)
রজত মণ্ডল
ভোটের হিসাবটা দিয়ে শুরু করা যাক।
বিজেপির (BJP) ভোটের অংশ ৪৪.৮১ শতাংশ। তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) ৪১.৮৯ শতাংশ। ব্যবধান মাত্র তিন শতাংশের কাছাকাছি। কিন্তু আসনের ব্যবধান দেখুন। বিজেপি পৌঁছে গেছে ২০০-র কোঠায়, তৃণমূল ঘুরছে ৯০-এর আশেপাশে। ভোটের ব্যবধান তিন শতাংশ, আসনের ব্যবধান একশোরও বেশি।
এই অঙ্কটাই আজকের গল্পের চাবিকাঠি।
বাংলার ভোটার কখনও সরলরেখায় চলেননি। তিনি কৌশলী। তিনি হিসাব করেন। এবং এবারের হিসাবটা তিনি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় করেছেন, যার ফলাফল আজ ঘোষণা করছে গণনার ঘড়ি।
প্রশ্নটা হল: বিজেপির ভোট ২০২১ সালের ৩৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৫ শতাংশে পৌঁছাল কোথা থেকে? কোন ভোটার হঠাৎ গেরুয়া হলেন?
উত্তরটা একটাই জায়গায় লুকিয়ে আছে। বাম।
বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের মিলিত ভোটের অংশ ২০১৯ সালে ছিল ১৩ শতাংশ, ২০২১ সালে নেমে আসে ৯.৮ শতাংশে, ২০২৪ লোকসভায় সামান্য বেড়ে হয় প্রায় ১১ শতাংশ। এই ভোটের ভার ভারী নয় সংখ্যায়, কিন্তু যেখানে গেছে সেখানে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে।
২০২১ থেকে ২০২৬, বিজেপির ভোট বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের মিলিত 'উদ্বৃত্ত' ভোটটুকু কোথায় গেল? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় অংশটাই গেছে পদ্মের দিকে। এটাই 'আগে রাম, পরে বাম'-এর কৌশল।
বাংলার বাম ভোটারের একটা মনস্তত্ত্ব আছে। তিনি মতাদর্শে বিজেপিকে পছন্দ করেন না। কিন্তু ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনে তিনি যা দেখেছেন, কাটমানি, নিয়োগ দুর্নীতি, চাকরির প্রশ্নে নির্লজ্জ মিথ্যা, সিন্ডিকেটের রাজত্ব, এরপর তৃণমূলকে তাঁর আরও বেশি অপছন্দ। এই 'নেগেটিভ ভোট' বা প্রতিবাদের ভোটই আজকের গেরুয়া জোয়ারের আসল রসদ।
দক্ষিণবঙ্গের শহরতলি এলাকায় নোয়াপাড়া, পানিহাটি, বরানগর, বারুইপুর, বেহালা, যাদবপুর, বালি, শিবপুর, হাওড়া দক্ষিণের মতো আসনে বামেদের কাছে ছিল ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ ভোট। যাদবপুরে তো একক বাম ভোট ছিল ৬০,০০০-এর কাছে। এই ভোটগুলো যদি বিজেপির ঝুলিতে পড়ে থাকে, তাহলে যাদবপুর, পানিহাটির মতো আসনে বিজেপির এগিয়ে যাওয়া মোটেই আশ্চর্যের নয়।
হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় বামেরা নিজেরাই যুক্তি দিয়েছিল যে বিজেপি কখনও তৃণমূলকে সরাতে পারবে না। কিন্তু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বাম-কংগ্রেস জোটের বক্তব্য ছিল ভিন্ন, এই ভোট সরকার বদলানোর নয়, বিরোধী পক্ষ বদলানোর। এই দ্বিমুখী বার্তাই শেষমেশ বাম-ভোট দুই দিকে ভাগ হয়ে যাওয়ার পথ খুলে দিয়েছে। মুসলিম-প্রধান আসনে বাম ভোটের একাংশ তৃণমূলে গিয়ে থাকতে পারে, হিন্দু-প্রধান আসনে সেই ভোটই হয়েছে বিজেপির হাতিয়ার।
আর এইখানেই তৃণমূলের কৌশলী ব্যর্থতা।
তৃণমূল ভেবেছিল, এসআইআর (SIR)-কেন্দ্রিক সংখ্যালঘু আতঙ্ককে পুঁজি করে বিশাল মুসলিম ভোট ব্লক তাদের দিকে থাকবে। শুভেন্দু অধিকারী নিজেই বলেছেন, এবার মুসলিম ভোট যেভাবে তৃণমূলে যেত, এবার সেটা হয়নি। একটা অংশ গেছে অন্য মুসলিম-ঘেঁষা দলের দিকে। অর্থাৎ মুসলিম ভোটেও ভাঙন ধরেছে। যে অবিভক্ত সংখ্যালঘু ব্লকের উপর নির্ভর করে তৃণমূল ২১৫ পেয়েছিল ২০২১-এ, সেই ব্লকটিই এবার ভেঙে গেছে।
একদিকে মুসলিম ভোটে ভাঙন, অন্যদিকে হিন্দু ভোটে একীভবন। এই দুইয়ের যোগফলটাই হল আজকের ফলাফল।
৯২.৯৩ শতাংশ ভোট পড়েছে এবার, রাজ্যের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এই রেকর্ড ভোটদান নিছক গণতান্ত্রিক উৎসাহ নয়। এটা একটা সঞ্চিত ক্ষোভের বিস্ফোরণ। ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনে সঞ্চিত ক্লান্তি, নিয়োগ দুর্নীতি,কর্মসংস্থানের প্রশ্নে হতাশা, রাজ্য প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয়, এগুলো মিলিয়ে বাংলার ভোটারের মধ্যে একটা পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল।
তৃণমূল সেই আকাঙ্ক্ষাকে ধরতে পারেনি। বরং 'বাংলার মেয়ে' আর 'বহিরাগত' ন্যারেটিভে মেতে ছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাউকে বহিরাগত বলে ঠেকাতে পারেননি। বাংলার ভোটার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ভিন্ন হিসাবে।
আর সেই হিসাবটার নাম: আগে রাম, পরে বাম।
তৃণমূলকে সরাও আগে। বাকি সব পরে দেখা যাবে।
এই কৌশলই আজ বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্র নতুন করে আঁকছে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)