)
রক্তিমা দাস: ২০২৬ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর ফের খুলল আরজি করের সেই অভিশপ্ত ফাইল। শুক্রবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আরজি কর কাণ্ডের তথ্যপ্রমাণ লোপাট এবং গাফিলতির অভিযোগে কলকাতা পুলিসের তৎকালীন তিন হেভিওয়েট আইপিএস অফিসারকে সাসপেন্ড করেছেন। সাংবাদিক বৈঠকে এই বড় ঘোষণা করেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এই পদক্ষেপের ফলে গোটা পুলিস ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক শোরগোল পড়ে গিয়েছে।
নির্যাতিতার মা রত্না দেবনাথের বিস্ফোরক বক্তব্য
সরকারের এই কড়া পদক্ষেপের পর মুখ খুলেছেন তিলোত্তমার মা-ও। তাঁর কণ্ঠে আজ সুবিচারের নতুন আশা। তিনি বলেন, 'একটি সুরক্ষিত জায়গায় এই ঘটনা ঘটেছিল। সেদিন রাতে ওরা ৫ জন একসঙ্গে ডিনার করেছিল। একজনকে ধরা হয়েছে, কিন্তু বাকি ৪ জনকে গ্রেফতার করলেই সব সত্যি বেরিয়ে আসবে। এবার একে একে সব মাথা ধরা পড়বে। আসল মাথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর নির্দেশেই সব হয়েছে। এবার তিনিও গ্রেফতার হবেন। আমি চাইব যে সমস্ত আইপিএসরা সাসপেন্ড হয়েছেন, তারা যেন সত্যি কথাটা জানান যে তারা কার নির্দেশে প্রমাণ লোপাটের চেষ্টা করেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ধন্যবাদ, আজকেও তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকেও ধন্যবাদ, তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন, সেইমতো কাজ হতে শুরু হয়েছে। ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়, বিনীত গোয়েল আগাগোড়া উপস্থিত ছিলেন এই কাণ্ডে। আমরা যখন হাসপাতালে ঢুকেছি তখন সেখানে বিনিত গোয়েল, সোফিয়া মুখার্জি আগে থেকেই সেখানে ছিলেন। প্রেস কনফারেন্স করে ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় বলে দিচ্ছিলেন বীরুপাক্ষ, অভীক, প্রসূন চট্টোপাধ্যায় এরা নাকি বিভিন্ন রকম এক্সপার্ট। ইন্দিরা মুখার্জি পুরো মিথ্যে কথা বলছিলেন। IPS অভিষেক আমাদের বাড়ি টাকা নিয়ে এসেছিলেন সেটেল করার জন্য। আমাদের এলাকার MLA,কাউন্সিলর-এরাই ডেকে এনেছিলেন টাকা দিতে। এই ঘটনার আসল মাথা এখনও বাকি। আসল মাথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায়। তাঁর বিনা অনুমতিতে কিচ্ছু হয়নি। আমার মেয়ের খুন, তথ্য লোপাট আর দ্র্রুত পুড়িয়ে দেওয়া-- সব মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায়ের কথাতেই। তাঁর কথা ছাড়া কিচ্ছু হতনা। উনি অপরাধীকে বাঁচানোর জন্য সব কিছু করেছেন। আমার মেয়ে স্বাস্থ্য দফতরের কর্মী ছিলেন। কেন ওঁকে এভাবে মারা হল? প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতার করলেই সব জানা যাবে। সেই রাতে আমার মেয়ের সঙ্গে যারা খাবার খেয়েছিল, তাদের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী আড়াল করে রেখেছেন। তাদের জেরা করলেই সব জানা যাবে। তারা কেউ সামনে আসেনি। সিবিআই আগে কাজ করছিল না। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে মিলে যোগসাজোস করেছিল। আমাদের লোকাল তৃণমূল নেতা নির্মল ঘোষ সব তথ্য প্রমাণ লোপাট করে দিয়েছে। কোনও মন্ত্রী মারা গেলেও এতো লোক থাকে না, আমার মেয়ের মৃতদেহ ঘিরে যত লোক ছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে সবকিছু হয়েছে। বীনিত গোয়েল যখন আমাদের সেমিনার রুমে নিয়ে গেলেন আমার মেয়ের মৃতদেহ দেখানোর জন্য, তখন ফোনে উনি অলরেডি একজনের সঙ্গে কথা বলছিলেন। পরে দেখলাম সেটা মমতা। আমাদেরও কথা বলালেন তখন। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে পুরো পরিকল্পনা কার। শ্মশানেও মমতার নির্দেশে সব হয়। এই দুর্নীতির জন্যই মানুষ তৃণমূলকে সরিয়েছে। সব অপরাধী এবার ধরা পড়বে।'
তাঁর এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, আরজি কর কাণ্ডে গণধর্ষণ ও বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের যে তত্ত্ব প্রথম থেকেই উঠে আসছিল, তা নিয়ে তিনি এখনও অনড়।
সাসপেন্ড তিন হেভিওয়েট অফিসার
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, আরজি কর কাণ্ডের সময় দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে তিন জন উচ্চপদস্থ অফিসারকে সাসপেন্ড করা হচ্ছে:
১. বিনীত গোয়েল: আরজি কর কাণ্ডের সময় তিনি কলকাতা পুলিসের কমিশনার পদে ছিলেন। বর্তমানে তিনি ডিজি-আইজি (IB) এবং ডিজিপি (ACB) পদে কর্মরত ছিলেন।
২. ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়: তৎকালীন সময়ে তিনি ডিসি সেন্ট্রাল পদে ছিলেন এবং বর্তমানে এসএস (CID) পদে কর্মরত।
৩. অভিষেক গুপ্ত: সেই সময় তিনি ডিসি নর্থ ছিলেন। বর্তমানে তিনি ডিআইজি পদমর্যাদার অফিসার হিসেবে সেকেন্ড ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন।
তদন্তের রাডারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, কেবল পুলিস অফিসাররাই নন, তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে। তিনি বলেন:
'তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর কোনও নির্দেশ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। ওই রাতে অফিসারদের সঙ্গে কার কার কথা হয়েছিল, তার ফোন কল রেকর্ড এবং হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট-- সবই একে একে বের করব। কোনও কিছুই ধামাচাপা থাকবে না।'
আন্দোলনের জয় নিয়ে কী বলছেন প্রতিবাদী ডাক্তাররা?
আরজি কর আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ কিঞ্জল নন্দ নতুন সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, 'নতুন মুখ্যমন্ত্রী ও সরকারকে ধন্যবাদ যে তাঁরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। আমাদের শুরু থেকেই দাবি ছিল—অপরাধী একজন না কি একাধিক? সেই সময় বিষয়টিকে গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, যা আজ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হচ্ছে।' আন্দোলনকারীদের মতে, এই সাসপেনশন আদতে তিলোত্তমার জন্য দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের প্রাথমিক জয়।
রাজনৈতিক প্রভাব
২০২৬ সালের নির্বাচনে আরজি কর ইস্যু এবং নারী নিরাপত্তা একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ক্ষমতায় আসার পর শুভেন্দু অধিকারী সরকারের এই 'অ্যাকশন' বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, পূর্ববর্তী সরকারের আমলের বিতর্কিত ইস্যুগুলোতে তাঁরা কোনও আপস করতে রাজি নন। পুলিস মহলে বিনীত গোয়েল বা অভিষেক গুপ্তর মতো অফিসারদের সাসপেনশন একপ্রকার নজিরবিহীন ঘটনা।
আরজি কর ফাইল আবার খুলে রাজধর্ম পালনের বার্তা দিতে চাইলেন কি বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী? ফোন কল রেকর্ড ও ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ সামনে এলে তৎকালীন শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কোনও যোগসূত্র পাওয়া যায় কি না, এখন সেটাই দেখার। নির্যাতিতার মা রত্না দেবনাথ ও তাঁর পরিবার এবং সাধারণ মানুষ এখন শুধু একটাই অপেক্ষায়-- সত্যিকারের অপরাধীরা কবে কাঠগড়ায় দাঁড়াবে কবে। আপাতত তিন আইপিএসের সাসপেনশন সেই সুবিচারের পথে প্রথম বড় পদক্ষেপ হিসেবেই ধরছে সকলে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)