তে — উৎপাদন বন্ধের ঠিক আগের মাসে — ভারত মোট ১.৮৬ মিলিয়ন টন LNG আমদানি করেছিল, যার ৪১.২ শতাংশ এসেছিল একমাত্র কাতার থেকে। ২০২৫ সালজুড়ে কাতার ভারতের মোট LNG আমদানির গড়ে ৪৫.৬ শতাংশ যোগান দিয়েছে।

অপরিশোধিত তেল :

জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৫৫ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে হরমুজ় প্রণালী পেরিয়ে আসত।

এই নির্ভরতা দেশকে এখন এক চরম সংকটের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

৩. কাতারের মারাত্মক আঘাত: রাস লাফ্‌ফান ধ্বংস, গ্যাস বন্ধ

সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাতটি এসেছে কাতার থেকে। ইরানের ড্রোন হামলায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় LNG রপ্তানি কেন্দ্র রাস লাফ্‌ফান কমপ্লেক্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

QatarEnergy — বিশ্বের বৃহত্তম LNG রপ্তানিকারক — উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত ক্রেতাদের কাছে ফোর্স মেজিওর ঘোষণা করে।

এর তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে ভারতের সবচেয়ে বড় LNG আমদানিকারক সংস্থার উপর। Petronet LNG Limited ইতিমধ্যেই QatarEnergy-কে ফোর্স মেজিওর নোটিশ দিয়েছে এবং নিজের ডাউনস্ট্রিম ক্রেতাদের — GAIL, Indian Oil Corporation (IOCL), এবং Bharat Petroleum Corporation Ltd (BPCL) — কেও সেই নোটিশ পাঠিয়েছে।

কার্যত ভারতের গ্যাস সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি কড়া আলগা হয়ে পড়েছে।

৪. তিনটি সংকট একসাথে: LPG, LNG এবং ক্রুড

যুদ্ধের এই আঘাত ভারতে তিন স্তরে আঘাত করছে —

ক) LPG সংকট: রান্নাঘরে আঁধার

আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভারতীয় পরিবারগুলো এক তীব্র রান্নার গ্যাস-সংকটের মুখে পড়তে পারে, কারণ যুদ্ধ পার্সিয়ান গালফে LPG-র সরবরাহ আটকে দিয়েছে এবং এটি মুদ্রাস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। মার্চ মাসে যেসব কার্গো আসার কথা ছিল, সেগুলো অবিলম্বে না সরলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠবে।

খ) LNG সংকট: শিল্প ও বিদ্যুৎ সেক্টরে ধাক্কা

LNG সরবরাহ ভারতীয় শিল্পে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। সার কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, CNG স্টেশন এবং পাইপড কুকিং গ্যাস নেটওয়ার্ক — সবকিছুর উপর এর প্রভাব পড়বে।

স্পট মার্কেটে LNG-র দাম এখন প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে ২৫ ডলার — যা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির দরের প্রায় দ্বিগুণ।

গ) ক্রুড সংকট: পেট্রোল-ডিজেলের ভবিষ্যৎ

Brent অশোধিত তেলের বৈশ্বিক বেঞ্চমার্ক ৮০ ডলারের উপর উঠে গেছে, ইরান সংকটের পর থেকে মোটামুটি ১০ শতাংশ বেশি। ভারত ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ক্রুড আমদানিতে খরচ করেছিল ১৩৭ বিলিয়ন ডলার। দাম বাড়লে এই আমদানি বিল আরও ফুলে উঠবে।

৫. সরকার কী বলছে, বাস্তব কী?

ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে দেশ 'যুক্তিসঙ্গতভাবে স্বস্তিদায়ক' পরিস্থিতিতে আছে। কিন্তু সত্যিটা একটু জটিল।

সরকারি দাবি বনাম শিল্প বাস্তবতা:

তেলমন্ত্রী দাবি করেছেন ভারত মোটামুটি ৭৪ দিনের ক্রুড ও জ্বালানি মজুত রাখতে পারে। কিন্তু শিল্পমহলের সূত্র বলছে, আসলে মজুত আছে মাত্র ২০ থেকে ২৫ দিনের।

LNG-র ক্ষেত্রে ভারতের বাফার অনেক পাতলা, কারণ LNG মজুত রাখা অশোধিত তেল মজুতের চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

চিনের সাথে তুলনাটাও উদ্বেগজনক। ICIS-এর এনার্জি ও রিফাইনিং ডিরেক্টর অজয় পারমার বলেছেন, 'চিনের কাছে অন্তত ছয় মাসের ক্রুড মজুত আছে। ভারতের মজুত তুলনামূলকভাবে অনেক কম, তাই ভারত এই পরিস্থিতিতে অনেক বেশি ঝুঁকিতে।'

৬. বিকল্প পথ কোথায়? রাশিয়া, আমেরিকা এবং কূটনীতির ফাঁদ

সংকট মোকাবেলায় ভারতের সামনে কয়েকটি বিকল্প আছে, কিন্তু প্রতিটিতেই জটিলতা আছে।

রাশিয়ার প্রস্তাব:

রাশিয়া জানিয়েছে সে ভারতের সমস্ত শক্তি চাহিদা মেটাতে প্রস্তুত। রাশিয়ান দূতাবাসের এক আধিকারিক PTI-কে বলেছেন, "আমরা ভারতের শক্তি চাহিদা পূরণ করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত যদি মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ বিঘ্নিত হতে থাকে।"

কিন্তু সমস্যা হলো আমেরিকা। ভারত আগেই মার্কিন চাপে রাশিয়া থেকে তেল কেনা কমিয়েছিল। এখন আবার রাশিয়ার কাছ থেকে বিশাল পরিমাণ কিনলে মার্কিন শাস্তিমূলক শুল্ক বা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে।

আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া:

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের বৃহত্তম LNG রপ্তানিকারক এবং অস্ট্রেলিয়া তৃতীয়। কিন্তু এই দুটি দেশ মিলেও কাতারের দীর্ঘস্থায়ী অনুপস্থিতির ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করতে পারবে না।

পশ্চিম আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা:

দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প হতে পারে, কিন্তু শিপিং সময় এবং লজিস্টিক জটিলতা মাথাব্যথা বাড়াবে।

৭. ভারতের অর্থনীতিতে ধাক্কা: মুদ্রাস্ফীতি, মুদ্রার পতন এবং বৃদ্ধির ক্ষতি

ভারত তার মোট অশোধিত তেলের চাহিদার প্রায় ৮৫ শতাংশ আমদানি করে — যা দৈনিক প্রায় ৪.২ মিলিয়ন ব্যারেল। Rystad Energy-র সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট পঙ্কজ শ্রীবাস্তব বলেছেন, "তেলের দামে কয়েক ডলারের বৃদ্ধিও দেশের শক্তি-অর্থনীতিকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারে।"

এছাড়াও ভারতের বিমান শিল্প বিপদে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বায়ুসীমা এবং পাকিস্তানের আকাশপথ বন্ধ থাকায় ইউরোপ ও ব্রিটেনগামী বহু ফ্লাইট বাতিল বা অন্য পথে যাচ্ছে। IndiGo-র শেয়ার সোমবার প্রায় ৫ শতাংশ কমে খুলেছিল।

৮. সামনের দিনগুলো: কতদিনের সঙ্কট?

বিশেষজ্ঞরা মোটামুটি তিনটি দৃশ্যকল্পের কথা বলছেন:

সেরা পরিস্থিতি (১-২ সপ্তাহ): কূটনীতির মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি হলে এবং হরমুজ় প্রণালী দ্রুত খুললে ভারত বড় ক্ষতি এড়াতে পারবে। সরকারি মজুত এবং বিকল্প সরবরাহ মিলিয়ে সামলানো যাবে।

মধ্যবর্তী পরিস্থিতি (১ মাস): LPG সরবরাহে রেশনিং শুরু হতে পারে। শিল্পে গ্যাস কাটছাঁট থাকবে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে।

সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি (৩ মাসের বেশি): তেল পরিশোধনের হার কমাতে হবে। পেট্রোল-ডিজেলে রেশনিং সম্ভব। সার উৎপাদন কমলে কৃষিখাতে বিপদ। মুদ্রার অবমূল্যায়ন ত্বরান্বিত হবে।

৯. ভারতের কাঠামোগত দুর্বলতা: যে সত্য এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না

এই সংকট আসলে একটি পুরনো সত্যকে আবার সামনে এনেছে — 'ভারত তার শক্তি নিরাপত্তায় মৌলিকভাবে দুর্বল। দশকের পর দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যের উপর নির্ভরশীলতা কমানো হয়নি। কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ চীনের তুলনায় অতি নগণ্য। গার্হস্থ্য গ্যাস উৎপাদন চাহিদার তুলনায় নেহাত সামান্য।

ভারত ইতিমধ্যেই তার শিল্পে গ্যাস সরবরাহ ১০ থেকে ২০ শতাংশ কমানোর নির্দেশ দিয়েছে। এটি সংকটের তীব্রতার প্রথম স্বীকারোক্তি।

রান্নার সিলিন্ডার এবং কূটনীতির যুদ্ধ

হরমুজ় প্রণালীতে আটকানো প্রতিটি ট্যাংকারের সাথে ভারতের একটি করে রান্নাঘর নিভে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। এটি শুধু একটি শক্তি সংকট নয় — এটি ভারতের বৈদেশিক নীতি, কূটনীতি এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনার এক কঠিন পরীক্ষা।

রাশিয়া থেকে কিনবে না আমেরিকার চাপে? কাতার থেকে গ্যাস আসছে না ইরানের হামলায়? মধ্যপ্রাচ্যের তেল আসছে না হরমুজ় বন্ধে? — এই তিনটি সমস্যা একসাথে সমাধান করার ক্ষমতা কি ভারতের আছে?

আগামী কয়েক সপ্তাহ ভারতের শক্তি কূটনীতি এবং সংকট ব্যবস্থাপনার আসল পরীক্ষা নেবে।

আরও পড়ুন: Andul Couple shocking News: প্রেমে বাধা পরিবার, সিনেমাহলে নীল আলো মেখে ঠোঁটে-ঠোঁট রেখেই শেষ পথে যুগল... আন্দুলে অন্ধকার...

আরও পড়ুন: Submarine Attack on Iranian Ship in Sri Lanka: ভারতের অতিথিকে ধ্বংস করেছেন ট্রাম্প, এর ফল ভুগতেই হবে-- সাবমেরিন-হামলার পর রণহুংকার ইরানের...

 

 

(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের AppFacebookWhatsapp ChannelX (Twitter)YoutubeInstagram পেজ-চ্যানেল)

About the Author

Nabanita Sarkar

সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর। সংবাদ মাধ্যমের পাশাপাশি রাজনৈতিক পরামর্শদাতাদাতা হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা। আইন-আদালত থেকে বিনোদন, দেশ থেকে দুনিয়ার হরেক খবরে শেখার চেষ্টা অবিরাম...

...Read More

.