Kapil Sibbal on TMC Lost: কিন্তু এই মৌলিক ইস্যুগুলো ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে এজেন্সি রাজনীতি এবং বিভাজনের সুর। বদলার রাজনীতিতে দেশের বা রাজ্যের উন্নয়ন স্তব্ধ হয়ে যায়। যখন সরকার ও বিরোধী পক্ষ একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করতে ব্যস্ত থাকে, তখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকে।

রাজীব চক্রবর্তী: পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল এবং তার পরবর্তী পরিস্থিতি ভারতীয় গণতন্ত্রের কাঠামো নিয়ে এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করেছে। বিজেপির জয় আর তৃণমূলের বিরাট পরাজয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তৃণমূল সুপ্রিমো জানিয়ে দিয়েছেন য, তিনি পদত্যাগ করবেন না। আর এই আবহেই, প্রবল বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মমতা পদত্যাগ না করলে, সাংসদীয় গণতন্ত্রে কা কা অসুবিধা হতে পারে? রাজ্য়ে কি জারি হতে পারে রাষ্ট্রপতি শাসন? যখন এউই বিতর্ক পশ্চিমবঙ্গের রাজনাতিতে তোলপাড় ফেলেছে, ঠিক তখনই আইনজীবী কপিল সিব্বল সাংবাদিক বৈঠকে বিজেপির এই জয়কে এক হাত নিয়েছে। তৃণমূলের এই হারকে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে তিনি কী বললেন?
তিনি বলেছেন, এই নির্বাচন শুধু দুটো দলের লড়াই ছিল না, বরং এক অসম যুদ্ধ। একদিকে ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা একটি রাজনৈতিক দল এবং অন্যপক্ষে ছিল রাষ্ট্রশক্তির ক্ষমতা।
১. নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় এজেন্সির ভূমিকা: একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রধান স্তম্ভ হল নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা। কিন্তু এই নির্বাচনে কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ক) বদলি ও নিয়ন্ত্রণ: ভোটের ঠিক আগে ৪৮৩ জন প্রশাসনিক আধিকারিককে বদলি করা এবং প্রায় ২৪০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা কি কেবল নিরাপত্তার স্বার্থে? সিব্বলের মতে, এই পরিবর্তন রাজ্য প্রশাসনকে পঙ্গু করে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা।
খ) এজেন্সির অতিসক্রিয়তা: আদর্শ আচরণবিধি চলাকালীন রাজ্যের মন্ত্রী ও প্রথম সারির নেতাদের কেন্দ্রীয় এজেন্সির মাধ্যমে সমন পাঠানো বা হেনস্থা করা ভোটারদের মনে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরির চেষ্টা মাত্র। এটি সুস্থ নির্বাচনের পরিপন্থী।
২. ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ: একটি গাণিতিক ষড়যন্ত্র? ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার সংখ্যার সাথে নির্বাচনী ফলাফলের এক অদ্ভুত যোগসূত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে:
নাম বাদ পড়ার সংখ্যা তৃণমূলের জয় (আসন) বিজেপির জয় (আসন)
৫,০০০-এর কম ১৩ ৫
৫,০০০ - ১৫,০০০ ৫০ ১২
১৫,০০০ - ২৫,০০০ ১৯ ৪৭
২৫,০০০-এর বেশি ৫১ ৯৫
বিশ্লেষণে কী উঠে আসছে?: দেখা যাচ্ছে, যেখানে ভোটারের নাম বাদ পড়ার হার অনেক বেশি (২৫ হাজারের বেশি), সেখানে বিজেপির জয়ের হার আনুপাতিকভাবে অনেক বেশি। প্রশ্ন উঠছে, এই বিপুল সংখ্যক নাম কি পরিকল্পিতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে যাতে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করা যায়? এটি সরাসরি ভোটাধিকার হরণের শামিল।
৩.কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা
নির্বাচন কমিশন দাবি করেছিল যে ভোটের পরেও ৬০ দিন কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকবে যাতে হিংসা রোধ করা যায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর এবং কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। 'তৃণমূল হিংসা করে'-- এই অভিযোগকে হাতিয়ার করে যে কেন্দ্রীয় বাহিনী আনা হয়েছিল, তারা বিজেপির জয়ী হওয়ার পর ঘটা হিংসার সময় কেন নির্বাক দর্শক হয়ে থাকল?
এই দ্বিচারিতা প্রমাণ করে যে লক্ষ্য শান্তি রক্ষা নয়, বরং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ছিল।
৪. সাম্প্রদায়িক বিভাজন
বিজেপি নেতাদের ভাষণে বারবার সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সুর শোনা গেছে। ভারতের নির্বাচনী আইন (Representation of the People Act) অনুযায়ী, ধর্ম বা জাতপাতকে ব্যবহার করে ভোট চাওয়া একটি অপরাধ।
ইলেকশন পিটিশন: সিবালের পরামর্শ অনুযায়ী, এই সাম্প্রদায়িক উস্কানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে ‘ইলেকশন পিটিশন’ দাখিল করা জরুরি। এ শুধু আইনি লড়াই নয়, বরং গণতন্ত্রকে কলুষমুক্ত করার লড়াই।
৫. আসল সমস্যা বনাম ‘বদলার’ রাজনীতি
প্রধানমন্ত্রী ‘বদলা নয়, বদল চাই’ বললেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে প্রশাসনিক প্রতিহিংসা। বাংলার সাধারণ মানুষের মূল চাহিদাগুলো ছিল:
শিক্ষা ও কর্মসংস্থান: তরুণ প্রজন্মের জন্য চাকরির নিশ্চয়তা।
স্বাস্থ্য পরিষেবা: গ্রামগঞ্জে আরও উন্নত চিকিৎসাব্যবস্থা।
পানীয় জল ও পরিকাঠামো: প্রতিটি ঘরে বিশুদ্ধ জল পৌঁছে দেওয়া।
কিন্তু এই মৌলিক ইস্যুগুলো ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে এজেন্সি রাজনীতি এবং বিভাজনের সুর। বদলার রাজনীতিতে দেশের বা রাজ্যের উন্নয়ন স্তব্ধ হয়ে যায়। যখন সরকার ও বিরোধী পক্ষ একে অপরকে নিশ্চিহ্ন করতে ব্যস্ত থাকে, তখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকে।
আগামীর পথ
পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনী ফলাফল অনেকগুলো অমীমাংসিত প্রশ্ন রেখে গেল। যদি ৫ হাজারের কম নাম কাটা গেলে তৃণমূল জেতে আর ২৫ হাজার নাম কাটা গেলে বিজেপি জেতে, তবে বুঝতে হবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি কোথাও গিয়ে ত্রুটিপূর্ণ ছিল।
গণতন্ত্রে জয়-পরাজয় বড় কথা নয়, কিন্তু সেই জয় যদি পেশ পেশিশক্তি, এজেন্সির ভয় এবং আইনি কারচুপির মাধ্যমে আসে, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে দেশের জন্য বিপজ্জনক। একজন সাধারণ নাগরিক এবং আইনজ্ঞের ভাষায়-- এখন সময় এসেছে আদালতে যাওয়ার এবং প্রতিটি বুথ ও প্রতিটি বাদ পড়া নামের হিসেব বুঝে নেওয়ার।
তবেই আগামী দিনে বাংলার মানুষ নির্ভয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।মূল বার্তা: উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের রাজনীতিই হোক শেষ কথা, প্রশাসনিক প্রতিহিংসা বা সাম্প্রদায়িক বিভাজন নয়।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)