)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: "আমরা তোমাকে বাবা বলে ডাকি, তুমি পছন্দ কোরো না... তাই আমাদের মৃতদেহ স্পর্শ কোরো না।" সাদা পাতায় হৃদয় নিংড়ে লেখা এই লাইনগুলো। ২২ পাতার লেখা চিঠি। বাবাকে সেই চিঠি লিখে আত্মঘাতী ভাই-বোন। মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটেছে উত্তর প্রদেশে। গাজিয়াবাদের গোবিন্দপুরমের বাসিন্দা ছিলেন আত্মঘাতী আইবি অফিসার অবিনাশ ও তাঁর বোন অঞ্জলি। সেই আত্মহত্যার ঘটনায় তদন্তে নেমেই পুলিস উদ্ধার করেছে ডায়েরিতে লেখা ২২ পাতার সুইসাইড নোট। যে সুইসাইড নোট তদন্তে নয়া মোড় এনেছে। সুইসাইড নোটে তাঁদের মৃত্যুর জন্য সৎমা রিতু রানি ও বাবা সুখবীরকে দায়ী করেছেন ভাই-বোন।
অঞ্জলি লিখেছেন, "সৎ মা মিস রিতু ও বাবা সুখবীর সিং ছাড়া আর কেউ আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী নয়। আমার বন্ধু মাহিম বন্ধু আমার অ্যাকাউন্টে থাকা সমস্ত টাকা ও পিএফের মালিক হবে। আর মিস রিতু এবং সুখবীর সিং আমার চিতা স্পর্শ করবেন না। আমার চিতায় কেবল মাহিমই আগুন দেবে।" তাঁর লেখা এই সুইসাইড নোটের পাতার ছবি অঞ্জলি নিজে তাঁর বাবা সুখবীর সিং, সৎ মা, মামা অনিল সিং এবং মামী রেখা রানিকে হোয়াটসঅ্যাপেও পাঠান।
'বাবা শুধু সৎ মাকেই বিশ্বাস করে'
অঞ্জলি তাঁর নোটে আরও লিখেছেন, বাবা সুখবীর সিং ও তাঁর সৎ মা ঋতু সামাজিক রীতিনীতির জন্য তাঁকে নানাভাবে মানসিকভাবে হয়রানি করেন। ঋতু দেবী অত্যন্ত চতুর। তিনি সুখবীর সিংয়ের সামনে অঞ্জলি সম্পর্কে মিথ্যে দাবি করেছেন। কিন্তু তাঁর বাবা সুখবীর সিং শুধু সৎ মা ঋতু রানিকেই বিশ্বাস করেন। অঞ্জলি লিখেছেন, "বাবা, শুধু সন্তান জন্ম দিলে বা স্কুলের ফি দিলেই হবে না। সন্তানের সঙ্গে সময় কাটাতে হবে। তার ইচ্ছা পূরণ করতে হবে। আমার ভাই কঠোর পরিশ্রম করে সরকারি চাকরি পেয়েছে। কিন্তু সেও এতটাই মানসিকভাবে বিধ্বস্ত যে সে তার বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যেতেও পারে না। সুখবীর সিং, তোমাকে বাবা বলে ডাকতে ভালো লাগছে না। আমার মৃতদেহ স্পর্শ করার কোনও অধিকার তোমার নেই। তুমি তোমার দ্বিতীয় বিয়ের কারণে তোমার নিজের সন্তানদের সুখ শ্বাসরোধ করে খুন করেছ। তোমার দ্বিতীয় স্ত্রীর জন্য তোমাকে অভিনন্দন।"
'আমার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, আমার বাবা চুপ ছিলেন'
সুইসাইড নোটে অঞ্জলি নিজেকে মাতৃহীনা এক দুর্ভাগা মেয়ে বলে বর্ণনা করেছেন। এমনকি তাঁর মামা দেবেন্দ্র এবং অনিলও যে আত্মীয় হিসেবে বোনের মৃত্যুর পর থেকে তাঁর সন্তানদের ভালো-মন্দের কোনও খোঁজ নেননি, সেকথাও লিখেছেন। অঞ্জলি সুইসাইড নোটে লিখেছেন, তাঁর সৎ মা তাঁর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁকে অপমান করেন। তাঁর সম্পর্কে খারাপ কথা বলেন। এমন পরিস্থিতিতেও তাঁর বাবা চুপ করে ছিলেন। কেউ তাঁর কথা শোনেননি। তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে অঞ্জলি লিখেছেন, "কেউ কেউ বলবেন যে আমি খারাপ। আমি আমার বাবা-মা সম্পর্কে এই ধরনের কথা লিখছি। কিন্তু আমি জানি আমি আমার সৎ মায়ের সঙ্গে ১৬ বছর কীভাবে কাটিয়েছি। আমি ছাড়া আমার ভাইও এই যন্ত্রণা অনুভব করেছে।"
'ডায়েরির পাতা ছিঁড়ো না...'
সুইসাইড নোটে অঞ্জলি তাঁর সৎ মাকে সতর্ক করেও লিখেছেন যে, "তোমার চালাকি সম্পর্কে আমরা সচেতন। তাই ডায়েরিতে লেখা এই পাতাগুলি ছিঁড়ো না। কারণ আমি এই লেখার ছবি তুলে অনেকের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। তোমার চালাকি তাই ধরা পড়ে যাবে। আমি যদি একা মারা যাই, তাহলে আমার চরিত্র নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠবে। আমরা ভাইবোন দুজনেই মানসিক চাপের মধ্যে আছি। তাই আমরা চললাম। এখন সমাজে মাথা উঁচু করে তোমরা জীবনযাপন করো।"
'আমার বন্ধুই শুধু আমাকে বুঝেছিল'
অঞ্জলি লিখেছেন,"মাহি, এখন সবকিছুই তোমার হাতে। আমি এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছি। তুমিই আমাকে দাহ কোরো। আমার বাবা-মা এবং অন্যদের কাউকে আমার মৃতদেহ স্পর্শ করতে দিও না। তুমি আমার শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলে। আমি তোমাকে কিছু উপহার দিতে চাই। তুমি আমার অ্যাকাউন্টের সমস্ত টাকা রাখতে পারো। আমার পলিসির টাকাও তোমার। পারিবারিক কলহ আমি আর সহ্য করতে পারছি না।" জানা গিয়েছে, মাহিম হচ্ছেন অঞ্জলির কাজের ক্ষেত্রে অংশীদার। পেশায় গ্রাফিক ডিজাইনার। অঞ্জলি বহু বছর ধরে নয়ডার একটি এক্সপোর্ট কোম্পানিতে টিম লিডার হিসেবে কাজ করছিলেন।
স্বামীর পরকীয়াতেই আত্মঘাতী অবিনাশ-অঞ্জলির মা
পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, অবিনাশ-অঞ্জলির মা কমলেশও বাড়িতেই কীটনাশক খেয়ে আত্মঘাতী হয়েছিলেন। স্বামী সুখবীর সিংয়ের পরকীয়া সম্পর্কের কারণেই তিনি আত্মঘাতী হন। স্বামীর পরকীয়ার প্রতিবাদ করলেই কমলেশকে সুখবীর সিং মারধর করতেন ও মানসিক নির্যাতন করতেন বলে অভিযোগ। স্ত্রী কমলেশের মৃত্যুর ঠিক এক বছরের মাথাতেই সুখবীর সিং তাঁর বান্ধবীকে বিয়ে করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। অভিযোগ, এরপর তাঁরা দুজনে মিলে অবিনাশ ও অঞ্জলির উপরও মানসিক নির্যাতন শুরু করেন। শেষে বাধ্য হয়ে দুই ভাইবোন মাসির বাড়িতে চলে যান। বেশ কিছু বছর পর সুখবীর সিং তাঁদের আবার বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু বাড়ি ফেরার পর ফের অবিনাশ ও অঞ্জলির উপর শুরু হয় অত্যাচার। ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় সুখবীর সিং ও তাঁর স্ত্রী ঋতু রানির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়েছে।
'আমি সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি...'
যদিও ভাইবোনের দেহ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের সময় শূন্য দৃষ্টি নিয়ে সুখবীর সিং দাবি করেছিলেন, তিনি সন্তানদের দেখাশোনার জন্যই দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন। সুখবীর সিংয়ের দাবি, প্রথমপক্ষের সন্তানদের দেখভালের জন্যই তিনি তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীকে সন্তান না নেওয়ার জন্য রাজি করিয়েছিলেন। তাঁরা নিজেরা সরকারি চাকরি করেন। তাই মেয়ের কাছেও একটা সরকারি চাকরি চেয়েছিলেন, ব্যস এইটকুই। সুখবীর সিংয়ের কথায়, "দুই সন্তানকে ছাড়া এখন আমি মৃত।" পুলিস জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে সবদিক খতিয়ে দেখে তদন্ত শুরু হয়েছে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)
আপনি কি অবসাদগ্রস্ত? বিষণ্ণ? চরম কোনও সিদ্ধান্ত নেবেন না। আপনার হাত ধরতে তৈরি অনেকেই। কথা বলুন প্লিজ... iCALL (সোম-শনি, ১০টা থেকে ৮টা) ৯১৫২৯৮৭৮২১... কলকাতা পুলিস হেল্পলাইন (সকাল ১০টা-রাত ১০টা, ৩৬৫ দিন) ৯০৮৮০৩০৩০৩, ০৩৩-৪০৪৪৭৪৩৭... ২৪x৭ টোল-ফ্রি মানসিক স্বাস্থ্য পুনর্বাসন হেল্পলাইন-- কিরণ (১৮০০-৫৯৯-০০১৯)