)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: উত্তর ২৪ পরগনার শিল্পাঞ্চল ও প্রাচীন ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু ভাটপাড়া বিধানসভা কেন্দ্র (Bhatpara Assembly Election 2026)। ১৯৫১ সাল থেকে রাজ্যের নির্বাচনী মানচিত্রে রয়েছে হুগলি নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত এই ভাটপাড়া। ব্যারাকপুর লোকসভা আসনের অন্তর্গত সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রের একটি এবং ভাটপাড়া পৌরসভার ১ থেকে ১৭ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত। কে জিতছে এখানে?
নির্বাচনের ইতিহাস ও রাজনৈতিক বিবর্তন
ভাটপাড়া এ পর্যন্ত ২০১৯ সালের উপ-নির্বাচন-সহ মোট ১৮টি বিধানসভা নির্বাচন প্রত্যক্ষ করেছে। প্রথম পাঁচ দশক এখানে কংগ্রেস এবং বামপন্থীরা পর্যায়ক্রমে শাসন করেছে। যেখানে উভয় পক্ষই ছয়বার করে জয়লাভ করেছিল। তবে নতুন সহস্রাব্দের শুরুতে তৃণমূলের জোয়ার আসে এবং অর্জুন সিং ২০০১ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে টানা চারবার এই আসনে জয়ী হন। ২০১৯ সালে অর্জুন সিং বিজেপিতে যোগ দিয়ে ব্যারাকপুর লোকসভা আসনে জয়ী হওয়ার পরে বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দিলে এখানে উপ-নির্বাচন হয়। সেই নির্বাচনে অর্জুন-পুত্র পবন কুমার সিং তৃণমূলের মদন মিত্রকে ২৩,১০৪ ভোটে হারিয়ে এক নতুন মোড় ঘুরিয়ে দেন। ২০২১ সালেও পবন সিং জিতেন্দ্র শ-কে ১৩,৬৮৪ ভোটে হারিয়ে এই আসনটি ধরে রাখেন।
লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির দাপট
বিধানসভা নির্বাচনের পাশাপাশি লোকসভা নির্বাচনেও ভাটপাড়ায় বিজেপির দাপট স্পষ্ট হয়েছে। ২০১৪ সালে এই বিধানসভা অংশে বিজেপি ২,৫১৫ ভোটে এগিয়ে ছিল, যা ২০১৯ সালে বেড়ে ২৯,৭০৭ ভোটে দাঁড়ায়। ২০২৪ সালেও তারা ১৭,৪৬৩ ভোটের লিড বজায় রাখে। উল্লেখ্য, ২০১৪ এবং ২০২৪ সালে বিজেপি ব্যারাকপুর লোকসভা আসনটি না জিতলেও ভাটপাড়া বিধানসভা অংশে তারা তাদের লিড ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
ভোটার এবং জনতাত্ত্বিক তথ্য
২০২১ সালে এখানে রেজিস্টার্ড ভোটার সংখ্যা ছিল ১,৫৪,০৩৭। এখানে মুসলিম ভোটার ২৩.৪০%, তফসিলি জাতি ৮.৮৪% এবং তফসিলি উপজাতি ১.১১%। শহরকেন্দ্রিক ভোটারদের অনীহার কারণে ভোটদানের হার ধারাবাহিকভাবে কমেছে (২০১৬ সালে ৭৫.০২% থেকে কমে ২০২১ সালে ৬৯.৫৮% হয়েছে) এখানে।
ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট
"ভাটপাড়া" নামটি এসেছে "ভট্টপল্লী" থেকে, যা ছিল সংস্কৃত পণ্ডিত ও ব্রাহ্মণদের এক প্রাচীন জনপদ। একসময় এটি সংস্কৃত শিক্ষার অত্যন্ত প্রসিদ্ধ কেন্দ্র ছিল এবং এখানে অসংখ্য ঐতিহ্যবাহী 'টোল' গড়ে উঠেছিল। ১৮৯৯ সালে নৈহাটি থেকে আলাদা হয়ে ভাটপাড়া পৌরসভা গঠিত হয়। ব্রিটিশ আমলে এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েও ভাটপাড়া একটি শিল্পকেন্দ্র হিসেবে, বিশেষ করে চটকল শিল্পের জন্য বিকশিত হয়। এখানকার চটকলগুলি একসময় স্থানীয় অর্থনীতির প্রাণভোমরা ছিল এবং বিশাল সংখ্যক অভিবাসী শ্রমিককে আকৃষ্ট করেছিল। এই শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন, যাঁরা আজ এই কেন্দ্রের হিন্দিভাষী জনসংখ্যার প্রধান ভিত্তি।
ভৌগোলিক অবস্থান
ভাটপাড়ার পশ্চিমে হুগলি নদী এবং পূর্বে শিয়ালদহ-কৃষ্ণনগর রেললাইন। নদীটি শহরের শিল্প ও সাংস্কৃতিক পরিচয় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমানে চটকলগুলির রমরমা না থাকলেও ক্ষুদ্র শিল্প এবং বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে এর অস্তিত্ব টিকে আছে।
যোগাযোগ
ভাটপাড়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা বেশ উন্নত। শিয়ালদহ-রানাঘাট লাইনের ভাটপাড়া রেলস্টেশন এবং ব্যারাকপুর ট্রাঙ্ক রোডের (বিটি রোড) মাধ্যমে এটি কলকাতা ও জেলার অন্যান্য অংশের সঙ্গে যুক্ত। জেলা সদর বারাসাত এখান থেকে ৩৫ কিমি এবং কলকাতা মাত্র ২৫ কিমি দূরে অবস্থিত। এছাড়া নিকটবর্তী শহরগুলির মধ্যে রয়েছে নৈহাটি (৫ কিমি), কাঁচরাপাড়া (৮ কিমি) এবং হালিশহর (৬ কিমি)। নদীর ওপারে হুগলি জেলার চন্দননগর এখান থেকে প্রায় ১০ কিমি দূরে।
২০২৬ নির্বাচনের পূর্বাভাস ও চ্যালেঞ্জ
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ভাটপাড়া এমন একটি কেন্দ্র, যেখানে বিজেপি স্পষ্ট সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে লড়াইয়ে নামবে। বিশেষ করে ২০২১ সালে তৃণমূলের প্রাক্তন তিনবারের সাংসদ দিনেশ ত্রিবেদী বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পরে এখানকার হিন্দিভাষী ভোটারদের উপর বিজেপির দখল আরও মজবুত হয়। তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য এখানে বড় চ্যালেঞ্জ হল বিজেপির প্রভাব মোকাবিলা করতে একজন ক্যারিশম্যাটিক হিন্দিভাষী নেতা খুঁজে বের করা। একই সঙ্গে তাদের নজর রাখতে হবে, যাতে বাম-কংগ্রেস জোটের পুনরুত্থান না ঘটে, কারণ তা তৃণমূলের মুসলিম ভোটব্যাংকে থাবা বসাতে পারে। ভাটপাড়ায় লড়াইয়ের ময়দান এখন প্রস্তুত এবং উভয় পক্ষের জন্যই জয়ের বাজি অত্যন্ত চড়া।
দুই দফায় মিটল ভোট
প্রথম দফায় ২৩ এপ্রিলে ১৫২টি আসনে ভোট পড়েছে। দ্বিতীয় দফায় ২৯ এপ্রিলে বাকি ১৪২টি আসনে। রাজ্য জুড়ে মোট ৮০,৭১৯টি বুথে ভোট গ্রহণ হয়েছে। মোট নথিভুক্ত ভোটার ছিলেন ৬ কোটি ৮২ লাখের কিছু বেশি। দুই দফা মিলিয়ে ভোট পড়েছে ৯২.৯৩ শতাংশ, যা রাজ্যের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
বিতর্কিত ভোটার তালিকা
ভোটের আগে থেকেই উত্তাপ ছড়িয়েছিল বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR)। নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় রাজ্য থেকে প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এদের মধ্যে ৬০ লাখের বেশি ভোটারকে অনুপস্থিত বা মৃত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের হিসেবে, অনিশ্চিত তালিকার প্রায় ৬৫ শতাংশ মুসলিম ভোটার রয়েছে! পাশাপাশি মতুয়া সম্প্রদায়ের দলিত হিন্দু ভোটাররাও ক্ষতিগ্রস্ত। তৃণমূল দাবি করেছে, আসল ভোটার মুছে দেওয়া হয়েছে। বিজেপি বলেছে, বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের নাম ছাঁটাই হয়েছে।
মোদী-শাহের বাংলা অভিযান
কেন্দ্র সরকার এবারের বাংলা ভোটে পুরোদস্তুর ময়দানে নেমেছিল। কেন্দ্রীয় বাহিনীর পাশাপাশি এই প্রথম কোনো রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে জাতীয় তদন্ত সংস্থা বা এনআইএ (NIA) মোতায়েন করা হয়েছে। দুই দফায় রাজ্যে সাড়ে তিন লাখের বেশি নিরাপত্তাকর্মী কাজ করেছেন। ভোটের আগে থেকে ইডি-সিবিআই তদন্তের চাপ, বিদ্যালয় নিয়োগ দুর্নীতির মামলা, আরজি কর কাণ্ডের প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে বিজেপি রাজ্যে পরিবর্তনের ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা করেছে।
মমতার বাংলা অস্মিতা
তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু থেকেই এই লড়াইকে বাংলার আত্মসম্মানের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেছেন। কেন্দ্রীয় এজেন্সির ব্যবহার, এসআইআর বিতর্ক এবং মোদী-শাহের সরাসরি প্রচারে বাংলায় আসাকে রাজ্যের স্বায়ত্তশাসনে হস্তক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি। লক্ষ্মীর ভান্ডার, যুবসাথী-সহ একাধিক কল্যাণ প্রকল্পকে ঢাল করে ভোটে গিয়েছে তৃণমূল।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)