)
সব্যসাচী চক্রবর্তী: শিবকে (Lord Shiva) ঘিরে কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ডে ঘোর উত্তেজনা (Thailand Cambodia Conflict), লড়াই-ঝগড়া? ঘটনা প্রায় তাই-ই! এর কেন্দ্রে রয়েছে প্রিয়াহ ভিহিয়ার বা প্রিয়া বিহার/বাইহার শিবমন্দির (The Preah Vihear Shiva temple)। সেটা ঘিরেই লড়াই। এরই জেরে কম্বোডিয়ায় ভয়ংকর হামলা করল থাইল্যান্ড (Thailand launches air attacks on Cambodia)। থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া দুদেশেরই এ বহু পুরনো বিবাদ। ম্যাপ-মন্দির নিয়ে মাঝে-মাঝেই ঝামেলা এখানে। কেন? মন্দিরকে কেন্দ্র করে কেন দুই দেশ নিজেদের মধ্যে জিইয়ে রেখেছে সংঘাতের আবহ? চোখ সরাতে হবে ইতিহাসের দিকে।
প্রিয়া বিহার/বাইহার মন্দির
প্রিয়া বিহার বা বাইহার মন্দির। দাংরেক পর্বতের উপরে এই শিবমন্দির। প্রাচীন স্থাপত্যের অনবদ্য নিদর্শন। সে কারণেই ইউনেসকোর তরফে এ মন্দিরকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তকমা দেওয়া হয়েছিল। তাতে আগুনে ঘি পড়েছিল আরও। গোসা হয়েছিল থাইল্যান্ডের। কারণ খাতায়-কলমে এই মন্দির কম্বোডিয়ায়। কিন্তু থাইল্যান্ডের দাবি, মন্দিরটি তাদের। ২০০৮ সাল থেকে ঝামেলা চলছে দুই দেশের মধ্যে।
হিন্দু-বৌদ্ধ বিরোধ
প্রিয়া বিহার মন্দিরটি প্রায় তিনশো বছর ধরে একটু একটু করে আজকের চেহারা পেয়েছে। খেমার রাজাদের রাজত্বের এই মন্দির হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। এই খেমার রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা রাজা দ্বিতীয় জয়বর্ধন। ভারতে যেমন বৌদ্ধধর্ম কোণঠাসা হয়ে হিন্দুধর্মের উত্থান ঘটেছিল, তেমনই দক্ষিণ-পূর্বে হিন্দুধর্মকে কোণঠাসা করে মাথাচাড়া দিয়েছিল বৌদ্ধধর্ম। এক অংশের মানুষ তাই বলে থাকেন, হিন্দু-মুসলিম বিরোধের চর্চা আছে, কিন্তু হিন্দু-বৌদ্ধ বিরোধের কোনও চর্চা নেই! এই প্রিয়া বিহার মন্দির হিন্দুদের হাত থেকে বৌদ্ধদের হাতে যায়। এবার এই মন্দির নিয়ে যুদ্ধের জিগির কম্বোডিয়া আর থাইল্যান্ডের।
ফ্রান্সের তৈরি ম্যাপেই কি বিরোধ-রেখা
কম্বোডিয়া থাইল্যান্ডের বিরোধ বহু প্রাচীন। আঠেরোশো শতকের। এককালের ফরাসি কলোনি কম্বোডিয়া। সীমান্ত নিয়ে অশান্তি এড়াতে এবং বিবাদ মেটাতে ফ্রান্সকে অনুরোধ করে তারা। সেই সময় থাইল্যান্ডের নাম ছিল সিয়াম। ১৯০৪-১৯০৭-- ফ্রান্স আর তৎকালীন সিয়ামের মধ্যে আলাপ-আলোচনার পরে তৈরি হল সীমান্তরেখা। ১৯০৮ সালে সিয়াম বা এখনকার থাইল্যান্ডের ম্যাপ প্রকাশ করে ফ্রান্স। ফ্রান্সের আঁকা সীমান্তরেখা গিয়েছে এই প্রিয়া বিহার মন্দিরের পাশ দিয়ে। থাইল্যান্ডের অভিযোগ, পাহাড়ের গা-ঘেঁষে এই সীমান্ত যাচ্ছিল, কিন্তু প্রিয়া বিহার মন্দিরের কাছে সে সীমান্ত পাল্টায়, মন্দির ঢুকিয়ে দেওয়া হয় কম্বোডিয়ায়। ঝামেলার সেই শুরু।
একযুগ পরে ফের!
১৯৫৩ সালে ফ্রান্সের হাত থেকে স্বাধীন হয় কম্বোডিয়া। তারপর প্রিয়া বিহার মন্দিরে সেনা মোতায়েন করে থাইল্যান্ড। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিসে মামলা করে কম্বোডিয়া। আদালত রায় দেয় কম্বোডিয়ার পক্ষে। রাগ বাড়ে থাইল্যান্ডের। প্রেস্টিজ ইস্যু হয়ে যায় হাজার বছরের পুরোনো মন্দির। ২০০৮ সালে দুই দেশের অশান্তি হয়। ২০১১ সালে মাসতিনেকের যুদ্ধ হয়। ২০১৩ সালের পরে মোটামুটি শান্তই ছিল পরিস্থিতি। কিন্তু প্রায় একযুগ পরে এবার, এই ২০২৫ সালে আবার!
কম্বোডিয়ায় বোমা-হামলা থাইল্যান্ডের
দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে গোলাবর্ষণের পরে কম্বোডিয়ায় বোমা হামলা চালায় থাইল্যান্ড। বৃহস্পতিবার ভোররাতে সীমান্তের বিরোধপূর্ণ অংশে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে তুমুল গোলাগুলি শুরু হয়। কম্বোডিয়ার সামরিক বাহিনীর ছোড়া রকেটের আঘাতে দুই থাই নাগরিক নিহত হয়েছেন। এর পরেই ওই অঞ্চলে ফাইটার জেট মোতায়েন করে থাই বাহিনী। কম্বোডিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেছে, থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার ভূখণ্ড জোর করে দখলের চেষ্টায় অতিরিক্তসংখ্যক সেনা মোতায়েন করেছে। সঙ্গে বিমান হামলা চালাচ্ছে। কম্বোডিয়ার মন্ত্রণালয় থাইল্যান্ডের এমন পদক্ষেপকে নৃশংস ও অবৈধ সামরিক আগ্রাসন এবং তা রাষ্ট্রসংঘের সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে। দেশটির আরও অভিযোগ, থাই যুদ্ধবিমান থেকে তাদের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডে দুটি বোমা হামলা চালানো হয়েছে। কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত এই থাই-হামলাকে সশস্ত্র আক্রমণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি বলেছেন, কম্বোডিয়া শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধানের পক্ষে, কিন্তু এই সশস্ত্র আক্রমণের বিরুদ্ধে বল প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানানো ছাড়া তাঁদের আর কোনো গত্যন্তর নেই। জানা গিয়েছে, সীমান্তলগ্ন ৮৬টি গ্রাম থেকে অন্তত ৪০ হাজার থাই বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)