West Bengal SIR Tribunal: যেসব নাগরিকের নাম এসআইআর তালিকায় উঠছে না বা যাদের নাগরিকত্ব প্রশ্নাতীত নয় বলে মনে করা হচ্ছে, তাদের অভিযোগ বা আপিল শোনার জন্যই এই বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। মূলত যোগ্য কোনও নাগরিকের নাম যাতে ভোটার তালিকা থেকে অকারণে বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করতেই শীর্ষ আদালত এই বিশেষ বিচারবিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়।

জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: রাজ্যের SIR বা নাগরিকত্ব ও ভোটার তালিকা সংক্রান্ত যাচাই প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া মানুষদের জন্য গঠিত আপিল ট্রাইব্যুনালে কাজ শুরুর আগেই বড়সড় ধাক্কা।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত ১৯ সদস্যের শক্তিশালী বিচারবিভাগীয় প্যানেল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি তপেন সেন। তাঁর এই আকস্মিক পদত্যাগে আপাতত ১৮ জন বিচারপতির কাঁধে এসে পড়ল রাজ্যের ২৩টি জেলার আপিল নিষ্পত্তির ভার। গুরুত্বপূর্ণ এই বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ার শুরুতেই এমন পদত্যাগের ঘটনায় প্রশাসনিক মহলে তৈরি হয়েছে নতুন করে উদ্বেগ।
কী এই এসআইআর ট্রাইব্যুনাল?
যেসব নাগরিকের নাম এসআইআর তালিকায় উঠছে না বা যাদের নাগরিকত্ব প্রশ্নাতীত নয় বলে মনে করা হচ্ছে, তাদের অভিযোগ বা আপিল শোনার জন্যই এই বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছে। মূলত যোগ্য কোনও নাগরিকের নাম যাতে ভোটার তালিকা থেকে অকারণে বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করতেই শীর্ষ আদালত এই বিশেষ বিচারবিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়।
সুপ্রিম কোর্টের গাইডলাইন অনুযায়ী, সাপ্লিমেন্টারি বা অতিরিক্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পরপরই সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিরা এই ট্রাইব্যুনালে আবেদনের সুযোগ পাবেন।
বিচারপতি তপেন সেনের পদত্যাগ ও কারণ
ট্রাইব্যুনালের এই ১৯ জন বিচারপতির মধ্যে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি তপেন সেনকে। কিন্তু তিনি কলকাতা হাইকোর্ট প্রশাসনকে চিঠি পাঠিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের অব্যাহতি চেয়েছেন।
সূত্রের খবর, বিচারপতি সেন বর্তমানে ঝাড়খণ্ডের স্থায়ী বাসিন্দা। তিনি তাঁর চিঠিতে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, এই বয়সে ঝাড়খণ্ড থেকে কলকাতায় এসে এসআইআর-এর মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল একটি প্রক্রিয়ার কাজ পরিচালনা করা তাঁর পক্ষে কার্যত অসম্ভব।
বার্ধক্যজনিত শারীরিক সমস্যা ছাড়াও উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাবকেও তিনি অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন। বিচারপতি সেনের এই সরে দাঁড়ানোয় পূর্ব মেদিনীপুর জেলার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। হাইকোর্ট প্রশাসন এখন তড়িঘড়ি তাঁর শূন্যস্থান পূরণে নতুন কোনো অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির সন্ধান শুরু করেছে।
ট্রাইব্যুনাল গঠন
রাজ্যের ২৩টি জেলার দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল ১৯ জন প্রাক্তন বিচারপতি ও বিচারকের মধ্যে। এই তালিকায় রয়েছেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি টি. এস. শিবজ্ঞানম থেকে শুরু করে রঞ্জিত কুমার বাগ বা সমাপ্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো একাধিক ‘হেভিওয়েট’ নাম। দায়িত্ব প্রাপ্তদের তালিকাটি নিম্নরূপ:
নাম জেলা/এলাকা
১. টি. এস. শিবজ্ঞানম (প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি) উত্তর ২৪ পরগনা ও কলকাতা
২. প্রদীপ্ত রায় (প্রাক্তন বিচারক) উত্তর ২৪ পরগনা
৩. রঞ্জিত কুমার বাগ (অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি) দক্ষিণ ২৪ পরগনা
৪. সমাপ্তি চট্টোপাধ্যায় (অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি) হুগলি
৫. বিশ্বজিৎ বসু (অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি) মুর্শিদাবাদ
৬. দীপক সাহা রায় (প্রাক্তন বিচারক) উত্তরবঙ্গ (দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার)
৭. অনিন্দিতা রায় সরস্বতী (প্রাক্তন বিচারক) পশ্চিম মেদিনীপুর ও ঝাড়গ্রাম
৮. মহম্মদ মমতাজ খান (প্রাক্তন বিচারক) পুরুলিয়া ও বাঁকুড়া
৯. মীর দারা শেকো (প্রাক্তন বিচারক) পশ্চিম বর্ধমান
এছাড়াও কোচবিহার, নদীয়া, হাওড়া, দুই দিনাজপুর, বীরভূম ও মালদহের জন্যও আলাদাভাবে বিচারপতি নিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু তপেন সেনের পদত্যাগের পর বর্তমানে প্যানেলটি ১৮ জনের হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন উঠছে পরিকাঠামোগত প্রশ্ন?
বিচারপতি তপেন সেন তাঁর চিঠিতে ‘পরিকাঠামোগত সমস্যা’র কথা উল্লেখ করায় প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একটি ট্রাইব্যুনাল সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন নির্দিষ্ট অফিস, দক্ষ করণিক কর্মী এবং নথি সংরক্ষণের উন্নত ব্যবস্থা।
বিচারকদের একাংশ মনে করছেন, শুধুমাত্র বিচারপতি নিয়োগ করলেই হয় না, তাঁদের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা দিতে ব্যর্থ হলে এই প্রক্রিয়ায় দেরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
বিশেষত যখন ভোটার তালিকা বা এসআইআর-এর মতো বিষয় জড়িত, তখন মানুষের আবেগ ও আইনি অধিকারের প্রশ্নটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে দাঁড়ায়। লোকসভা বা বিধানসভা নির্বাচনের মুখে এই ধরনের তালিকার ভুলভ্রান্তি সংশোধন না হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
নাগরিক দুর্ভোগ
সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশের পরেই ট্রাইব্যুনালে আবেদন করা যাবে। কিন্তু শুরুতেই যদি এমন ‘ছন্দপতন’ হতে থাকে, তবে সাধারণ মানুষ সঠিক সময়ে বিচার পাবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
একদিকে রাজনৈতিক তরজা, অন্যদিকে বিচারপতির অভাব—দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে নাগরিক অধিকার রক্ষা যাতে দীর্ঘসূত্রিতার কবলে না পড়ে, সেটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
হাইকোর্ট প্রশাসন সূত্রে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে তপেন সেনের জায়গায় অন্য কাউকে নিয়োগ করা হবে। তবে যতদিন না এই শূন্যপদ পূর্ণ হচ্ছে, ততদিন পূর্ব মেদিনীপুরের নাগরিকদের আপিল প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তার মুখেই থাকছে।
এসআইআর ট্রাইব্যুনাল গঠন একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও, তার সুষ্ঠু রূপায়ন এখন হাইকোর্ট ও রাজ্য প্রশাসনের সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করছে। বিচারকদের ব্যক্তিগত সমস্যা বা পরিকাঠামোর অভাবকে ঢাল করে যদি আপিল প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, তবে তা সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের জন্য দুর্ভাগ্যের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)