নিজস্ব প্রতিবেদন : ১৯৩০ সালে বিশ্বকাপের শুরু। আর ২০১৪ সাল পর্যন্ত ২০টি বিশ্বকাপের ৮৩৬টি ম্যাচের ইতিহাস খুঁজতে গেলে দেখা যাবে এমন কিছু ম্যাচ যা সারা জীবন মানুষের মনে থাকবে। সেই সব ম্যাচ রিওয়াইন্ড করলে এখনও কারোর কারোর মনে পড়ে যাবে ম্যাচের পরতে পরতে জড়িয়ে থাকা শিহরণের কথা, কিংবা একটা গোল কিংবা একটা সেভ কী ভাবে রঙ বদলে দিয়েছিল।


COMMERCIAL BREAK
SCROLL TO CONTINUE READING

# ইতালি বনাম পশ্চিম জার্মানি, সেমি ফাইনাল, ১৯৭০


১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ইতালি বনাম পশ্চিম জার্মানির সেমি ফাইনাল ম্যাচটিকে বহু ফুটবল পন্ডিতই বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা ম্যাচ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মেক্সিকো সিটির আজটেক স্টেডিয়ামে ম্যাচের ৮মিনিটের মধ্যেই বোনিনসিঙ্গা গোল করে এগিয়ে দিলেন ইতালিকে। দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি ইতালির ফাউলে কাঁধের হাড় ভেঙে গেল বেকেনবাউয়ারের। তবু মাঠ ছেড়ে না উঠে লড়াই চালিয়ে গেলেন তিনি। এবং কী আশ্চর্য, ম্যাচ যখন ইতালি জিতেই গেছে ধরে নেওয়া হচ্ছে তখনই জার্মানির গোল শোধ ৯০মিনিটে। সেলিঙ্গার গোল করে ম্যাচ ১-১ করে দিলেন।



অতিরিক্ত সময়ে (৩০ মিনিটে) হল ৫ গোল। এটাও বিশ্বকাপে রেকর্ড। ৯৪ মিনিটে গার্ড মুলার গোল করে এগিয়ে দিলেন পশ্চিম জার্মানিকে। ৯৮ মিনিটে গোল শোধ করে দিলেন ইতালির বার্গনিচ। এর ৬মিনিট পরেই লুইগি রিভা আবার গোল করলে এগিয়ে ইতালি এগিয়ে গেল ৩-২। ১১০ মিনিটে আবার গোল করলেন গার্ড মুলার। ম্যাচ এবার ৩-৩। কিন্তু পরের মিনিটেই রিভেরা গোল করায় ইতালি ৪-৩ গোলে জিতে গেল  এবং ফুটবল দুনিয়া পেয়ে গেল বিশ্বকাপের সবচেয়ে স্মরণীয় ম্যাচটি।


******************************************************************


******************************************************************


# পশ্চিম জার্মানি বনাম ফ্রান্স, সেমি ফাইনাল, ১৯৮২


১৯৮২ সালে স্পেন বিশ্বকাপের সেমি ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল পশ্চিম জার্মানি ও ফ্রান্স। মাদ্রিদের এই ম্যাচে জার্মানরা ১৭ মিনিটেই এগিয়ে যায় লিটবারেস্কিরর গোলে। ২৬ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে সমতা ফেরান মিশেল প্লাতিনি। দ্বিতীয়ার্ধেও ম্যাচ তখন ১-১। হঠাত্ই প্লাতিনি মাঝমাঠের ডান দিক থেকে বল রাখলেন বিপক্ষ রক্ষণের ফাঁকা জায়গায়। কেন ? কার জন্য ? জার্মান রক্ষণ বোঝার আগেই যেন টেলিপ্যাথিক যোগাযোগে বাতিস্তঁ পৌঁছে গেলেন। ওদিকে গোল ছেড়ে ততক্ষণে বেরিয়ে এসেছেন শুমাখার। বাতিস্তঁই আগে পৌঁছলেন। বাঁ পায়ের আগুয়ান শটে গোলরক্ষকের পাশ দিয়ে জালে রাখার চেষ্টা করলেন। একটুর জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট। কিন্তু বাতিস্তঁ বলে শট করেছে দেখে রাগে শুমাখার লাফিয়ে, ঝাঁপায়ে পড়লেন বাতিস্তঁর ওপরে। তিন মিনিট জ্ঞানহীন অবস্থায় পড়ে ছিলেন বাতিস্তঁ। যা ডাচ রেফারি কর্ভার দেখতেও পাননি। সহকারি রেফারি কোনও পরামর্শ দেননি। পরিষ্কার লাল কার্ড এবং পেনাল্টি- কিন্তু কিছুই হল না।



নিয়মিত সময়ে ম্যাচ ১-১। অতিরিক্ত সময়ে ট্রেস এবং গিয়েস ফ্রান্সকে এগিয়ে দিলেও রুমেনিগে এবং ফিশার গোল করে ম্যাচ ৩-৩ করে দিলেন। এরপর টাইব্রেকারে ৪-৪। সাডেন ডেথে জার্মানি গোল করলেও ব্যর্থ হল ফ্রান্স। ৫-৪ গোলে জিতে বিশ্বকাপের ফাইনালে চলে গেল পশ্চিম জার্মানি।


******************************************************************


******************************************************************


# আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড , কোয়ার্টার ফাইনাল, ১৯৮৬


১৯৮৬ সালে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচটি বিশ্বকাপের ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে শুধুমাত্র দিয়েগো মারাদোনার জন্য। আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে ইংল্যান্ড, ফকনার যুদ্ধ, মারাদোনার দেশের সংবাদমাধ্যমের ফিরে আসা, জুনটা প্রজন্ম যেন দেশাত্মবোধের আবেগ, ইংরেজ প্রচারমাধ্যমেও যুদ্ধের আবহ। তিউনিশিয়ার আলি বেন নাসের ছিলেন বাঁশি মুখে। পোল্যান্ড আর প্যারাগুয়েকে হারিয়ে ববি রবসনের দল উঠেছিল শেষ আটে। ৫১ মিনিটে হজ নিজেদের পেনাল্টি বক্সের দিকে তুলে দিয়েছিলেন বল। মারাদোনা এবং শিল্টন দু'জনেই লাফালেন। দেখা গেল বল জালে, মুষ্টিবদ্ধ হাত নিয়ে নিজেদের দর্শকদের দিকে গিয়ে নাচছেন মারাদোনা আর শিল্টন-হডল তখন রেফারির কাছে গিয়ে নালিশ জানাচ্ছেন। এত দ্রুত ঘটেছিল যে শিল্টন সবচেয়ে কাছে ছিলেন আর হডল ঠিক পিছনে ছিলেন বলে বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে মারাদোনার 'হ্যান্ড অব গড' ইতিহাসে।



তার ঠিক চার মিনিট পরের যে গোল, তা তো ইতিহাসই। নিজেদের অর্ধে বল ধরে ইংল্যান্ডের চার ফুটবলারকে মানে বিয়ার্ডসলে,রিড, বুচার এবং ফেনউইককে পেরিয়ে পিটার শিল্টনকে কাটিয়ে জালে বল। ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডাররা তখন আগের 'গোল চুরির' ঘটনায় মর্মাহত ছিলেন। এবার সকলেই মারাদোনা ম্যাজিকে সম্মোহিত। ম্যাচটা ততক্ষণে ইতিহাসে চলে গেছে। তাই ৮১ মিনিটে গ্যারি লিনেকার গোল করে যখন ব্যবধান কমালেন তা নিয়ে অবশ্য কারোর হেলদোল ছিল না।


******************************************************************


******************************************************************


# ব্রাজিল বনাম হল্যান্ড, কোয়ার্টার ফাইনাল, ১৯৯৪


১৯৯৪ সালে আমেরিকা বিশ্বকাপে ব্রাজিল-হল্যান্ড ম্যাচটাও ছিল উত্তেজনার বারুদে ঠাসা। কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচ হয়েছিল ডালাসের কটন বল স্টেডিয়ামে। দু'দলেই তখন অনেক তারকা ফুটবলার। ব্রাজিলে রোমারিও, বেবেতো, দুঙ্গা এবং নির্বাসিতচ লেফট ব্যাক লিওনার্দোর বদলে বুড়ো ব্র্যাঙ্কো। প্রথমার্ধ গোলশূন্য।  দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই বেবেতোর পাস থেকে রোমারিওর গোল। এর একটু পরে বেবেতো যখন ব্রাজিলের হয়ে দ্বিতীয় গোলটি করছেন তখন রোমারিও অফ সাইডে থেকে ডাচ গোলকিপার ডি গোয়ের চোখের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ২ গোলের খোঁচা খেয়ে হল্যান্ড ম্যাচে ফিরল বার্গক্যাম্পের দুরন্ত গোলে।অদ্ভুত দক্ষতায় বুক দিয়ে বল নামিয়ে তাফারেলকে পরাস্ত করলেন তিনি। আর ৭৬ মিনিটে কর্নার থেকে হেডে গোল করে ডাচদের সমতায় ফেরালেন অ্যারন উইন্টার। ম্যাচ তখন ২-২।



কিন্তু ব্র্যাঙ্কোর ফ্রি কিকে যে অত জাদু কে বা তা জানত ! সাত জনের গড়া ডিফেন্সিভ পাঁচিলের মধ্যে দিয়ে ব্র্যাঙ্কোর ফ্রি কিক ব্রাজিলকে নিয়ে গেল সেমিফাইনালে। আরও একটা অসাধারণ ম্যাচ দেখল ফুটবল বিশ্ব। ১৯৭০ সালের পর আবার বিশ্বকাপের শেষ চারে সাম্বার দেশ। 


******************************************************************


******************************************************************


 # দক্ষিণ কোরিয়া বনাম ইতালি, রাউন্ড অব সিক্সটিন, ২০০২


২০০২ সালের বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়া দারুণ খেলে হারিয়ে দিল তখন পর্যন্ত তিন বারের চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে। নিজেদের দেশে খেলা, কোরীয়রা পেয়েছিল প্রবল জনসমর্থক। সেই সঙ্গে কোচ গাস হিডিঙ্ক দুঁদে ট্যাকটিসিয়ান। ৪ মিনিটের মধ্যেই নিজেদের বক্সে ইতালির পানুচ্চি ফাউল করলেন।নিশ্চিত পেনাল্টি দিলেন রেফারি। কিন্তু আন জুন হাং পারলেন না বুফোঁকে পরাস্ত করতে। ১৮ মিনিটে তোত্তির কর্নার থেকে ভিয়েরি এগিয়ে দিলেন ইতালিকে। এরপর তোত্তি, ভিয়েরি, দেল পিয়েরোদের সুযোগ নষ্টের প্রদর্শনী। উল্টোদিকে ৮৮ মিনিটে সিওলের গোলে সমতা ফেরায় দক্ষিণ কোরিয়া। ম্যাচ গড়াল অতিরিক্ত সময়ে। ভিয়েরির গোল অফ সাইডের কারণে বাতিল করলেন রেফারি। তোত্তিকে ফাউল করা হল বক্সে। রেফারি ডাইভিংয়ের অপরাধে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখিয়ে বের করে দিলেন তোত্তিকে।



১১৬ মিনিটে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আন জাং হুয়াং করলেন সোনালি গোল। বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিল ইতালি। ঘটনাচক্রে এই আন তখন খেলতেন ইতালির সিরি-আ তে পেরুজিয়া ক্লাবে। পেরুজিয়ার প্রেসিডেন্ট তো বলেই দিয়েছিলেন যে আর আনকে ক্লাবে রাখা হবে না। পরে অবশ্য সিদ্ধান্ত বদলায়, ততদিনে ম্যাচটা চলে গেছে বিশ্বকাপের ইতিহাসে।


******************************************************************


******************************************************************


# ব্রাজিল বনাম জার্মানি, সেমি ফাইনাল, ২০১৪


২০১৪ সালে ঘরের মাঠে বিশ্বকাপে সেমি ফাইনালে নেইমারহীন ব্রাজিল নামল জার্মানির বিরুদ্ধে খেলতে। কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে চোট পাওয়া নেইমার না থাকুক, বেলো হরাইজন্তের এস্তাদিও মিনেইরো স্টেডিয়ামে ব্রাজিলিয়দের প্রবল জনসমর্থন তো ছিলই। কিন্তু অতি বড় ব্রাজিল সমর্থকও বোধ হয় এমনটা আশা করেন নি। ৩০ মিনিটের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ৫ গোল হজম করে ফেলল ব্রাজিল। আধঘন্টায় যেন রোলার কোস্টারে সেলেকাওদের পিষে দিল হিটলারের দেশ। ১১ মিনিটে গোলবণ্যার শুরুটা করলেন টমাস মুলার। ২৩ মিনিটে মিরোস্লাভ ক্লোজের গোল। ২ মিনিটের ব্যবধানে জোড়া গোল করলেন টনি ক্রুস। দাভিদ সিলভা, দান্তে, মার্সেলো, মাইকনরা তখন দিশেহারা। এসবের মাঝেই ২৯ মিনিটে স্যামি খেদিরার গোলে জার্মানি এগিয়ে গেল ৫-০ গোলে।   



বিরতির পর আবার শুরলে ম্যাজিক। ১০ মিনিটের ব্যবধানে জোড়া গোল করলেন আন্দ্রে শুরলে। গোল সংখ্যা আরও বাড়াতে পারত জার্মানি। বেশ কয়েকটি সহজ সুযোগ হাতছাড়া করে ওজিলরা। ম্যাচের শেষ লগ্নে অস্কারের স্বান্তনার গোল। ততক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। দেশের মাটিতে লজ্জার হার পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। ফাইনালে চলে গেল জার্মানি। ২০১৪ সালের ৮ জুলাই দিনটিকে দ্রুত ভুলতে চাইবেন ব্রাজিলিয়রা। কিন্তু ভোলা কি অতই সহজ। জার্মানদের সেই পরাক্রমী জয় এখনও চোখে ভাসছে ফুটবল বিশ্বের।