সিঁদুর নিয়ে খেলা

Updated By: Oct 3, 2016, 06:39 PM IST
সিঁদুর নিয়ে খেলা

নির্ণয় ভট্টাচার্য্য

ঢাকের কাঠি দুটো ঝড় তুলেছে...চামড়ার পর্দায় এত দ্রুত সেদুটো নামছে-উঠছে যে প্রায় আলাদা করে বোঝাই যাচ্ছে না কাঠিগুলো আছে কিনা। কিন্তু, বোঝা যাচ্ছেও, যখন নামা ওঠার মাঝের তীব্র আওয়াজ কানে আসছে। এই অস্থির কাঠির উন্মাদ বোল ধাক্কা মারছে মন্ডপের পিছনের বিবর্ণ বাড়িটার দোতলার চার নম্বর ঘরেও। সন্ধের খাটে নিচের শরীরটা ছটফট করছে সন্ধি পুজোর আগে মন্ডপে পৌঁছতে চেয়ে। সেবার সন্ধি পুজোর তিথি যে সন্ধের ঠিক পরপরই ছিল।

সোনাগাছির দুর্গা পুজো! এই তিনটে শব্দই তিন বছর আগে ধাক্কা দিয়েছিল বহমান বাঙালি যাপনকে। 'সোনাগাছিতেও দুর্গা পুজো! বাব্বা!'-ভাবটা কতকটা যেন এমনই ছিল। এতদিন 'পতিতা পল্লীর মাটি' দিয়ে 'মায়ের মুখ' তৈরি হত আর সে'বার  থেকে পতিতা পল্লীর মাটিতেই মা। নিজেদের মাঝে 'মা'কে নিয়ে আসার অদম্য ইচ্ছাটা অবশ্যই মেয়েদের (যৌনকর্মীদের), কিন্তু সেই ইচ্ছেকে বাস্তব করতে পাশে এসে দাঁড়াল 'দুর্বার'। সাল ২০১৩, শুরু হল ইতিহাস...

পুজো বরাবরাই বাঙালির বেহিসাবি হওয়ার উদযাপন। আর এই বেসামাল বেহিসাবি উদযাপনই, পেশাদার যৌনকর্মীদের জন্য 'হিসাব গোছানোর' 'সেরা সুযোগ'। সোনাগাছিও ব্যাতিক্রম নয়। ঠাকুর দেখতে বেরনো জনতা যেমন পুজো প্যান্ডেলে বা রাজপথে ভিড় জমান তেমনই সোনাগাছিতেও পাড়ি জমায় অসংখ্য দর্শনার্থী। এই দর্শনার্থীরা সংখ্যায় এতটাই বেশী যে, বহু যৌনকর্মীই মনে করেন তাঁদের সারা বছরের রোজগারের সিংহ ভাগটাই উঠে আসে ওই তিন-চার দিনে। শুলেই তাঁদের পেট চলে, তাই পুজোর কদিনে 'লক্ষী' খদ্দেরদের ভিড়কে উপেক্ষা করার প্রশ্নই ওঠে না, ফলে অবিরাম শোয়া চলতেই থাকে  পেশাদারিত্বের চাদরে। কিন্তু মন তো আর শুতে চায় না, সে ছুঁতে চায় পুজোর বাতাস...আরতির গন্ধ...অঞ্জলীর সমর্পণ। আর এখানেই সেই চিরাচরিত 'ঔদার্যের' ট্র্যাডিশন যা এখনও চলছে, মানে স্থানীয় 'এনলাইটেন্ড' পুজোগুলোতে ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই 'রেড লাইটের' মেয়েদের। পুজোয় উল্লাসের জ্যোত্স্না পূর্ণিমাকে হার মানালেও 'বেশ্যাদের' নিকষ অমাবস্যা তাতে এতটুকু ফিকে হয় না। "আমায় একটু জায়গা দাও"-এর আর্তি যদিওবা একটু জায়গা পায়, তবু তার সঙ্গে এতটাই গঞ্জনা ফ্রি থাকে যে মন ভেঙে যায়...মন ভেঙে যায়। সেখান থেকেই নিজেদের পুজো করার পরিকল্পনা।

হাইকোর্টের বরাভয়ে ২০১৩ সালে ঘরের ভেতর শুরু হল সোনাগাছির দুর্গার দুর্বার গতি। এই পুজো বাস্তবিক অর্থেই যৌনকর্মীদের পুজো। কারণ, শুধু বোধন থেকে বিসর্জনই নয়, ঠাকুর আনা, মন্ডপ সাজানো সবেতেই ওঁরা। সপ্তমীর সকালে লাল পেড়ে গরদ গায়ে কলা বউকে আহেরিটোলা ঘাটে স্নান করানো থেকে পুজোর প্রতিটা আচারে, উল্লাসে শুধু ওঁরা। এটা যে ওঁদেরই পুজো। পুজোর এই কটা দিন গোটা সোনাগাছি যেন এক 'ক্লাসলেস কমিউন', যেখানে 'এ', 'বি', 'সি' সব 'ক্যাটাগরির' মেয়েরাই 'হাতে হাতে ধরি ধরি'। সারা বছর আলাদা আলাদা রেটের খাটে খাটা মেয়েগুলো ঠাঁট ভুলে ওই কদিন- আমরা সবাই রাণী।

'অনুমতি থেকেও নেই', পুজো বন্ধ সোনাগাছিতে

সারা রাত জেগে চলে ভোগ রান্না, ভোরের আলো ফুটতেই পুষ্পপাত্র সাজানো থেকে নৈবিদ্য তৈরি করা সব কাজ নিখুঁতভাবে সারা হয়। তারপরই স্নান করে নতুন পোশাকে পবিত্র পুষ্পাঞ্জলী। পুজোর দিনগুলোতে সমস্ত প্রস্তুতিটাই ওঁরা সেরে নেন রাতের দিকে এবং কিছুটা ভোরের দিকে, কারণ একটাই- 'লক্ষী'  আসতে পারে যখন তখন। আর কে না জানে, লক্ষী চঞ্চলা, ফলে তাঁদের আপ্যায়নে যেন কোনও বিলম্ব বা ত্রুটি না হয়ে যায়। দিন গড়িয়ে যত অন্ধকার ঘন হয়, বিছানার আমন্ত্রণও তত ঘন ঘন আসতে থাকে, তবু ডাক তো অনিশ্চিত, কখন আসবে? জানা নেই...জানা নেই। তাই এখানকার মেয়েরা, প্যান্ডেলে বা ধারে কাছেই মশগুল থাকেন নিজেদের উদযাপনে। হয়ত আসনে ঠাকুরমশাই, তাঁর পাশেই মা'য়ের সন্ধ্যারতির পঞ্চপ্রদীপের সলতে পাকাচ্ছেন এক মেয়ে, হঠাতই ডাক এল, ওমনি হাত বদল হল সলতের, প্রথম হাত ছুটলো ভাত জোগারের বিছানায়। মেয়েদের জীবনের এরকমই নানান মূহুর্তের সাক্ষী থাকেন মা, সোনাগাছির মা। এভাবেই চোখের পলকে হঠাত এসে পড়ে বিষাদের দশমী। কিন্তু মন খারাপকে হেলায় দমিয়ে দিয়ে বাঁচতে পারাই তো ওঁদের সিগনেচার। তাই বিকেল হতেই, বিষাদ বিলাস ঝেড়ে ফেলে মেয়েরা মাতেন সিঁদুর খেলায়। সে সিঁদুর খেলা দেখার মতো, কারণ ওই দামাল খেলা যেন ম্লান করে দেয় ওঁদের বেরঙিন বেঁচে থাকাকে...'হাস্য মুখে পরিহাস করে' ওঁদের সিঁদুর না জোটাকে। ওঁরা সিঁদুরের তোয়াক্কা করেন না, করবেনই বা কেন, ওঁরা তো সিঁদুর নিয়ে খেলেন...

.