যুধিষ্ঠিরের কুকুর সম্পর্কে দুটো একটা কথা যা আমি জানি

অফিস ফেরতা মাঝে মাঝে ওর দোকানে চলে যাই। ও চেনে আমায়। গরম চপের সঙ্গে বেশি করে বিটনুন যে আমার চাই, সেই খবরও রাখে। একটু না ভাজা আলুর পুরও রেখে দেয় আমার জন্য। আর সেই শেষ সন্ধেবেলা ওকে ঘিরে ধরে হাটুরে মানুষ। দোকানদার, কম মাইনের কেরানি, রোজের মিস্ত্রি, গ্রামে ফেরার আগে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য আসা কাজের মাসি, অটোওয়ালা, চোর, বারবণিতা, আরো কত! কেউ খায় শুধু চপ, কেউ আবার মুড়ি দিয়ে পেঁয়াজ-লঙ্কা মেখে। সঙ্গে চপটাকে ভেঙে মিশিয়ে ফেলে। একটু একটু করে খায়, যাতে তাড়াতাড়ি শেষ না হয়ে যায়। মুখে নিয়ে চিবোয় পরম তৃপ্তিতে।

Updated By: Dec 29, 2011, 02:36 PM IST

হরিদেবপুর বাজারের মুখটায় চপ ভাজে যুধিষ্ঠির আর ওর মা। প্রতিদিন বেলা গড়াতেই ঘরে কড়াইতে চাপিয়ে দেয় আলু। সেদ্ধ হয়ে গেলে সেটায় নুন, পেঁয়াজ, লঙ্কা, ধনেপাতা, জিরেগুঁড়ো, লেবুর রস দিয়ে মাখিয়ে একটা শুকনো কাপড়ে মুড়ে রেখে দেয় চার-পাঁচ ঘণ্টা। লেবু-লঙ্কার প্রেমে আলু যখন মজেছে ভালমতোই, সেই অকল্পনীয় স্বাদের মণ্ডটাকে নিয়ে, সঙ্গে আরো যা যা দরকার, কাটা বেগুন, ডাল, কাটা পেঁয়াজ, বেসন আর হাঁড়ি-কুড়ি নিয়ে গুটিগুটি বাজারের দিকে মায়ে-পোয়ে হাঁটা লাগায়।

বেগুনি ফুলুরি ডালবড়া ভাজলেও আলুর চপ যুধিষ্ঠিরের ইউএসপি। খ্যাতিও পাল্লা দিচ্ছে স্বাদের সঙ্গে সমানতালে। বাজারে রাতের গেঁজেলদের ঠেকে এমন কথাও শোনা গেছে যে, মাঝে মাঝে যে কুকুরগুলো জিভ বার করে ওদের স্টলটার সামনে ঘুরে বেড়ায়, সেগুলো আসলে কুকুর নয়। ফর দ্য সেকেন্ড টাইম, যুধিষ্ঠিরের টানে ভগবান নাকি ধরাধামে নেমে এসেছেন কুকুর হয়ে! তবে এবার আর সততা পরীক্ষা করার জন্য নয়, চপ চেখে দেখার তাগিদে!

কলকাতায় অনেক জায়গায় চপ খেয়েছি। কালিকার অতুলনীয় মোচার চপ, লঙ্কার চপ বা ডিমের ডেভিল। উত্তর কলকাতায় আমের চপ বা টমেটোর চপও পাওয়া যায়, যদিও সেসবে আমার খুব একটা আগ্রহ নেই। পেঁয়াজের সাথে মিষ্টি গুলে তাকে বেসনে ভাজার মধ্যে কি মাহাত্ম্য আছে, আপনারা তা বলতে পারবেন, আমি তো বুঝি না! বরং আলুর চপের মধ্যে যে একটা রগরগে ঝালের ব্যাপার থাকে, মুখে দিলে বেসনের স্তর ভেদ করে বিটনুন আর কাঁচালঙ্কা-ধনেপাতার সঙ্গে আলুর সেই মৈথুন যেন অনেকটা কৈশোরে নিষিদ্ধ উপন্যাস পড়ার হাতছানির মতো। স্পাইস ছাড়া আর কি থাকে বাসনা এবং রসনায়?

তাই যুধিষ্ঠিরের দোকান আমার খুব প্রিয়।

ফুটন্ত তেলের কড়াইতে বেসন মাখা চ্যাপ্টা পুরগুলো ছেড়ে দেবার সময় ওর চোখে একটা অদ্ভুত আলো খেলা করে দেখেছি। দেখার ভুলও হতে পারে। হতেই পারে বাজারের সমস্ত আলো সেই সময়টায় শুধু ওর চোখগুলোই বেছে নেয়। আর তারপর সেই পুরটাকে ভাজার কায়দা দেখার মতন। প্রায় পনেরো মিনিট ধরে সাঁতলে, নাড়াচাড়া করে জিনিসগুলোকে খেলায়। সাদা থেকে হলদে, হলদে থেকে সোনালি হয়ে গাঢ় বাদামি (যুধিষ্ঠির বলে আরশোলার পিঠ) হয়ে যাবার পরেও ও নাড়তে থাকে অনেকক্ষণ। কী করে যে ম্যাজিশিয়ানের মতন বুঝে যায়, এবার না তুললে পুড়ে যাবে, কে জানে! একদিনও পোড়া গন্ধ পাইনি।

অফিস ফেরতা মাঝে মাঝে ওর দোকানে চলে যাই। ও চেনে আমায়। গরম চপের সঙ্গে বেশি করে বিটনুন যে আমার চাই, সেই খবরও রাখে। একটু না ভাজা আলুর পুরও রেখে দেয় আমার জন্য। আর সেই শেষ সন্ধেবেলা ওকে ঘিরে ধরে হাটুরে মানুষ। দোকানদার, কম মাইনের কেরানি, রোজের মিস্ত্রি, গ্রামে ফেরার আগে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য আসা কাজের মাসি, অটোওয়ালা, চোর, বারবণিতা, আরো কত! কেউ খায় শুধু চপ, কেউ আবার মুড়ি দিয়ে পেঁয়াজ-লঙ্কা মেখে। সঙ্গে চপটাকে ভেঙে মিশিয়ে ফেলে। একটু একটু করে খায়, যাতে তাড়াতাড়ি শেষ না হয়ে যায়। মুখে নিয়ে চিবোয় পরম তৃপ্তিতে। জিভ দিয়ে দাঁতের ফাঁক থেকে টেনে বার করে আনে চপের টুকরো, তারপর সেটাকে নিয়ে মুখের ভেতর খেলায়। কারও কাছে এটাই হয়ত তার রাতের খাবার। রঙওঠা খালি মানিব্যাগের এককোণায় অতি যত্নে, অতি গোপনে লুকিয়ে রেখে দেওয়া ময়লা পাঁচ টাকার নোটের পুরোটাই শেষ করে দিয়েছে খাবারে। তারপর ম্লান মুখে আবিষ্কার করেছে আর টাকা নেই। কিন্তু হয়তো খিদে মেটেনি। সে ঠোঙাটা নিয়ে অনেকক্ষণ নাড়িয়ে নাড়িয়ে দেখে, যদি কোনো মুড়ির বা ভাঙা চপের টুকরো পাওয়া যায় হঠাত্‍‍, এল ডোরাডো খুঁজে পাওয়ার আনন্দে সেটাকে চালান দেয় মুখের ভেতর। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, চপের ঝুড়িতে পড়ে থাকা ভাজবেসনের টুকরোগুলো মুড়ির সঙ্গে মিশিয়ে একটুকরো কাঁচা পেঁয়াজ দিয়ে যুধিষ্ঠির কিছুটা ঢেলে দেয় সেই অর্ধভুক্তের ঠোঙায়। সঙ্কুচিত হয়ে টাকার কথা বলতে গেলে গম্ভীরভাবে বলে ‘লাগবে না’। সেই সময়টাতেও ওই আলোটা দেখেছি ওর চোখে। নিভে আসা বাজারের শেষ হ্যাজাক? কে জানে! বড় মায়াময়, বড় হাক্লান্ত সেই আলো।

এই দোকান, এই পুড়তে পুড়তে কালো হয়ে যাওয়া কড়াই, এই মুড়ির সঙ্গে ভাঙা চপের টুকরোর 'ককটেল', এই খরচ হয়ে যাওয়া ময়লা পাঁচ টাকার মালিকের উদ্ভাসিত মুখ-এরা না থাকলে সিসিডি-বারিস্তা-ম্যাকডোনাল্ডস নিয়েই কি শুধু বেঁচে থাকবে কলকাতা? সে কেমন কলকাতা?

বসন্তের কোকিল কাশবে, কেশে কেশে মুখে রক্ত তুলবে, সে কেমন বসন্ত?

Tags:
.