রণিতা গোস্বামী


COMMERCIAL BREAK
SCROLL TO CONTINUE READING

প্রতি মুহূর্তেই সমাজ বদলাচ্ছে, পাল্লা দিয়ে বদলাচ্ছে চারপাশের মানুষ। চেনা মানুষও ধীরে ধীরে অচেনা হয়ে যাচ্ছে। যাঁর কাছে ক্ষমতা, সেখানেই যত লোকজনের উঁকি ঝুঁকি। অন্তরের ভালোবাসা এখন ব্রাত্য, তবে আলগা পিরিত করার লোকের অভাব নেই। মূল্যবোধ নিপাত যাক, 'ধান্দাবাজি'টাই আসল সত্যি। রাজনৈতিক জগৎ তো দূরের কথা, কাছের সম্পর্কগুলির রন্ধ্রে রন্ধ্রেও এই 'ধান্দাবাজি'টা ঢুকে গিয়েছে। কে কতটা বিখ্যাত 'ধান্দাবাজ' হয়ে নিজেরটা বাগিয়ে নিতে পারেন, চারপাশে তারই প্রতিযোগিতা। এইসব থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখে উদাসীন থাকা সত্যিই হয়ত মুশকিল। নিজেদের চেহারার খুঁতগুলি ঢাকতে অনেকেই মেকআপ লাগাতে পছন্দ করেন, অন্দরের স্বার্থপরতাকে ঢাকতে ভালোবাসাটাও যেন শুধুই প্রসাধনী হয়েই থেকে যায়। 'বরুণবাবুর বন্ধু'তে সেই সমস্ত মানুষগুলিকেই যেন প্রসাধন ছাড়া আয়নার সামনে দাঁড় করালেন পরিচালক অনীক দত্ত।


পরিচালক কি পারলেন ঢিলটা ঠিক জায়গায় মারতে? সেকথা বুঝতে গেলে আরও কিছুদিন, ছবিটা আরও বেশি দর্শকদের দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হচ্ছে। Zee ২৪ ঘণ্টা ডিজিটালকে পরিচালক ছবিটিকে তাঁর চোখে সমাজকে 'পর্যবেক্ষণ' বলেই উল্লেখ করেছিলেন। আবার, 'বরুণবাবুর বন্ধু' কি রাজনৈতিক ছবি? উত্তর দিতে গিয়ে অনীক দত্তের পাল্টা প্রশ্ন ছিল রাজনীতির বাইরে গিয়ে কি সত্যিই কিছু হয়?


আরও পড়ুন-কোপে পড়লে বুঝতে হবে, ঢিলটা ঠিক জায়গায় পড়েছে : অনীক দত্ত


'বরুণবাবুর বন্ধু' দেখার পর পরিচালক অনীক দত্তের সেই কথাগুলিই মাথায় ঘুরতে থাকলো। ছবিটি দেখতে দেখতে বর্তমান বদলে যাওয়া সমাজকেই বরুণবাবুর পরিবার ও তার চারপাশের চরিত্রগুলির মধ্যে দেখতে পেলাম। দেখা গেল বদলে যাওয়া শহর কলকাতার একটুকরো ছবি। একটা বড় পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কে বন্ধনে যে রাজনীতি লুকিয়ে থাকে সেই চেনা ছবিটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন পরিচালক। পুরো বিষয়টা এতটাই বাস্তব, যে কোথাও নিজের চেনা ছকে মিলিয়ে নিতে অসুবিধা হয়না। আবার ডিএ না পাওয়া নিয়ে কিছু সরকারি কর্মচারীর মনের ক্ষোভ, ছাত্র আন্দোলন, সহ ছোট ছোট সাম্প্রতিক ইস্যুগুলি ছবি থেকে বাদ পড়েনি। উঠে এসেছে ৭৫এর  জরুরী অবস্থার একটি প্রেক্ষাপটও। উঠে এসেছে সমসাময়িক কিছু রাজনৈতিক চরিত্র। 



অনীক দত্ত বলেছিলেন, সিনেমা যে সময়ের পটভূমিতে বানানো সেসময়ের রাজনৈতিক অবস্থা সেখানে উঠে আসতে বাধ্য, যদি না জোর করে না এড়িয়ে যেতে হয়। বরুণবাবুর মতো মানুষ ও তাঁর মূল্যবোধ, মানুষগুলির রাজনৈতিক চেতনা ও বিশ্বাস। যা বরুণ মতো মানুষগুলির সঙ্গে সঙ্গে এই সমাজ থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য আলাদা হওয়া সত্ত্বেও বরুণবাবুর ছেলেবেলার বন্ধুর প্রতি টান, ভালোবাসায় একটুও বদল হয় না। আবার ক্ষমতাবান বন্ধুকে প্রয়োজনে কাজে লাগানোর কথা কখনও ভাবনাতেও আসেনা তাঁর। তবে শুধু রাজনৈতিক পরিসর, বন্ধুত্বে নয়, দীর্ঘদিন ধরে বিছানায় পড়ে থাকা স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব পালনেও বরুণবাবু নিষ্ঠাবান। নিজের মূল্যবোধের বাইরে বের হতে নারাজ। আর এই গোঁয়ার্তুমির জন্যই ছেলেমেয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও বিশেষ মধুর নয়। তবে ছোট্ট নাতির সঙ্গে তাঁর মতো করেই দিব্য ভাব জমিয়েও ফেলতে পারেন বরুণবাবু। মৃত্যুর পর মানুষ নাকি 'তারা' হয়ে যায়, কিংবা ভালো লোকেরা স্বর্গে যায়, আর খারাপ লোকেরা...। শুধুমাত্র ছোট বলেই নাতিকে এধরনের আজগুবি কথা বলতে নারাজ বরুণবাবু। আবার, ছোট্ট শিশুর মনে ধর্ম নিয়ে কোনও ভুল ধারনা গেঁথে দিতেও চান না তিনি। নাতির সঙ্গে আপনি করে বরুণবাবু কথাবার্তা, ধান্দাবাজির বাইরে বের হয়ে নিষ্পাপ সম্পর্কের বন্ধন বেশ মন কাড়ে। 


বরুণবাবুর মত মানুষরা যে সত্যিই হারিয়ে যাচ্ছেন, একথা ভাবলে ক্ষণিক কষ্ট হলেও ছবিটি দেখতে দেখতে তিক্ত বাস্তবটাই সামনে এসে দাঁড়ায়। আর এই রকম মানুষগুলি হারিয়ে যাচ্ছে বলেই বোধহয়, বর্তমান সমাজের মেরুদণ্ডটাও আজ এতটা নড়বড়ে। 'ধান্দাবাজি'তে ভরে যাওয়া সমাজ, রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতাও তাই হারাচ্ছে।  




ছবির ডায়ালগ এক্কেবারেই যথোপযুক্ত। আবার অকারণ টেনেটুনে ছবিটি বাড়ানোর চেষ্টাও করেননি পরিচালক। অনীক দত্তের ছবিতে 'বরুণবাবু' চরিত্রটি আরও বেশি বিশ্বাসযোগ্য যদি হয়ে থাকে তা হয়ত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্যই। তবে আবার পরাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মাধবী মুখোপাধ্যায়, অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়, বিদীপ্তা চক্রবর্তী, ঋত্বিক চক্রবর্তী, কৌশিক সেন, দেবলীনা দত্ত, চান্দ্রেয়ী ঘোষের জন্যই বরুণবাবুর চারপাশে চরিত্রগুলি বর্তমান সমাজের পারিপার্শ্বিক ছবিটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ছবিতে বিদীপ্তা চক্রবর্তীর গাওয়া খালি গলায় গানটিও ছবির মতোই প্রাসঙ্গিক। সেখানে বাণিজ্যিক ছবির মতো খালি গলার গানে কোনও অতিরিক্ত মিউজিকের বোঝা নেই।


ট্রেলারে অবশ্য ছবির গল্প কিছুটা আন্দাজ করা গিয়েছিল। তবে পরিচালকের আগেই ছবিগুলির মতোই এই ছবিটিও যে বেশ সাহসী তা বলাই বাহুল্য। 'ভুতের ভবিষ্যৎ' থেকে 'ভবিষ্যতের ভূত', 'আশ্বর্য প্রদীপ', অনীক দত্তের আগের ছবিগুলিতে যেমন রূপকের আকারে একটা অন্য সত্যি উঠে এসেছিল। ঠিক সেভাবেই এই ছবিতেও বরুণবাবুর পারিবারের রূপকে বর্তমান সমাজের ছবিটাই দর্শন করালেন পরিচালক।