Iran Protest: ১৯৭৯ সালে রাজাদের তাড়িয়ে ইরানি বিপ্লবের রূপকার খামেইনি এখন গণশত্রু! বিদ্রোহী মেয়েরাই শেষ করবে 'মোল্লাতন্ত্র'...
Iranian woman lighting cigarette from burning picture of the Ayatollah Khameini: ইরানি আইনে সর্বোচ্চ নেতার ছবি পোড়ানো একটি গুরুতর অপরাধ, অন্যদিকে নারীদের ধূমপানও ইরানে দীর্ঘদিন ধরে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই দুটি কাজ একত্রে করা এবং জনসমক্ষে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন অমান্য করার মাধ্যমে বিক্ষোভকারীরা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব এবং কঠোর সামাজিক নিয়ন্ত্রণকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন।
জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ইরানের কঠোর ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে (Iran's Islamic Act) বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এক নতুন এবং দুঃসাহসিক প্রতিবাদী ধারা (New Trend in Trend) শুরু করেছেন ইরানের মহিলারা। বর্তমানে ইরান জুড়ে চলা তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন কিছু ভিডিয়ো ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, ইরানি মহিলারা সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেইনির ছবি পুড়িয়ে সেই আগুন থেকে সিগারেট ধরাচ্ছেন (Iranian Women Lighting Cigarettes With Khamenei's Photo)। এই প্রতীকী প্রতিবাদ এখন কেবল ইরানের রাস্তায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং এক্স (টুইটার), ইনস্টাগ্রাম এবং টেলিগ্রামের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে এক ডিজিটাল গণজাগরণের রূপ নিয়েছে।
newsTRENDING NOW
মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশে অতীতে সর্বোচ্চ নেতার ছবি পোড়ানোর দায়ে কঠোর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। 'ইরান ওয়্যার'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর নভেম্বরে এক মানবাধিকারকর্মী খামেইনির ছবি পোড়ানোর ভিডিয়ো শেয়ার করার পর নিরাপত্তা বাহিনী তার বাড়িতে হানা দেয়, যার ফলে ওই ব্যক্তি আত্মগোপন করতে বাধ্য হন।
ইরানি আইনে সর্বোচ্চ নেতার ছবি পোড়ানো একটি গুরুতর অপরাধ, অন্যদিকে নারীদের ধূমপানও ইরানে দীর্ঘদিন ধরে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই দুটি কাজ একত্রে করা এবং জনসমক্ষে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন অমান্য করার মাধ্যমে বিক্ষোভকারীরা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব এবং কঠোর সামাজিক নিয়ন্ত্রণকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন।

কেন এই প্রতিবাদ এতটা তাৎপর্যপূর্ণ?
ইরানের আইনে সর্বোচ্চ নেতার ছবি পোড়ানো বা অবমাননা করা একটি গুরুতর অপরাধ, যার শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে, ইরানি সমাজে নারীদের প্রকাশ্যে ধূমপান করা দীর্ঘদিন ধরে সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত এবং অনেক ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ। বিক্ষোভকারী নারীরা এই দুটি কাজ একত্রে করার মাধ্যমে একইসঙ্গে দুটি বার্তা দিচ্ছেন:
রাজনৈতিক অবাধ্যতা: খামেনির ছবি পুড়িয়ে তাঁরা সরাসরি রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় কর্তৃত্বকে অস্বীকার করছেন।
সামাজিক সংস্কার: জনসমক্ষে ধূমপান এবং হিজাব আইন অমান্য করে তাঁরা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর আরোপ করা কঠোর সামাজিক শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার ঘোষণা দিচ্ছেন।
মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের মান রেকর্ড ভেঙে ১৪ লাখে নেমে আসা এই বিক্ষোভের মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। বর্তমানে ইরানে মুদ্রাস্ফীতি ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, খাদ্যপণ্যের দাম গত বছরের তুলনায় ৭০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে এবং মানুষের মজুরি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।

আন্দোলনের মূলে চরম অর্থনৈতিক সংকট
২০২২ সালে মাহসা আমিনীর মৃত্যুর পর শুরু হওয়া ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের রেশ কাটতে না কাটতেই এই নতুন দফার বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। তবে এবারের আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হলো ইরানের নজিরবিহীন অর্থনৈতিক বিপর্যয়।
মুদ্রাস্ফীতি: ইরানে বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতির হার ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
মুদ্রার মান: মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের মান রেকর্ড ভেঙে ১৪ থেকে ১৫ লাখে নেমে এসেছে।
দ্রব্যমূল্য: গত এক বছরে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি। বিক্ষোভকারীরা বলছেন, যখন সাধারণ মানুষের জীবনধারণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে, তখন শাসকের ক্ষমতার দম্ভ অর্থহীন।
২০২২-২৩ সালে সঠিক পোশাকবিধি না মানার অভিযোগে পুলিশি হেফাজতে থাকা মাহসা আমিনীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ হয়েছিল, বর্তমানের এই গণবিক্ষোভ তারপর থেকে দেখা হওয়া সবথেকে বড় প্রতিবাদ।
আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে যে বর্তমান অস্থিরতার মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালিয়েছে, যাতে অন্তত ৬২ জন নিহত হয়েছেন।

রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও হতাহত
ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বালুচ সুন্নি সংখ্যালঘুদের ওপর নজরদারি করা মানবাধিকার গোষ্ঠী 'হালভাশ' (Haalvsh) জানিয়েছে, সিস্তান-বালুচিস্তান প্রদেশের প্রধান শহর জাহেদানে শুক্রবারের নামাজের পর বিক্ষোভকারীদের ওপর নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালায়। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটলেও সঠিক সংখ্যা এখনও জানা যায়নি।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি ইরানকে
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, মনে হচ্ছে ইরানের নেতারা "বড় বিপদে" আছেন।
ট্রাম্প বলেন, "আমার কাছে মনে হচ্ছে যে মানুষ এমন কিছু শহর দখল করে নিচ্ছে যা মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও কেউ সম্ভব বলে ভাবেনি।" তিনি আরও যোগ করেন যে, যদি ইরানের সামরিক বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায়, তবে আমেরিকাও তাদের ওপর গুলি চালাবে। ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি— "তোমাদের গুলি না চালানোই ভালো, কারণ তোমরা গুলি চালালে আমরাও গুলি চালানো শুরু করব।"

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, গত কয়েকদিনের বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ৬২ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। বিশেষ করে সিস্তান-বালুচিস্তান প্রদেশের জাহেদানে শুক্রবারের নামাজের পর মিছিলে নিরাপত্তা বাহিনী সরাসরি গুলি চালালে বহু মানুষ হতাহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরান সরকার দেশজুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা প্রায় বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, যাতে বিক্ষোভের ছবি ও ভিডিয়ো বিশ্বের কাছে পৌঁছাতে না পারে।

ডিজিটাল প্রতিরোধ: দমানো যাচ্ছে না কণ্ঠস্বর
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট সত্ত্বেও ইরানি নারীদের এই প্রতিবাদী ভিডিওগুলো এখন বৈশ্বিক ফেনোমেনন। বিশ্লেষকদের মতে, রাজপথের বড় মিছিলগুলোকে সরকার বন্দুকের নলে দমন করতে পারলেও, এই ধরণের ছোট ছোট প্রতীকী প্রতিবাদ যা দ্রুত অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে, তা নিয়ন্ত্রণ করা তেহরানের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
২০২২-এর আন্দোলনের পর থেকে ইরানের নারীরা যেভাবে অকুতোভয় হয়ে উঠেছেন, খামেনির ছবি দিয়ে সিগারেট ধরানোর এই নতুন ট্রেন্ড সেই প্রতিরোধেরই এক চরম বহিঃপ্রকাশ। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে—এই প্রতীকী আগুন ইরানের ক্ষমতা কাঠামোর মূলে কত বড় ধাক্কা দেয়, তা দেখার জন্য।

(দেশ, দুনিয়া, রাজ্য, কলকাতা, বিনোদন, খেলা, লাইফস্টাইল স্বাস্থ্য, প্রযুক্তির টাটকা খবর, আপডেট এবং ভিডিয়ো পেতে ডাউনলোড-লাইক-ফলো-সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের App, Facebook, Whatsapp Channel, X (Twitter), Youtube, Instagram পেজ-চ্যানেল)
Nabanita Sarkar
সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর। সংবাদ মাধ্যমের পাশাপাশি রাজনৈতিক পরামর্শদাতাদাতা হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা। আইন-আদালত থেকে বিনোদন, দেশ থেকে দুনিয়ার হরেক খবরে শেখার চেষ্টা অবিরাম...
...Read More