)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: উত্তর ২৪ পরগনার শিল্পাঞ্চল ও প্রাচীন জনপদ জগদ্দল বিধানসভা কেন্দ্র। প্রাচীন ইতিহাস ও আধুনিক রাজনীতির টানাপোড়েনে উত্তর ২৪ পরগনার জগদ্দল একটি প্রাচীন নদী তীরবর্তী শিল্প এলাকা, যা একসময় ফরওয়ার্ড ব্লকের শক্ত ঘাঁটি থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলিতে তৃণমূল কংগ্রেস বনাম বিজেপির হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রায় ৪৬০ বছরের পুরনো জনপদটি বর্তমানে ভাটপাড়ার সংলগ্ন এলাকা। হুগলি নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত এই অঞ্চলটি ঔপনিবেশিক এবং পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা চটকল বলয়ের (জুট বেল্ট) একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
নির্বাচনী ইতিহাস ও বিবর্তন
১৯৭৭ সালে একটি সাধারণ ক্যাটাগরির বিধানসভা কেন্দ্র হিসেবে জগদ্দল আত্মপ্রকাশ করে। ভাটপাড়া পুরসভার ১৮ থেকে ৩৫ নম্বর ওয়ার্ড এবং ব্যারাকপুর-১ ব্লকের কাওগাছি ১, কাওগাছি ২, মামুদপুর ও পানপুর কেওটিয়া গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে এই কেন্দ্রটি গঠিত। এটি ব্যারাকপুর লোকসভা আসনের অন্তর্গত সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রের অন্যতম। প্রতিষ্ঠার পর থেকে জগদ্দল ১০টি বিধানসভা নির্বাচন প্রত্যক্ষ করেছে। শুরুতে এটি অল ইন্ডিয়া ফরওয়ার্ড ব্লকের দুর্গে পরিণত হয়, যারা এখানে ৬ বার জয়লাভ করে। ১৯৯৬ সালে কংগ্রেস একবার তাদের সেই জয়রথ থামিয়েছিল। তবে ২০১১ সাল থেকে তৃণমূল কংগ্রেস এখানে টানা তিনবার জয়লাভ করে আধিপত্য বজায় রেখেছে।
রাজনৈতিক মেরুকরণ
পরশ দত্ত (যিনি বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন) ২০১১ এবং ২০১৬ সালে যথাক্রমে ৩৬,০৩২ এবং ২৭,০৪৫ ভোটের ব্যবধানে ফরওয়ার্ড ব্লকের হরিপদ বিশ্বাসকে হারিয়ে জয়ী হন। ২০২১ সালে দলের অভ্যন্তরীণ কারণে পরশ দত্ত লড়তে অস্বীকার করলে তৃণমূল সোমনাথ শ্যাম ইচিনিকে প্রার্থী করে। তিনি বিজেপির অরিন্দম ভট্টাচার্যকে ১৮,৩৬৪ ভোটে পরাজিত করেন।
বিজেপির বাড়বাড়ন্ত
২০১১ সালে বিজেপির ভোট শেয়ার ছিল মাত্র ২.৯২% যা ২০১৬ সালে ১৮.৪৮% এবং ২০২১ সালে লাফিয়ে ৩৭.৮৮%-এ পৌঁছয়। অন্য দিকে, ফরওয়ার্ড ব্লকের ভোট শেয়ার ৩৪.২৮% (২০১১) থেকে কমে মাত্র ৯.২৪% (২০২১)-এ ঠেকেছে, ফলে তারা এখন তৃতীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
লোকসভা নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি
লোকসভা নির্বাচনেও দেখা গিয়েছে তৃণমূল প্রথমে বামফ্রন্টকে হঠিয়ে দখল নিলেও বর্তমানে বিজেপির থেকে প্রবল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। ২০১৯ সালে বিজেপি এই বিধানসভা অংশে ৮,৩৬৪ ভোটের লিড নিয়ে তৃণমূলকে চমকে দিয়েছিল। তবে, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল ৫,৯৮৪ ভোটের লিডে পুনরায় শীর্ষস্থান ফিরে পায়। উল্লেখযোগ্য, ২০০৯ সালে ৪২.৩২% ভোট পাওয়া সিপিআই(এম)-এর ভোট ২০২৪ সালে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯.৫৮%-এ।
ভোটার পরিসংখ্যান
২০২৪ সালে নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা ২,৩৫,১৮৪। জাতিগত বিন্যাস: তফসিলি জাতি ২১.৫৭%, তফসিলি উপজাতি ১.৯৪% এবং মুসলিম ৭.৩০%। এটি প্রধানত এক শহুরে কেন্দ্র (৮১.৩৯% শহুরে ভোটার)। তবে শহরকেন্দ্রিক আসন হওয়া সত্ত্বেও এখানে ভোটদানের হার বেশ ভালো। যদিও তা ধীরে ধীরে কমছে (২০১১ সালে ৮৪.৯৮% থেকে কমে ২০২১ সালে ৭৭.৫২% হয়েছে)।
ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব
ষোড়শ শতাব্দীর কায়স্থ রাজা প্রতাপাদিত্যের বিবরণে জগদ্দল ও নিকটবর্তী মুলাজোড়ে পরিখা এবং দুর্গের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা বহিঃশত্রুর আক্রমণ ঠেকাতে ব্যবহৃত হত। ব্রিটিশ আমলে এটি হুগলি শিল্প করিডরের অংশ হয়ে ওঠে। চটকলগুলির টানে বিহার, ওড়িশা এবং পূর্ব উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমিকদের আগমনে জগদ্দলের সামাজিক গঠন আমূল বদলে যায়।
ভৌগোলিক অবস্থান ও যোগাযোগ
জগদ্দল কলকাতার শিয়ালদহ-রানাঘাট শহরতলি রেললাইনের মাধ্যমে কলকাতার সঙ্গে যুক্ত। শিয়ালদহ থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩৭ কিমি। সড়কপথে এটি ব্যারাকপুর (১৫ কিমি) এবং উত্তর ২৪ পরগনার অন্যান্য অংশের সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া ফেরি সার্ভিসের মাধ্যমে নদীর ওপারে হুগলি জেলার চন্দননগরের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। দমদম বিমানবন্দর এখান থেকে ২৫-৩০ কিমি এবং কলকাতার বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলি ৩৫-৪০ কিমি দূরে অবস্থিত।
২০২৬ নির্বাচনের পূর্বাভাস
কাগজে-কলমে জগদ্দলকে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি মনে হলেও (বিগত ৭টি বড় নির্বাচনের ৬টিতেই তারা জয়ী বা এগিয়ে ছিল), বাস্তব পরিস্থিতি বেশ জটিল। বিজেপি এখন এখানে শক্তিশালী। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে দুই দলের ভোটের ব্যবধান কমে মাত্র ৩.৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা খুব সহজেই মেক-আপ করা সম্ভব বলে মনে করা হয়েছিল। আর সেটাই ঘটছে। বাম-কংগ্রেস জোটের ক্ষয় তৃণমূলকে সাহায্য করলেও বিজেপি চাইবে এই জোটের কিছুটা পুনরুত্থান হোক, যাতে মুসলিম ভোট একতরফাভাবে তৃণমূলের দিকে না যায়। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জগদ্দলে একটি তীব্র এবং হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে প্রতিটি ভোটই জয়-পরাজয় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
দুই দফায় মিটল ভোট
প্রথম দফায় ২৩ এপ্রিলে ১৫২টি আসনে ভোট পড়েছে। দ্বিতীয় দফায় ২৯ এপ্রিলে বাকি ১৪২টি আসনে। রাজ্য জুড়ে মোট ৮০,৭১৯টি বুথে ভোট গ্রহণ হয়েছে। মোট নথিভুক্ত ভোটার ছিলেন ৬ কোটি ৮২ লাখের কিছু বেশি। দুই দফা মিলিয়ে ভোট পড়েছে ৯২.৯৩ শতাংশ, যা রাজ্যের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
বিতর্কিত ভোটার তালিকা
ভোটের আগে থেকেই উত্তাপ ছড়িয়েছিল বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR)। নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় রাজ্য থেকে প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশ। এদের মধ্যে ৬০ লাখের বেশি ভোটারকে অনুপস্থিত বা মৃত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের হিসেবে, অনিশ্চিত তালিকার প্রায় ৬৫ শতাংশ মুসলিম ভোটার রয়েছে! পাশাপাশি মতুয়া সম্প্রদায়ের দলিত হিন্দু ভোটাররাও ক্ষতিগ্রস্ত। তৃণমূল দাবি করেছে, আসল ভোটার মুছে দেওয়া হয়েছে। বিজেপি বলেছে, বেআইনি অনুপ্রবেশকারীদের নাম ছাঁটাই হয়েছে।
মোদী-শাহের বাংলা অভিযান
কেন্দ্র সরকার এবারের বাংলা ভোটে পুরোদস্তুর ময়দানে নেমেছিল। কেন্দ্রীয় বাহিনীর পাশাপাশি এই প্রথম কোনো রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে জাতীয় তদন্ত সংস্থা বা এনআইএ (NIA) মোতায়েন করা হয়েছে। দুই দফায় রাজ্যে সাড়ে তিন লাখের বেশি নিরাপত্তাকর্মী কাজ করেছেন। ভোটের আগে থেকে ইডি-সিবিআই তদন্তের চাপ, বিদ্যালয় নিয়োগ দুর্নীতির মামলা, আরজি কর কাণ্ডের প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে বিজেপি রাজ্যে পরিবর্তনের ন্যারেটিভ তৈরির চেষ্টা করেছে।
মমতার বাংলা অস্মিতা
তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু থেকেই এই লড়াইকে বাংলার আত্মসম্মানের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেছেন। কেন্দ্রীয় এজেন্সির ব্যবহার, এসআইআর বিতর্ক এবং মোদী-শাহের সরাসরি প্রচারে বাংলায় আসাকে রাজ্যের স্বায়ত্তশাসনে হস্তক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তিনি। লক্ষ্মীর ভান্ডার, যুবসাথী-সহ একাধিক কল্যাণ প্রকল্পকে ঢাল করে ভোটে গিয়েছে তৃণমূল।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)