)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্য়ুরো: দিল্লিতে ইন্ডিয়া ব্লকের বৈঠকে যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্য়ায় ও অভিষেক বন্দ্য়োপাধ্যায় ব্যস্ত সেইসময় সেই বৈঠক থেকে একটু দূরেই ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে একজোট তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধী গোষ্ঠীর সাংসদরা। তৈরি করছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে রণনীতি। সূত্রের খবর ওই বৈঠকে ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী, বিপ্লব দেবরা। তবে এনিয়ে কোনও প্রকাশ্যে বিজেপির পক্ষ থেকে কিছু বলা হয়নি। কিন্তু তারপর যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। একের পর এক তৃণমূল সাংসদ ইস্তফা দিয়ে হাত-পা ঝাড়া হয়ে গিয়েছেন।
বিধানসভার ফলাফল বের হওয়ার পর প্রক্রিয়া শুরু হয় বিরোধী দলনেতা তৈরি করার। আর তা করতে গিয়েই এক ঝটকায় দলের ৫৯ বিধায়ক দলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যান। তার পর একের পর এক সাংসদ ইস্তফা দিচ্ছেন। প্রায় ভেঙে যাওয়ার মুখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরে ক্ষোভেই দল ছাড়ছেন বিধায়করা। দিল্লিতে তৃণমূল সাংসদদের এমন অবস্থা যে কে শেষপর্যন্ত থেকে যাবেন সেটাই একটা ভাবনার বিষয়। প্রথম সুখেন্দু শেখর রায়, তারপরে গতকাল সুস্মিতা দেব। আর আজ প্রকাশচিক বরাইক ও বেলা গড়াতেই কোয়েল মল্লিক ইস্তফা দিয়ে দিলেন।
বিধানসভায় যেতে গিয়েই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্য়ায় ও সন্দীপন সাহার কাছে জোর ধাক্কা খেয়ে যান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। সিপিএম থেকে তৃণমূলে আসা ঋতব্রতকে সাংবাদিক সম্মেলনে বলতে শোনা যায়, আমরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে। উনি আমাদের পরামর্শদাতা। প্রশ্ন উঠে যায়, তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে দলনেত্রী ছিলেন তার কী হল?
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতো দলটার ভেতরে যে এতটা ঘূণ ধরেছে তা আন্দাজ করতে পারেননি খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যা। পাশাপাশি একই অবস্থা অভিষেকেরও। বরং বলা যায় তিনি অত্য়াধিক আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়েছিলেন। তবে তৃণমূলের এই ভূমিধস পরিণতির পেছনে মূলত ৫ কারণকেই দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা।
কেলেঙ্কারির বন্যা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ, পৌরসভা নিয়োগ, রেশন কেলেঙ্কারি এবং কয়লা/গরু পাচারের মতো বিভিন্ন কেলেঙ্কারিতে তৃণমূলের একাধিক প্রভাবশালী নেতা, মন্ত্রী ও পদাধিকারী কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর (যেমন ইডি ও সিবিআই) তীব্র নজরদারি, তল্লাশি এবং গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হয়েছেন। মানুষ এইসব জিনিসকে একেবারেই ভালোভাবে নেননি।
স্বচ্ছ ভাবমূর্তি-র সংকট
যেসব প্রবীণ নেতা নিজেদের ইমেজ বা সামাজিক ভাবমূর্তি স্বচ্ছ রাখতে চান, তাঁদের জন্য এই দলের সঙ্গে থাকটা বিপদের হয়ে উঠেছিল। কেউ কেউ এই কেলেঙ্কারিগুলো মোকাবিলায় শীর্ষ নেতৃত্বের ভূমিকায় হতাশ হয়ে দল ছাড়ছেন,আবার কেউ কেউ আইনি জটিলতা নিজেদের গায়ে আঁচ লাগার আগেই দল থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।
অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের অভাব
তৃণমূলের প্রবীণ নেতাদের মধ্যে একটি বড় ক্ষোভ হল দলের অতিরিক্ত মমতা কেন্দ্রীক ব্যবস্থা। দলের কৌশল, টিকিট বণ্টন এবং সাংগঠনিক পদের মতো বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো শীর্ষ নেতৃত্ব এবং কিছু ক্ষেত্রে বাইরের রাজনৈতিক পরামর্শদাতাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা।
পুরনো বনাম নতুন প্রজন্মের দ্বন্দ্ব
দলের 'পুরনো কর্মী' এবং অভিষেকের কর্পোরেট ও ডেটা-নির্ভর রাজনীতির সাথে যুক্ত 'নতুন প্রজন্ম'-এর মধ্যে একটি স্পষ্ট টানাপোড়েন চলছে। প্রবীণ নেতারা প্রায়শই অনুভব করেন যে তাঁদের কোণঠাসা করা হচ্ছে, অবহেলা করা হচ্ছে বা তাঁদের প্রথাগত ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে দলে অভ্যন্তরীণ ভিন্নমত বা গণতান্ত্রিক আলোচনার কোনো জায়গা থাকছে না।
পরাজয়ের ধাক্কা
নির্বাচনে কোনো দল যখন অপ্রত্যাশিত ধাক্কা বা পরাজয়ের মুখোমুখি হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই একে অপরকে দোষারোপ করার খেলা শুরু হয়। এর ফলে সংগঠনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ফাটলগুলো প্রকাশ্যে চলে আসে। তৃণমূলের ক্ষেত্রে সেটাই হয়েছে। খারাপ ফল কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কর্তৃত্বকে দুর্বল করে দেয়। এমনটাই দেখা গিয়েছে ৫৮ বিধায়কের বিকল্প বিরোধী দলনেতাকে সমর্থন করার নজিরবিহীন ঘটনার মধ্যে দিয়ে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)