বাদশার জীবনের তিন নারীর গেরুয়াপন

Updated By: Dec 23, 2015, 06:50 PM IST
বাদশার জীবনের তিন নারীর গেরুয়াপন

স্বরূপ দত্ত

আজ বিকেলের কলকাতাকে দেখে মনে বেশ প্রেম এলো। আসবে নাই বা কেন! ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ। মিঠে রোদ গেল চলে। সন্ধে দিব্যি এল নেমে। সব নিয়ম মেনেই। কিন্তু কেমন যেন অগোছালো হয়ে। আকাশ, চারপাশ, মন, মাথা, স্মৃতি, ভাবনা, সবই যেন গেরুয়া। ভালোবাসার আধুনিক রং। এক বাঙালির কলমে।
কেন ভালোবাসার রঙ গেরুয়া? উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত, অমিতাভ। ভাবলাম। কিছুক্ষণ। ব্যাখ্যা এলো। ভরল মন। কিসে হয় গেরুয়া? কী মেশালে হয় গেরুয়া? হলুদ আর লাল। সত্যিই হলুদের থেকে বেশি উজ্জ্বল রঙ ভালোবাসার শরীরে ওঠে নাকি! গায়ে হলুদ। তবেই তো গিয়ে ফুলের বিছানার চাদরে মিলে যাওয়া। এক হওয়া। আর লাল। প্যাশনের রঙ। ভালোবাসায় প্যাশন মিললেই তো হয় গেরুয়া হবেই। ত্যাগ। 'স্যাক্রিফাইস'। যেখানে থেকো, ভালো থেকো। আবার হবে তো দেখা, এ দেখাই শেষ দেখা নয় তো। না পাওয়া। বিচ্ছেদ। কষ্ট। কান্না। অমিল না থাকলে, ভালোবাসায় আবার সুখ মেলে নাকি? অমিল না থাকলে, ভালোবাসার কোনও রসায়ন হয় নাকি! পন্দরা সাল, এক মাহিনা, দশ দিন। ওই ব্যবধানটাই তো গেরুয়া। ঝাপসা নয়। অনেক পুরোনো। তবু উজ্জ্বল। বড় টাটকা। তাজা। প্রেম হোক গেরুয়া, হোক হোক গেরুয়া। শুধু তাই নয়। প্রেম ছিলই গেরুয়া। চিরকাল।
আপনি পুরুষ? শাহরুখ খানকে পছন্দ করেন, নাকি করেন না, কে জিজ্ঞাসা করেছে। তবে, এদেশের অনেক মানুষ কিং খানকে ভালোবাসেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন, শাহরুখ খানকে মেয়েদের বাহুডোরে বড্ড পুরুষ লাগে। সেই পুরুষটাই লাগে, যে পুরুষ হলে অনেকের মাঝেই আলো হয়ে থাকা যায়। সবথেকে সুন্দরী নারী শরীরের গন্ধটা সবার আগে নাকে পাওয়া যায়। কাল সারাটা দিন শহরে কাটিয়ে গেলেন শাহরুখ। কাটালেন সময়। মাতালেন মন। মনে পড়ালেন স্মৃতি। ভাবালেন অন্য কিছু। কী? শাহ মানে তো সম্রাট। আর রুখ মানে মুখ। সম্রাটের মুখ তো সবাই দেখে। কিন্তু সম্রাটের জীবনের সেই তিন কন্যার গল্পটা কেমন? কোন তিন নারীকে ছাড়া কিংয়ের জীবনকে এক অধ্যায় বলতে হবে। আসলে ওই তিন অধ্যায় আর শাহরুখের নিজের জীবন। তবে না গিয়ে হবে, বাদশার জীবনের চার অধ্যায়। তা সেই তিন নারীর তিন অধ্যায় ভাবার চেষ্টা করলাম খানিক। যা পেলাম, তাই শেয়ার করা। তিন নারীর প্রথমজনকে দিয়েই শুরু করি। ঢুঁ দেওয়ার একটা অলীক চেষ্টা করলাম বাদশার জীবনের তিন নারীর মনে। যে, যা ভাবালো।

গৌরী - বাদশার বেগম। গোটাটাই তো জুড়ে থাকবেন তিনি। কিন্তু কিংকে নিয়ে কী কী ভাবনা আসে তাঁর মনে? দেশের সবথেকে বড়, ভালো, রোম্যান্টিক হিরো, আমার স্বামী। ভাবতে কেমন লাগে এক নারীর? মেয়েরা যখন পাগল হয়ে ওঠে ওই বুকে একবার আড়াল হয়ে যেতে, কেমন লাগে বেগমের? কেমন লাগে যখন ঘরোয়া সমস্যায় একান্ত নিজের কিংয়ের উপর রাগ হয়? আর কানে বেজে ওঠে, 'তুম নেহি সমঝোগে রাহুল। কুছ কুছ হোতা হ্যায়!' কেমন লাগে যখন ওই রাগের সময়ও একবার মাথায় কথাটা চলে এলে, 'শাহরুখ-কাজল জুটি'। এরথেকে ভালো আর কিছু হয় নাকি! দুজনকে কী সুন্দর মানায়। যেন মেড ফর ইচ আদার। সিলভার স্ক্রিনে অর্ধনারীশ্বরের সার্থক উদাহরণ। কেমন লাগে শাহরুখের বেগমের মনটা? সত্যিই কি এভাবে মানুষটা নিজের বুকের ডুকরে ওঠা কষ্টটা চাপা দিতে পারেন এভাবে যে, বড়ি বড়ি দেশোমে অ্যাসে ছোটি ছোটি বাতে হোতেহি....! ধুর অত সোজা। হয় নাকি! একে মানুষের মন। তার উপর নারী মন। সেরা প্রেমিকও বাস্তব জীবনে যে নারীর প্রেমে পড়ে জীবন থেকে আলাদা করার ঝুঁকি নিতে পারেননি, তাহলে সে নারীর মনের গভীরের তল পাওয়া এত সোজা নাকি। মনে হল, তাই রণে ভঙ্গই দিলাম। হাতড়িয়েও শেষ রক্ষা হত না। উত্তর না জেনে খালি হাতেই ফিরতে হত। শুধু বুঝলাম, সব গ্ল্যামারের পিছনে, সব মেকআপের আড়ালে, সব মান্নতের দেওয়ালের ভিতরেও অনেক অনেক দীর্ঘশ্বাস রয়েছে। থাকতেই হবে। কোনও পারমুটেশন-কম্বিনেশন দিয়ে এই দীর্ঘনিঃশ্বাসকে পুরো ঢেকে ফেলা যাবে না কোনওদিনও। এটাই কী তাহলে গৌরীর গোরুয়া অনুভূতি? বাদশার জীবনে নারীর অভাব নেই। বরং, গৌরীই এখানে যেন 'গেরুয়া সন্ন্যাসী রানী'! এবার যাই বাদশার জীবনের দ্বিতীয় নারীতে।

কাজল - গৌরী তাঁর স্ত্রী। চিরকালের। প্রথম ভালোবাসা। কত বছর, কত মাস, কত দিন, কত মুহূর্ত, গোটা জার্নিটারই যে কাঁধে ঠোকা খেতে খেতে চলা সঙ্গী। হাসিতে, দুঃখতে, হতাশায়, উচ্চভিলাষে, কিং হওয়ার পথে চলতে চলতে প্রত্যেকটা সিঁড়িতে, ধাপে, পায়ে। কিন্তু, কাজল ছাড়া কিংয়ের জীবন সম্পূর্ণ হয় নাকি! ১৯৯৩ ১২ নভেম্বর। রিলিজ করেছিল বাজীগর। ব্যাস, সেই শুরু। দুটো নাম একটা মানুষ যেন। দুটো মুখ। একটাই 'কাস্ট' যেন। তারপর একে একে মিথ হয়ে ওঠা। সঙ্গে থাকলে মানে একে ফ্রেমে দুজনকে কত সুন্দর লাগে, তা মানুষই বুঝে ওঠে কোথায়। কিন্তু কুছ কুছ হোতা হ্যায় তে অঝোরে বৃষ্টির ফোঁটায় যখন ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকা কাজলের জন্যই ব্যাকগ্রাউন্ডে ভেসে ওঠে তুঝে ইয়াদ না মেরি আয়ি, কিসিসে অব ক্যা কহে না। তখনই তো মনে হয়, এটাই গেরুয়া। ওখানে স্যাক্রিফাইস রয়েছে। না পাওয়া আছে। গলার কাছটায় মাংসপিণ্ডটার দলা পাকিয়ে যাওয়া আছে। আঙুলের মাথাগুলো চিনচিন করে ওঠা আছে। আশে পাশের পৃথিবীটা একটা জড় আর নিজের মধ্যে গোটা গ্যালাক্সির প্রাণটা ছটফট করছে। এটাই যদি গেরুয়া হয়, তাহলে অজয়ের সঙ্গে রুটিন মনোমালিন্যতে কি কাজলের মনে কখনও কিং আসে না? কখনও কাজলের কুছ কুছ হোতা হ্যায় দেখতে বসে, চোখ দিয়ে অবচেতন মনেই দু ফোঁটা জল চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে না? কখনও কী একবারও মনে হয় না, সবাই বলে দুজনকে বড্ড মানায়। তাই, আমি কি তাহলে ওর জন্যই। অথবা শাহরুখও আমার জন্যই...। এখান থেকে মনের রিমোটের বদল আনতে কী করতে হয় বাস্তবের কাজলকে? আরও পুরু করে কাজল পরে নেওয়া? যাতে অত ভারী জলের ফোঁটাটাও ওই কাজলের সীমায় এসে টলমলে হয়ে উঠে আরও সুন্দরী করে তোলে 'শেখরের' সামনে? নাকি সত্যিই আর আসতে বারণ করে দেওয়া মনকেই! অন্যথায় মার ডালুঙ্গী! কাজল থেকে এবার আসি তৃতীয় নারীতেই।

দিব্যা ভারতী - শাহরুখ খানের জীবন থেকে এই নারীকে কি এত সহজে সরানো যায়?  কোনওদিন ঠিক দিব্যা ভারতী নামটা আরও চেপে বসবে কিং খানের জীবনে। আজকের শাহরুখ-কাজল জুটিটাই হয়তো কোনওদিন মানুষ দেখতে পারত না, দিব্যা ভারতী হঠাত্‍ করে ওভাবে মারা না গেলে। আজ শাহরুখ-কাজলকে দু হাতের মাঝে রেখে দিব্যি বলে যেতে পারেন, তাঁর দেখা সেরা দুই প্রজন্মের সুন্দরী কাজল আর তাঁর মা তনুজা। মনে পড়ে শাহরুখ, যখন আপনি বাদশা হননি, শুধুই প্রতিশ্রুতিমান তকমা পেতেন, তখন দিব্যা ভারতী নামের নারীর সঙ্গে আপনার ছবি দেখে এ দেশের তরুণ প্রজন্ম হয়তো নিজেদের বাস্তব জীবনের প্রেমের জুটিকে একবার মিলিয়ে দেখে নিতো। দিওয়ানা, দিল তো আসনা হ্যায়। অল্প কিছু দিন। তারমধ্যেই মানুষ দেখে ফেলেছিল। কিন্তু একটা রাতে সব ওলোট পালোট হয়ে গেল। সেটাও যে ১৯৯৩! ৫ এপ্রিল দিব্যা ভারতী মারা গেলেন। আর ১২ নভেম্বর মুক্তি পেল বাজীগর। গল্পটাই বদলে গেল বাস্তবের। জুটি হয়ে গেল শাহরুখ-কাজল। যা হতেই পারত, শাহরুখ-দিব্যা ভারতী। আজ বেঁচে নেই। কিন্তু বলে যে কেউ কেউ, আত্মার কোনও মৃত্যু নেই। মৃত্যু তো হয় শরীরের। সেক্ষেত্রে দিব্যা ভারতীর আত্মাটার অস্ত্বিত্ব এখনও আছে নিশ্চয়ই। আত্মা নিশ্চয়ই ভাবতেও পারে। আর যদি তাই পারে, তাহলে ঠিক কতটা কষ্ট হয় দিব্যা ভারতীর 'আত্মার বুকটায়'! হয়তো একটা নিঃশ্বাস ফেলে দিব্যা ভারতীও বলার চেষ্টা করে, সবই উপরওয়ালার খেল। দিওয়ানাতে আমায় যে 'কাজল' বলেই ডেকেছিলে রাজ। আমি বাঁচতে পারিনি। কিন্তু কাজল হয়েই থেকে গেলাম তোমার জীবনে চিরকাল। শরীর তনুজা আন্টির মেয়ের। কিন্তু যেন, ওটা আমিই। দিব্যা ভারতী। তোমার দিওয়ানার কাজল। আজ দিওয়ানা ফোর মুক্তি পেয়ে যেত হয়তো শাহরুখ। কিন্তু আক্ষেপ নেই কিং। এটাই ভালোবাসা। এটাই গেরুয়া...।