)
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: মায়ানমারে (Myanmar) ভয়ংকর ঘটনা। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের (Buddhist Festival celebration) আলোর উৎসবে হঠাৎ চোখ ধাঁধানো আলো। আর তার পরেই প্রচণ্ড বিস্ফোরণ! গৃহযুদ্ধ বিধ্বস্ত মায়ানমারের সাগিয়াং প্রদেশে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় এ ভাবেই প্যারাগ্লাইডার বোমার (Military drops bomb from paraglider in Myanmar festival) হামলা চালিয়ে অন্তত ৪০ জন (40 death in myanmar festival) সাধারণ নাগরিককে মেরে ফেলল মায়ানমারের জুন্টা সরকারের (Myanmar Junta Government) সেনা। গুরুতর আহত আরও বেশি। ঘটনাচক্রে, হামলাকারী সেই সামরিক জোটও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদেরই! বৌদ্ধ উৎসবের মধ্যেই প্যারাগ্লাইডার থেকে এই বোমা হামলা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। সামরিক হামলা থেকে বেঁচে ফেরা ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন।
মায়ানমারের জুন্টাবিরোধী সংবাদমাধ্যম 'দ্য ইয়াওয়াডি' জানাচ্ছে, সোমবার রাতে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত সাগিয়াং প্রদেশের মধ্যাঞ্চলের চাউং উ টাউনশিপে (Chaung U township in central Myanmar on Monday evening) শত শত মানুষ থাদিংগ্যুত পূর্ণিমা উৎসবে (Thadingyut full moon festival) যোগ দিয়েছিলেন। সেখানেই প্যারাগ্লাইডার হামলা চালানো হয়। জমিতে লড়াই চালানো ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠায় গত কয়েক মাস ধরেই জুন্টা সেনার যুদ্ধবিমান ও প্যারাগ্লাইডার ব্যবহার করে আকাশপথে হামলা চালাচ্ছে বিদ্রোহীদের উপর। এ বার তারা ধর্মীয় উৎসবকেও ছাড় দিল না।
প্রত্যক্ষদর্শীরা কী জানাচ্ছেন?
নৃশংস হামলা থেকে বেঁচে ফেরা প্রত্যক্ষদর্শীরা তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। একজন বলেন, "কমিটি লোকজনকে সতর্ক করেছিল এবং ভিড়ের এক-তৃতীয়াংশ পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি মোটরচালিত প্যারাগ্লাইডার তাদের ঠিক মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় এবং শিশুরা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।" তিনি আরও বলেন যে বুধবার সকাল পর্যন্ত তারা মাটি থেকে মৃতদেহ সংগ্রহ করছিলেন, এবং শরীরের বিভিন্ন অংশ, যেমন মাংস ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, সম্পূর্ণ ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
আরেকজন উল্লেখ করেছেন যে তিনি যখন তার লোকদের দৌড়াতে বারণ করছিলেন, ঠিক তখনই প্যারামোটরটি দুটি বোমা ফেলে, যার ফলে তার চোখের সামনেই তার পরিচিত দুজনের মৃত্যু হয়।
মায়ানমারে গৃহযুদ্ধ:
প্রসঙ্গত, এর আগেও বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া রাখাইন প্রদেশে আরাকান আর্মির ঘাঁটির (Arakan Army (AA) bases in Rakhine State) এবং অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তঘেঁষা কাচিন প্রদেশে আর সশস্ত্র বিদ্রোহী বাহিনী ‘কাচিন ইন্ডিপেনডেন্স আর্মি' (Kachin Province bordering Arunachal Pradesh) (KIA)-র ডেরায় মায়ানমার সেনা প্যারাগ্লাইডার হামলা চালিয়েছিল। তাতেও সাধারণ নাগরিকদের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু এ বার সুনির্দিষ্ট ভাবে ধর্মীয় উৎসবকে আক্রমণের নিশানা করা হল! ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে মায়ানমারের তিন বিদ্রোহী গোষ্ঠী মিলে নতুন জোট ‘থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়্যান্স’ গড়ে সামরিক জুন্টার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছিল। সেই অভিযানের পোশাকি নাম ছিল ‘অপারেশন ১০২৭’। ‘আরাকান আর্মি’ (AA) এবং ‘তাঙ ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি’ (TNLA)-র পাশাপাশি সেই ত্রিদলীয় জোটের অন্যতম সহযোগী ছিল ‘মায়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আর্মি’ (MNDAA)।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিক্রিয়া কী?
এই হামলায় নারী ও শিশুসহ বহু নিরীহ নাগরিক হতাহত হয়েছেন। ঘটনার পর অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এর অন্যতম গবেষক জো ফ্রিম্যান বলেছেন, 'আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হয়তো মিয়ানমারের সংঘাতের কথা ভুলে গেছে, কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এই কম নজরদারির সুযোগ নিয়ে দায়মুক্তি সহ যুদ্ধাপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে।'
মায়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতা:
মায়ানমারে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে অস্থিতিশীলতা চলছে। সামরিক বাহিনী এবং গণতন্ত্রপন্থী বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘর্ষে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এই সাম্প্রতিক হামলাটি দেশের সংকটের একটি ভয়াবহ উদাহরণ।
তিনি অ্যাসোসিয়েশন অফ সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস (ASEAN)-কে মায়ানমারের জুন্টার উপর চাপ বাড়ানোর জন্য অনুরোধ করেছেন, কারণ এই মাসের শেষে ASEAN কর্মকর্তারা একটি বৈঠকের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সম্প্রতি এমএনডিএএ শান্তিচুক্তি করলেও পরবর্তী সময়ে জুন্টা-বিরোধী যুদ্ধে শামিল হওয়া ‘চিন ন্যাশনাল আর্মি’ (China National Army) এবং চায়নাল্যান্ড ডিফেন্স ফোর্স (Chinaland Defence Force), ‘কাচিন লিবারেশন ডিফেন্স ফোর্স’ (Chachin Liberation Defence Force) এবং সু চির সমর্থক স্বঘোষিত সরকার ‘ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট’ (National Unity Government)-এর সশস্ত্র বাহিনী ‘পিপল্স ডিফেন্স ফোর্স’ (Peopls Defence Force)-ও এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। বিদ্রোহীদের আক্রমণের মুখে সামরিক জুন্টা সরকার সম্প্রতি পার্লামেন্ট নির্বাচনের আয়োজন করে গণতন্ত্র পুনর্বহালের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু গৃহযুদ্ধের ইতি হয়নি এখনও।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)