Abhishek banerjee: বাংলার নির্বাচনী লড়াইয়ে অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের পালা চলতেই থাকে। তবে এবারের এই হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট বিতর্ক নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল। যদি এই স্ক্রিনশটগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হয়, তবে তা কমিশনের ভাবমূর্তির জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে।

রক্তিমা দাস: পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে শাসক দল এবং নির্বাচন কমিশনের সংঘাত নতুন কোনও ঘটনা নয়। তবে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা বাজার পর সেই দ্বৈরথ এক নজিরবিহীন মোড় নিল। তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রী রুজিরা বন্দ্যোপাধ্যায়কে 'বিশেষভাবে টার্গেট' করে তল্লাশি চালানোর জন্য নির্বাচন কমিশন ‘হোয়াটসঅ্যাপ’-এ নির্দেশ দিচ্ছে-- এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে জোড়ফুল শিবির। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভোটের মুখে বাংলার রাজনৈতিক পারদ এখন তুঙ্গে।
অভিযোগের কেন্দ্রে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট
তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সম্প্রতি কিছু হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের স্ক্রিনশট প্রকাশ করা হয়েছে। শাসক দলের দাবি, এই চ্যাটগুলোতে নির্বাচন কমিশন তার অধীনস্থ পুলিশ পর্যবেক্ষক, ব্যয় পর্যবেক্ষক এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীকে (CAPPF) সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দিচ্ছে। স্ক্রিনশট অনুযায়ী, তৃণমূলের অভিযোগ যে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়া দলের সমস্ত নেতা, মন্ত্রী এবং এমনকি তাঁদের পরিবারের সদস্যদের গাড়িতেও যেন পুঙ্খানুপুঙ্খ তল্লাশি চালানো হয়।
সবচেয়ে বিষ্ফোরক দাবি-- এই চ্যাটে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রীর নাম আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশনের সন্দেহ, অভিষেক পত্নীর মাধ্যমে টাকা পাচার হতে পারে— এমনটাই দাবি করেছে তৃণমূল। শাসক দলের প্রশ্ন, একটি সাংবিধানিক সংস্থা কীভাবে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতা বা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের এভাবে জনসমক্ষে ‘টার্গেট’ করতে পারে?

টাকা পাচারের অভিযোগ
তৃণমূলের প্রকাশিত ওই চ্যাটে দেখা যাচ্ছে, কমিশন পর্যবেক্ষকদের সতর্ক করেছে যে ঝাড়খণ্ড, বিহার এমনকি নেপাল সীমান্ত দিয়েও রাজ্যে টাকা ঢুকতে পারে। আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, নদীয়া, বসিরহাট, বনগাঁ, ক্যানিং, ডায়মন্ড হারবার, ফলতা এবং লালবাগের মতো এলাকাগুলোতে রক্তদান শিবির বা মেডিক্যাল ক্যাম্পের আড়ালে টাকা বিলি করা হচ্ছে। এই কারণে ওই সমস্ত স্বাস্থ্যশিবিরগুলোতেও তল্লাশি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে তৃণমূলের দাবি।
কমিশনের পক্ষ থেকে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীকে বলা হয়েছে, এই ধরনের ‘সারপ্রাইজ’ তল্লাশির ওপর কন্ট্রোল রুম থেকে সরাসরি নজরদারি চালানো হবে। তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি, পরাজয় নিশ্চিত জেনে বিজেপি নির্বাচন কমিশনকে শিখণ্ডী হিসেবে ব্যবহার করে এই ধরনের ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ চরিতার্থ করছে।
অভিষেক ও রুজিরাকে ঘিরে বিতর্ক
তৃণমূলের প্রকাশ করা স্ক্রিনশটে অভিষেকের নাম ইংরেজিতে দু’রকম ভাবে লেখা রয়েছে এবং নামের সঙ্গে কোনও পদবি নেই। যদিও তৃণমূল নিশ্চিত যে এটি তাদের দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ডকে উদ্দেশ্য করেই লেখা। চ্যাটে পরিষ্কার বলা হয়েছে, অভিষেক এবং তাঁর স্ত্রীর গাড়ি যেন কোনওভাবেই তল্লাশির আওতার বাইরে না যায়।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতোপূর্বেই জনসভা থেকে অভিযোগ করেছেন যে, কেন্দ্রীয় বাহিনী মহিলাদের ব্যাগ খুলে তল্লাশি চালিয়ে হেনস্থা করছে। এবার সেই অভিযোগের তালিকায় যুক্ত হল দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে থাকা গাড়িতে তল্লাশির বিষয়টি। তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের দাবি, ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াতে এবং প্রচারে বাধা দিতেই এই সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা।
কমিশনের অবস্থান
নির্বাচন কমিশন হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে নির্দেশ দেয়-- এই অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। এর আগেও একাধিকবার তৃণমূল কংগ্রেস এই বিষয়ে সরব হয়েছে।
কমিশন এর আগে সাফাই দিয়ে জানিয়েছিল যে, দ্রুত যোগাযোগের স্বার্থে এবং কাজের সুবিধার্থে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ব্যবহার করা হয়, এতে আইনত কোনও বাধা নেই। তবে এবারের বিতর্কের মাত্রা ভিন্ন কারণ এখানে সরাসরি নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের নাম করে ‘নেতিবাচক’ নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
কমিশন সূত্রে এখন পর্যন্ত এই নির্দিষ্ট স্ক্রিনশটগুলোর সত্যতা নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বয়ান পাওয়া যায়নি। তবে কমিশনের সাধারণ অবস্থান হল--অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের স্বার্থে যেকোনও সন্দেহভাজন গতিবিধির ওপর নজরদারি চালানো তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
প্রশাসনের রাশ বর্তমানে কমিশনের হাতে থাকায় তারা নিয়মমাফিক রদবদল এবং নজরদারি চালাচ্ছে বলেই আধিকারিকদের অভিমত।
রাজনৈতিক চাপানউতোর
তৃণমূলের মুখপাত্ররা সরব হয়ে বলছেন, 'কেন শুধুমাত্র তৃণমূল নেতাদেরই টার্গেট করা হচ্ছে? বিজেপি নেতাদের গাড়িতে কেন একইভাবে তল্লাশি চালানো হচ্ছে না?' তাঁদের মতে, গণতান্ত্রিক কাঠামোয় কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করে বিরোধী কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, বিরোধী শিবির তথা বিজেপির পক্ষ থেকে এই অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ এবং ‘ভোটের আগে সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা’ বলে অভিহিত করা হয়েছে।
তৃণমূলের অভিযোগ
বুথ এজেন্টদের গ্রেফতার করার নির্দেশ থেকে শুরু করে প্রচারের সময় নেতাদের হেনস্থা করা-- সবই এক বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ। ২৩ ও ২৯ এপ্রিলের হাই-ভোল্টেজ ভোটের আগে এই ‘স্ক্রিনশট বিতর্ক’ যে ভোটারদের মনে গভীর প্রভাব ফেলবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই বিষয়ে তৃণমূল জানিয়েছে যে, একটি উদ্বেগজনক বিষয় হলো টাকা পরিবহনে অভিষেকের স্ত্রীর জড়িত থাকা।অতএব আজ সমস্ত FST-দের এই সব চেকিংয়ে যুক্ত করতে হবে। তাদের সঠিকভাবে ব্রিফ করতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী (CM) ছাড়া, TMC-র সকল প্রোটেক্টি, তাদের মন্ত্রীসহ—অভিষেক ও তার স্ত্রীসহ—সবারই দিবালোকে সম্পূর্ণভাবে তল্লাশি করা আবশ্যক।
আজ FST-দের সঙ্গে CAPF-এর অতিরিক্ত দুটি সেকশন ও একজন AC দেওয়া যেতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ পর্যবেক্ষকের দ্বারা সরাসরি তদারকি করা হতে পারে। ব্যয় পর্যবেক্ষকদের (Expenditure observers) এই কাজে পুলিশ পর্যবেক্ষকদের সহায়তা করতে হবে। এই চেকিংগুলির জন্য সবাইকে একটি দল হিসেবে কাজ করতে হবে।
এই সব চেকিং কন্ট্রোল রুম থেকে মনিটর করা হবে। আমরা CEO-এর কন্ট্রোল রুম থেকেও এই চেকিংগুলি পর্যবেক্ষণ করব। আমরা প্রায়ই এই ধরনের আকস্মিক চেকিং চালিয়ে যাব।
বাংলার নির্বাচনী লড়াইয়ে অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের পালা চলতেই থাকে। তবে এবারের এই হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট বিতর্ক নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিল। যদি এই স্ক্রিনশটগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হয়, তবে তা কমিশনের ভাবমূর্তির জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে।
আর যদি এটি রাজনৈতিক অপপ্রচার হয়, তবে তৃণমূলকে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
আপাতত দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড়, আর সাধারণ মানুষ তাকিয়ে আছে কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। ভোটের ময়দানে এখন একটাই প্রশ্ন-- এই লড়াই কি কেবল রাজনৈতিক দলের মধ্যে, নাকি প্রশাসনের নিরপেক্ষতা বনাম অভিযোগের এক নতুন অধ্যায়?
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)